রাজধানীর বেসরকারি এক কলেজের অধ্যাপকের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। তার কলেজে ইংরেজি কীভাবে পড়ানো হয় তা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। জানতে চাচ্ছিলাম যারা ইংরেজিতে পড়েন তাদের এ ভাষা আয়ত্বের ধরন, জানার ব্যাপ্তি ও বাস্তবিক পরিসরে ব্যবহারের প্রবণতা আদতে কেমন। তিনি জানালেন এখন সবাইকেই ফুল গ্রেডিং দেয়া হয়। অর্থাৎ আগের যুগের হিসেবে সবাই ফার্স্ট ক্লাস পান। কাউকে সেকেন্ড ক্লাস দেয়া হয় না। শুনে প্রীত হলাম। বললাম, তাহলে তো সবাই ভালো এ ভাষা ব্যবহারে। কিন্তু অধ্যাপক জানালেন, আসলে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে নাম্বার দেয়া হয়। যারা ক্লাস করে না বা পরীক্ষাও ঠিকমতো দেয় না তাদেরসহ সবাইকে প্রথম শ্রেণী দিতে হয়। তাতে অন্তত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার মানদণ্ড পূরণ করতে পারবেন। অধ্যাপক নিজেই বললেন, শিক্ষার্থীরা এসএসসিতে ইংরেজির যে জ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয় কলেজে অনার্স বা মাস্টার্স পাস করার পরও সে জ্ঞান বা দক্ষতায় খুব বেশি এগোতে পারে না। খাতায় উত্তরের মান দেখে মূল্যায়ন না করে সহানূভূতি বিবেচনায় মার্কস দেয়া হয়। এটিই দেশের ইংরেজি শিক্ষার প্রকৃত হাল। এখানে ইংরেজি পড়ানোর সময় শেখানো হয় স্ট্রাকচার, কিছু ক্ষেত্রে ডায়লগ, কিছু ক্ষেত্রে অনুবাদ। সবার ধারণা এভাবেই বোধ হয় ইংরেজি শিখতে হয়। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের উদ্দেশ্য আর পড়ানোর ধরন নিয়ে এজন্যই রয়েছে বিরাট দ্বন্দ্ব।
দেশে যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ইংরেজির প্রশ্নপত্র দেখলে এ বিষয়টিকে আবশ্যিক হিসেবে পড়ানোর উদ্দেশ্যের কোনো মিল পাওয়া যায় না। বরং মনে হয় পরীক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি ভাষার গঠনপ্রণালি ও ব্যাকরণ নিয়ে গভীর গবেষণামূলক ভাবনার প্রতিফলন দেখতে চাওয়া হচ্ছে। অথচ শিক্ষার্থীরা এ ভাষাটিতে পারদর্শী কিনা এবং তা বাস্তবিক অর্থে ব্যবহার করতে পারেন কিনা, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
পরীক্ষা পদ্ধতিও তেমন হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হয় গবেষণাধর্মী। এ ধরনের ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ভাষা ব্যবহার ও অনুশীলনকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভাষার ভেতরকার যৌক্তিক কারণ আর সম্পর্কগুলো গভীরভাবে জানার দিকটি যাচাই করা হয় না। এজন্যই শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ছে না।
ভাষাবিজ্ঞান যাদের কাজের ক্ষেত্র তারা ভাষার ব্যাকরণগত, শব্দ ও রূপতত্ব নিয়ে অনেক তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। এগুলো তাদের ভবিষ্যৎ তথ্যসূত্র হিসেবে কাজে আসে। কিন্তু নিত্যদিন যারা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করেন কিংবা যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাদের এসব তাত্ত্বিক বিষয় ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে তেমন কাজে আসে না। এমনকি প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যারা আসলে ভাষা বিষয়ক কোনো অধ্যয়নে যুক্ত নন, তাদেরও তাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে আসে না। অথচ রাষ্ট্রীয় খরচে বাধ্যতামূলক হিসেবে যেভাবে ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে সেখানে এ তাত্ত্বিক জ্ঞানকেই বারবার উপস্থাপন করা হচ্ছে। এজন্যই ইংরেজি ভাষা অনুশীলনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে। শিক্ষা কারিকুলামে বলা হয়েছে, যেকোনো শিক্ষার্থীরা প্রণীত অনুশীলনগুলোর মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইংরেজি বলতে, বুঝতে ও লিখতে পারবে। কিন্তু প্রচলিতভাবে যখন অনুশীলনের মূল্যায়ন করা হয়, তখন এক ধরনের সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়। এও সত্য, অনেকেই এ ধরনের প্রশ্নপত্র দেখে মুগ্ধ হন। অনেকের কাছে প্রশ্নপত্র সহজ ঠেকে। ব্যাকরণগত প্রশ্ন অনেকের কাছে মামুলি। কিন্তু প্রশ্ন এমনভাবে করা উচিত যাতে শিক্ষার্থীরা উত্তর দেয়ার সময় চিন্তা করেন। অথচ শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র এমনভাবে করছেন যে ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্যটাই স্পষ্ট হচ্ছে না। প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের আরো চিন্তা করতে হয়, শিক্ষকদের ভীষণভাবে বেগ পেতে হয়। প্রশ্ন দেখে যেন শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করতে পারেন কেন কীভাবে ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু দেশে এমনভাবে প্রশ্ন করা হয় যে আসলে ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট নয়।
