আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট একটি বিস্ময়কর শিক্ষা দিয়েছে। সেটি হলো বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে অভিযোজনক্ষম। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এর প্রভাবে পড়ে। কিন্তু টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়তে বছরের পর বছর ধরে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার সুবাদে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিগুলো মোটামুটি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপ তাদের বিপুল তেল মজুদ কাজে লাগিয়েছে। চীনও একই পথ নিয়েছে। পাশাপাশি দেশটি তার শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, এমনকি পরিবহন ব্যবস্থায় গড়ে তোলা নমনীয়তাও কাজে লাগিয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহের পথ পরিবর্তন করেছে। যেসব উৎপাদক তাদের সরবরাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠায় না, তারা রফতানি বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ী ও শোধনাগারগুলোও দ্রুত সরবরাহ শৃঙ্খল নতুনভাবে সাজিয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের এক ব্যারেলেরও বেশি সংকটের আগের তুলনায় ভিন্ন পথে পরিবহন করা হয়েছে।
কিন্তু এসব অভিঘাত সামাল দেয়ার ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা আছে। মজুদ কমছে, শোধন সক্ষমতার ওপর চাপ এখনো রয়েছে এবং বিকল্প পরিবহন পথও বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাছাড়া বিশ্বের একটি অঞ্চলের টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা অন্য সব অঞ্চলেও একই ধরনের স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করে না। যেসব দেশের সংকটে সাড়া দেয়ার সুযোগ কম তাদের বেশি দাম ও সরবরাহ ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে কয়েক মাস ধরে বাণিজ্যিক তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সরবরাহ সীমিত ছিল। পাকিস্তানে আগস্টের শেষ দিকেও এলএনজি সংকট পর্যায়ক্রমিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অন্যতম কারণ ছিল।
এ প্রেক্ষাপটে কীভাবে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেটি এখন জরুরি প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি অর্থনীতিরই জ্বালানি প্রয়োজন, কিন্তু সেই জ্বালানি সরবরাহকারী সম্পদ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অসমভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ এমন অঞ্চলে বাস করে, যেখানকার অর্থনীতি অন্তত একটি প্রধান জ্বালানি আমদানি করে। চীন তার তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ভারত প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। ফলে বাণিজ্য অপরিহার্য। নির্ভরযোগ্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি।
কিন্তু বাণিজ্য এমন নির্ভরতাও সৃষ্টি করতে পারে, যা পরে দুর্বলতায় পরিণত হয়। কোনো দেশ হয়তো ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী অল্প কয়েকটি সরবরাহকারী কিংবা বিঘ্নের ঝুঁকিতে থাকা সীমিতসংখ্যক পরিবহনপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। হরমুজ প্রণালিই বিশ্বের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ নয়; জ্বালানি বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশই অন্তত একটি এ ধরনের পথ অতিক্রম করে।
৬৫টি দেশের ওপর আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে মজুদ কাজে লাগানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ ব্যবহার, বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজা কিংবা প্রয়োজনে এক ধরনের জ্বালানির বদলে অন্যটি ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। এতগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করায় শুধু আমদানিনির্ভরতার সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে। দুটি দেশ সমপরিমাণ জ্বালানি আমদানি করলেও সংকটে তাদের সাড়া দেয়ার সক্ষমতা একেবারেই ভিন্ন হতে পারে, কারণ একটি দেশের মজুদ বেশি থাকতে পারে কিংবা বিকল্প উৎসে প্রবেশাধিকার তুলনামূলক ভালো হতে পারে।
এমনকি বড় কোনো নিট রফতানিকারক দেশও নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলে সরবরাহ বিঘ্নে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ব্রাজিল অপরিশোধিত তেল রফতানি করে, কিন্তু দেশটির ডিজেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আমদানি করতে হয়। ইন্দোনেশিয়া এলএনজি রফতানি করলেও আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরশীল এবং পরিশোধিত জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতাও সীমিত।
সরকারগুলো এরই মধ্যে ঝুঁকি কমানো এবং সংকটে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তান একটি কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ গড়ে তোলার বিষয় বিবেচনা করছে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের মজুদ বাড়াচ্ছে। আর ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা বর্তমান প্রায় ২৫ দিনের চাহিদা থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনের সমপরিমাণে নিয়ে যাওয়া।
শুধু মজুদ দিয়েই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একইভাবে অন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে বা সংকটে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারলেও প্রতিটিরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিদ্যুতায়ন এবং দেশে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কাঠামোগতভাবে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য স্বল্প-নিঃসরণ প্রযুক্তিগুলো তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিমাণ আমদানি প্রতিস্থাপন করতে পারে, যা বর্তমান বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ২৬-৩১ শতাংশের সমান। তবে বাস্তবে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং বিদ্যমান সম্পদ প্রতিস্থাপনের গতি—এসব বিষয় নির্ধারণ করবে বিকল্প ব্যবস্থায় অগ্রগতি কত দ্রুত এবং কত বড় পরিসরে সম্ভব হবে।
নতুন তেল ও গ্যাস উৎপাদনও আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারে, কিন্তু সবার কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ কিংবা অনুকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নেই। দেশীয় কয়লা কিছু বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিকল্প সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে এর ফলে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুর মানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে। বাণিজ্য পথ নতুনভাবে সাজানোর মাধ্যমে সরবরাহকারী ও রুট বৈচিত্র্যপূর্ণ করা যায়, কিন্তু এজন্য এমন অবকাঠামো প্রয়োজন, যা নিজেও বিঘ্নের মুখে পড়তে পারে।
সহজভাবে বললে, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একক কোনো ব্যবস্থাপত্র নেই। কিছু কৌশলে বিকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করা হবে; অন্যগুলো গুরুত্ব দেবে মজুদ, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ অথবা বিকল্প সরবরাহকারী ও পরিবহন পথ তৈরির ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই এ দুটি পন্থা একসঙ্গে অনুসরণ করা হবে।
কোন কোন দুর্বলতা সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে এবং সীমিত বিনিয়োগ কোথায় করলে সবচেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করা সম্ভব—তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদের। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব দেশের রাজস্ব সক্ষমতা এবং সাশ্রয়ী মূলধনে প্রবেশাধিকার প্রায়ই সীমিত থাকে।
এ ধরনের বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হবে ঠিকই, কিন্তু তা না করলে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত আরো বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০২২ সালে লোডশেডিংয়ের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ১-৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গিয়েছিল। বর্তমান জ্বালানি সংকট ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য শেষ পর্যন্ত কতটা ব্যয় ডেকে আনবে, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে মোট ক্ষতির পরিমাণ যে উল্লেখযোগ্য হবে, তা প্রায় নিশ্চিত।
সহযোগিতার মাধ্যমে সীমিত সম্পদের কার্যকারিতা আরো বাড়ানো সম্ভব। আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে দেশগুলো যৌথভাবে মজুদ ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া সমন্বয়, আন্তঃসংযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণ অথবা তুলনামূলক ভালো শর্তে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। হরমুজ সংকটের প্রতিক্রিয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এরই মধ্যে একটি আঞ্চলিক জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
কোম্পানিগুলোর সামনেও একই চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যদিও সেটির পরিসর ভিন্ন। একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি, কাঁচামাল, সরবরাহকারী, বন্দর বা উৎপাদনস্থলের ওপর নির্ভরতাই একটি কোম্পানির দুর্বলতার কারণ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঝুঁকি বিভিন্ন সংকট পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করে দেখতে পারে এবং কোথায় নমনীয় কাঁচামাল, বিকল্প সরবরাহকারী, মজুদ, বৈচিত্র্যপূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা অথবা দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ যৌক্তিক হবে, তা নির্ধারণ করতে পারে। এ হিসাবের মধ্যে সংকটের সময় কার্যক্রম চালু রাখা এবং রাজস্ব ধরে রাখার সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
বর্তমান জ্বালানি সংকটই শেষ সংকট নয়। তাই আজই টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে—কোন কোন নির্ভরতা সামাল দেয়া হবে এবং কীভাবে তা করা হবে, সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলেই পরবর্তী সংকট আঘাত হানলে দেশ ও কোম্পানিগুলোর সামনে বিকল্প পথ খোলা থাকবে।
ডিয়েগো হার্নান্দেজ দিয়াজ: জেনেভায় ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানির একজন পার্টনার এবং ম্যাককিনজির গ্লোবাল এনার্জি পার্সপেকটিভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন
লুসিয়ানো ডি ফিওরি: হিউস্টনে ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানির একজন পার্টনার এবং ম্যাককিনজির এনার্জি সলিউশনসের নেতৃত্ব রয়েছেন
তিয়াগো দেভেসা: লিসবনে ম্যাককিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো