মহান জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’। বাজেট বাস্তবায়ন কৌশল, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। আমাদের নায়েমের গলির পান-সিগারেটের দোকান থেকে শেরাটন-সোনারগাঁও সবখানেই বাজেট নিয়ে কথা হচ্ছে। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে জটিল সব তত্ত্ব উপস্থাপন করছেন সম্মানিত অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু আমরা যারা অ-অর্থনীতিবিদ তারা মোটা দাগে জানতে চাইব বাজেট কী? বাজেটের আইনগত ভিত্তি কোথায়? সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অবশিষ্ট অঙ্গীকার পূরণে অনুমোদিত বাজেটের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো অবলোকনের প্রয়াস থাকবে বর্তমান লেখায়।
আলোচনার শুরুতেই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব। কারণ তার হাত ধরেই বাংলা ভাষায় ‘বাজেট’ শব্দের আগমন। প্রয়াত আকবর আলি খানের ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে আমরা পাই, ‘বাজেট ইংরেজি শব্দ। মধ্যযুগের ইংরেজি বুজেট (Bougette) থেকে এর উৎপত্তি। বুজেট অর্থ মানিব্যাগ বা টাকার থলি। ... ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় বাজেট শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন’। মহান সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আইনি ভিত্তি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। অথচ সংবিধানে ‘বাজেট’ শব্দটিই নেই, আছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’। সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ নামে অভিহিত) সংসদে উপস্থাপিত হইবে’। এ বিবৃতিই আসলে ‘বাজেট’। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আওতায় ৮১ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্ণিত আছে। তাছাড়া ‘অর্থ-বৎসর’ সম্পর্কে ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘অর্থ-বৎসর’ অর্থ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে যে বৎসরের আরম্ভ’। সরকারের অর্থ বিভাগ প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের বিধানসাপেক্ষে সরকারি অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণ ধারণযোগ্য পর্যায়ে রাখা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাজেট প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে প্রণীত হয়েছে ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’। বর্তমানে এ আইন এবং সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪, রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬, জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলস ইত্যাদির বিধান মোতাবেক পরিচালিত হয়ে থাকে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা। মহান সংসদে বাজেট উপস্থাপন ও সংসদীয় বিতর্ক অনুষ্ঠানের রীতিনীতি বর্ণিত আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’তে। এ বিধির ‘আর্থিক বিষয়াবলী সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি’ শিরোনামের ষোড়শ অধ্যায়ের আওতাধীন ১১১ থেকে ১২৯ নং বিধিতে বাজেট, মঞ্জুরি দাবি, নির্দিষ্টকরণ বিল, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট, ছাঁটাই প্রস্তাব, প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা আছে।
আমরা সবাই জানি যে কাঠামোগত ভাগে বাজেটের তিনটি অংশ। প্রথম ভাগে থাকে আয়ের হিসাব (Revenue and Foreign Grants)। সরকারের আয়ের আবার তিনটি উৎস। ১) জনগণের প্রদেয় কর (এনবিআর এবং অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক আদায়), ২) কর-বহির্ভূত আয় (ফি, লভ্যাংশ, অর্থদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি) এবং ৩) বৈদেশিক অনুদান। আগামী অর্থবছরে সরকারের সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের (৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা) তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে কর হিসেবে আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি, কর ব্যতীত আয় ৫০ হাজার কোটি ও বৈদেশিক অনুদান ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
বিগত সময়ে আয়ের বড় অংশ আসত বৈদেশিক অনুদান থেকে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার বাজেটে অনুদানপ্রাপ্তি খাতে ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা (৫ দশমিক ১৩ শতাংশ)। বর্তমান অর্থবছরে অনুদান প্রস্তাব নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫১২ শতাংশে। অনুদান নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসছে বর্তমানের বাংলাদেশ। কিন্তু রাজস্ব আদায়ে আমাদের আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যে, ‘আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম’। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত জিডিপির (৫০ লাখ ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা) ৮ দশমিক ৯৮৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন আর্টিক্যাল-৪ মোতাবেক বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই হতাশাজনক। গত মার্চে অনুষ্ঠিত সভায়ও রাজস্ব বোর্ডের কাছে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে কর ব্যবস্থা সংস্কার, অব্যাহতি হ্রাস ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর রূপরেখা জানতে চেয়েছে আইএমএফ। বাস্তবতা হলো, কারো পরামর্শ বা শর্ত বাস্তবায়নের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই কর সংস্কৃতির উত্তরণ অত্যাবশ্যক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে Sitting Duck অথবা Low Hanging Fruits-এর মতো সহজ শিকার ধরার কৌশল থেকে বের হয়ে এসে করদাতাদের আস্থা অর্জন সময়ের দাবি। ‘দেশের চলমান উন্নয়নকে টেকসই করতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিকল্প নেই’—অর্থমন্ত্রীর এ বাজেট বক্তৃতা থেকে ‘স্মার্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে অনুপাত বাড়াতে সরকারের তাগাদা অনুভব করা যায়। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রণীত হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘আয়কর আইন-২০২৩’। রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ সহজীকরণ ও প্রণোদনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছে বর্তমান বাজেটে।
বাজেটের দ্বিতীয় ভাগে থাকে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব। অ-অর্থনীতিবিদরা বাজেট বলতে বাজেটের ব্যয়ের হিসাবকেই বুঝে থাকেন। সম্ভাব্য ব্যয় চারটি ভিন্ন খাতে বিভক্ত করা হয়। অনুমোদিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় রাখা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি, খাদ্য হিসাবে ৫০২ কোটি, ঋণ ও অগ্রিম বাবদ পরিশোধ ৮ হাজার ৪২০ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার। বর্তমান বাজেটে ব্যয় সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং। বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে এসব নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার কর্তৃক ইতোপূর্বে গৃহীত ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঋণ পরিশোধ খাতে ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকার স্থলে বর্তমান বাজেটে রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৪২০ কোটি টাকা যা দ্বিগুণেরও বেশি। সে তুলনায় উন্নয়ন বাজেট বেড়েছে অতিসামান্য। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৭ কোটি থেকে ১৭ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে বর্তমান বাজেটে রাখা হয়েছে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৫৮২ কোটি টাকা। যদিও নির্বাচনী বছরে সরকার উন্নয়ন খাতে বেশি বেশি খরচ করবে বলে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। বরং বাজেটে বাধ্যতামূলক ঋণ পরিশোধ খাতে বেশি বরাদ্দের মাধ্যমে সরকারের দায়িত্বশীলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। মাত্রাতিরিক্ত ভর্তুকি নির্ভরশীলতা টেকসই অর্থনীতি অর্জনের পথে বড় অন্তরায়। জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার অব্যাহতভাবে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২২-২৩ অর্থবছর শুধু সার, সেচ, বীজ ইত্যাদি খাতে ‘প্রণোদনা অথবা ভর্তুকি’ বাবদ ব্যয় হয়েছিল ২৬ হাজার ৬৯২ দশমিক ৯১ কোটি টাকা। ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে এনে বর্তমান বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ হাজার ১২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যার ৬৯ দশমিক ৭৯ শতাংশই (১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা) আবার খরচ হবে ভর্তুকি বাবদ। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রবর্তন ও গবেষণা, বিশেষ করে চিকিৎসা গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা বর্তমান বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য।
বাজেটের তৃতীয় ভাগে থাকে অর্থায়নের হিসাব। বাজেটে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। এবারেরটিও তাই। ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থান করা হয় দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ করে। অনুমোদিত বাজেটের তৃতীয় ভাগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ ১ লাখ ৫১৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। ‘ঘাটতি বাজেট’ নীতিবাচক শোনালেও এটা নেতিবাচক কোনো বিষয় নয়। আইএমএফের তথ্য মতে, কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বাজেটই ‘ঘাটতি বাজেট’। যুক্তরাষ্ট্রের Office of Management and Budget কর্তৃক প্রকাশিত Budget of the US Government Fiscal Year মোতাবেক ২০২২ অর্থবছরে তাদের মোট ৬ হাজার ১১ বিলিয়ন ডলারের বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল তাদের জিডিপির (২৩ হাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার) ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের অনুমোদিত বাজেটে ঘাটতি ধরা আছে জিডিপির (৫০ লাখ ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা) ৫ দশমিক ২ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতির এ হার মোটেও আশঙ্কাজনক নয়, বরং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধারা বজায় রাখা হয়েছে বর্তমান বাজেটে।
মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোতে (এমটিবিএফ) বাজেট মূলত একটি তিন বছরের পরিকল্পনা। সংসদে অনুমোদিত বাজেট মূলত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাক্কলন এবং ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ। বাজেট বরাদ্দের খাতগুলোর ধরনে রাষ্ট্রের মৌলিক চিত্রের পাশাপাশি সরকারের দায়বদ্ধতা ও অগ্রাধিকার খাত ফুটে ওঠে।
ড. মনসুর আলম খান: উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়