একটি বিষয় বোঝা জরুরি, দেশে বাণিজ্যিক কারণে ইংরেজিকে বাধ্যতামূলভাবে পড়ানো হয়। ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য ও এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি অনুধাবন না করলে শিক্ষার্থীদের খুব একটা ক্ষতি হবে না। অনেকের জন্য ইংরেজি শেখা আবশ্যক যদি তারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চান। আবার করপোরেট বিভিন্ন সেক্টরে কিংবা বহুজাগতিক প্রতিষ্ঠানে ভালো পদের চাকরি পেতে হলেও ইংরেজি জানতে হবে। তবে পুরোপুরি ইংরেজি জানতে হবে এমনটি নয়। দেশের জনসম্পদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। সেখানে আরবি বা স্থানীয় ভাষাটি জানলেই হয়। অনেকে সেখানে গিয়ে প্রাত্যহিক কাজ করতে করতে ভাষা আয়ত্ব করেন। এ সময়ে যদি তারা ইংরেজিটাও শিখে নিতে পারেন তাহলে আরো ভালো। তখন তারা পর্যটন খাতেও অংশগ্রহণ করতে পারবেন। ভাষার এ বাস্তবিক দিকটিকে আমরা কেন যেন বাস্তব রূপ দিতে পারছি না। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাকরণগত তত্ত্ব শিখিয়েই ক্ষান্ত। শিক্ষার্থীরা শুধু তা গলাধকরণ করে পরীক্ষায় উগড়ে দেন। ভবিষ্যতে যখন আবার প্রয়োজন পড়ে তখন ভর্তি হন কোচিং বা নানা ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানকার অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। কোথাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাষা ব্যবহারের কোনো অনুশীলন নেই। অথচ বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, অনুবাদ এমনকি কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার চাহিদা অনেক।
দেশের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগমন করেন। এক্ষেত্রে তারা এমন অনেক দেশে যান যেখানে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও ইংরেজির সিলেবাস আর মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলো প্রথাগত কিছু প্রশ্নের ধরনে সীমাবদ্ধ। শুধু প্যারাগ্রাফ লেখার কসরত। নিজের ভাষা দক্ষতা উন্নত করার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। যখন শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে প্রবেশ করবেন তখন তারা যোগাযোগ করতে কতটা পারদর্শী সেটাই দেখা হবে। তারা ইংরেজি পড়তে, বলতে, শুনতে ও লিখতে পারেন কিনা—চারটি বিষয়ই যাচাই করা হবে। কিন্তু এখানেই দেশের সিংহভাগ গ্র্যাজুয়েট সমস্যায় ভোগেন। তারা এ ধরনের চর্চার মাঝে ছিলেন না বলেই সমস্যায় পড়েন।
এক সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়েই ভর্তি হতেন। তবে সেখানে তাদের সাহিত্য পড়ানো হতো। বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম পড়ে ধীরে ধীরে তারা কিছুটা দখল পেতেন ইংরেজিতে। কিন্তু এখন কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন ভাষাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অনেকে এখন কিছুটা হলেও ভাষার চারটি দক্ষতা (পড়া, শোনা, বলা ও লেখা) আয়ত্বের চেষ্টা করেন। এটি ইতিবাচক। কিন্তু এটা সামগ্রিক চিত্র না। এখনো শিক্ষা ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে যে ইংরেজি পড়ানো হয় সেখানে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইংরেজি অনুশীলনকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। মোট কথা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের তা কোনো কাজে আসে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক বিষয় প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি পড়ানো হয়। ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক, কারিকুলাম প্রণয়ন, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি বছর অনেক অর্থ খরচ করতে হয়। সমস্যা হলো, ইংরেজি শেখানোর মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এখানে পূরণ হচ্ছে না। ব্যক্তি পরিসরে দু-একজন সচেতন শিক্ষক কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের সচেতন ও সশিক্ষিত করার চেষ্টা করছেন। সেটা কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজনের তুলনায় কম। শিক্ষার্থীদের মনে ইংরেজিভীতি রয়েছে। কোনোমতে পাস করতে পারলেই বাঁচোয়া। আর এ পাসের ব্যাপারটি শিক্ষকদের কাছে সহানুভূতি আর ছাড় দেয়ার মধ্যে আটকে আছে। প্রশ্ন, মূল্যায়ন, মার্কিং ও সার্টিফিকেট সবই ছাড় দেয়ার মধ্যে চলছে। এ অবস্থার পরিবর্তন আনা জরুরি। তার আগে সমস্যাটাকে আমলে নিতে হবে। ইংরেজি যে এভাবে শেখানো উচিত নয়, এ বিষয়টি আগে অনুধাবন করতে হবে। তবেই বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশ্য সফল হবে। নয়তো অযথা প্রতি বছর শিক্ষা খাতে এটি অপচয়ের খাতায় নাম লেখাতে থাকবে।
মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক