বৈশ্বিক সংকটে অর্থনীতি পরিচালনায় পরনির্ভরতা এড়াতে হবে

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি এবং এলএনজি সরবরাহ। দেশের জ্বালানি পণ্যের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও বিপুল পরিমাণ এলএনজি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। বিশ্ববাজারের জ্বালানিপ্রবাহের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় যুদ্ধের জেরে এখন এটি বন্ধ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান সংঘাত আর আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ যুদ্ধ বিশ্বের সবার জীবনমানের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মহাসংকট তৈরি করেছে। উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে অনুন্নত বিশ্ব—প্রতিটি পক্ষকেই এ যুদ্ধের খেসারত দিতে হচ্ছে। যদিও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাও অনিশ্চিত। সম্প্রতি আবারো দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। নানা কারণেই এ সংঘাতের পরিণতি আজ অনিশ্চিত। প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী ছিল? উত্তরটিও সরল, অবশ্যই নয়। শুরু থেকেই অধিকাংশ মানুষ এ যুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম থেকেই তাদের মিত্র দেশগুলো থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি। তাদের অন্যতম সহযোগী ন্যাটো আজ ভাঙনের মুখে। কারণ ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য যুদ্ধের জন্য নিজেদের জড়াতে চায়নি। এখানে অর্থনীতির বড় একটি প্রভাব রয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে এড়িয়ে কোনো পক্ষই ঝুঁকিকে বরণ করবে না।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি এবং এলএনজি সরবরাহ। দেশের জ্বালানি পণ্যের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও বিপুল পরিমাণ এলএনজি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। বিশ্ববাজারের জ্বালানিপ্রবাহের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় যুদ্ধের জেরে এখন এটি বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি সীমিত পরিসরে সংগ্রহ করা গেলেও তার জন্য বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বাড়তি এ অর্থ খরচ হওয়ায় একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এ পথ অবরোধ করে রাখায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য প্রতি ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধি মানেই মাসিক আমদানি বিলে অতিরিক্ত ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলারের বোঝা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে। পরিবহন ভাড়া বেড়ে নিত্যপণ্যের দাম যেমন বাড়ছে তেমনি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে কৃষি এবং শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ এবং সারের ব্যবস্থা করতে না পারলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমনিতেই বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতিতে আবার ঘৃত জোগান দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। এতে মূল্যস্ফীতি আবারো দুই অংক ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ও লোডশেডিং মানুষের কষ্টকে আরো অসহনীয় করে তুলছে।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিয়ে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। চলমান অচলাবস্থা আরো দীর্ঘায়িত হলে দেশের সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি কী হতে পারে তা অনুমান করা বোধ করি খুব দুরূহ নয়। বছর ধরেই আমাদের দেশের রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবেই উন্নতির দিকে আছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল ভিত্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যার প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের মতো দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও আঞ্চলিক অস্থিরতায় তাদের অর্থনীতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে। এতে বাংলাদেশী কর্মীদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। অনেকে এরই মধ্যে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহও কমের দিকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের এ অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে এর বিপরীতে এ যুদ্ধ থেমে গেলে আমাদের দেশের জন্য একটি বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা পুনরায় মেরামত করতে বিপুল কর্মযজ্ঞ লাগবে। এর জন্য বিপুলসংখ্যক নির্মাণ শ্রমিকসহ অন্যান্য কর্মী দরকার পড়বে যার জোগান বাংলাদেশ থেকে হতে পারে। আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এখন থেকেই দক্ষ নির্মাণ শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে। এ কথা মনে রাখতে হবে, আমরা সস্তা শ্রম রফতানি করি। কিন্তু আধুনিক সময়ে টেকসই দক্ষতা অর্জন না করলে সস্তা শ্রমের বাজারেও সঠিক মজুরি মেলে না। এজন্য যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের জন্যও এ যুদ্ধ অশনিসংকেত। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় জাহাজের যাত্রা বিলম্বিত হয় এবং জাহাজ ভাড়া এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি তাদের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে যা দেশের প্রধান রফতানি পণ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর ফলে দেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে যা দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। দেশের কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন যাতে করে আমাদের প্রধান রফতানি খাত ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে। এ সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের হাতে বিকল্প পথ সীমিত থাকলেও কৌশলগত প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন অফিস সময় ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত করা ও সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখা। এরই মধ্যে জানা গেছে, পাবনার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলতি সপ্তাহ থেকে উৎপাদনে আসতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের জন্য বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণ দীর্ঘদিনের দাবি। এ সংকটময় মুহূর্ত থেকেই নব উদ্যোগে শুরু করতে হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় নিজেদেরকেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। এ বিষয়টি সব সময়ই জরুরি। নিজেদের ভুল থেকেই শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। নিজেদের সমাধান নিজেরা গড়ে নিতে পারলে পরনির্ভরশীলতাও অনেকাংশে কমবে।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও