চ্যাটজিপিটি, গ্যারি ক্যাসপারভ ও সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি। গ্যারি ক্যাসপারভ তখন দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আইবিএম কম্পিউটার ডিপ ব্লুর সঙ্গে দাবা প্রতিযোগিতা চলছে রাশিয়ার এ গ্র্যান্ডমাস্টারের। ছয় ম্যাচের ফাইনালে সুপার কম্পিউটার ডিপ ব্লুকে হারিয়ে ম্যাচ জিতে নেন গ্যারি। ছয়দিনের ম্যাচটি শুরু হয় ১০ ফেব্রুয়ারি পেনসিলভানিয়া কনভেনশন সেন্টারে।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি। গ্যারি ক্যাসপারভ তখন দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আইবিএম কম্পিউটার ডিপ ব্লুর সঙ্গে দাবা প্রতিযোগিতা চলছে রাশিয়ার এ গ্র্যান্ডমাস্টারের। ছয় ম্যাচের ফাইনালে সুপার কম্পিউটার ডিপ ব্লুকে হারিয়ে ম্যাচ জিতে নেন গ্যারি। ছয়দিনের ম্যাচটি শুরু হয় ১০ ফেব্রুয়ারি পেনসিলভানিয়া কনভেনশন সেন্টারে।


সুপার কম্পিউটার ডিপ ব্লু সমর্থ ছিল প্রতি সেকেন্ডে দাবার ১০ কোটি চাল বিশ্লেষণে। খেলা শুরুর পর প্রথম ম্যাচটি ডিপব্লুর কাছে হেরে যান গ্যারি। তবে পরের ম্যাচে তিনি কম্পিউটারের শত কোটি তথ্য বিশ্লেষণী সক্ষমতাকে চূর্ণ করে দেন। তৃতীয় ও চতুর্থ ম্যাচটি ড্র হয়। পঞ্চম ম্যাচটিতে জয়ী হন ক্যাসপারভ। ১৭ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে সেই বিশেষ দিন, যেদিন সুপারকম্পিউটারকে হারিয়ে ৪-২ স্কোরে ম্যাচ জেতেন রক্তমাংসের মানুষ গ্যারি ক্যাসপারভ।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ওপেন এআই এক সেকেন্ডে কোটি কোটি তথ্য ধারণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে। প্রয়োজনমাফিক এর জুতসই প্রয়োগের প্রোগ্রামও রাখা আছে তাতে। মানুষের পক্ষে এক সেকেন্ডে কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করাটা কঠিন। তবে যন্ত্র আর মানুষের পার্থক্য হচ্ছে নতুন নতুন সৃষ্টিতে, সৃজনে। গ্যারি যখন দাবা খেলতে খেলতে সৃজনশীল কায়দায় চাল দিয়েছেন, যা ডিপ ব্লুর সিস্টেমে আপডেট ছিল না, তখন সে তা ধরতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবেই এটি তার বিপরীত উদ্ভাবনী কোনো চাল দিতে সক্ষম হয়নি। সে কারণেই মানুষের মৌলিক সৃষ্টিশীলতার কাছে হেরে যায় শত কোটি তথ্য ধারণ সক্ষমতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।


মাইক্রোসফটের ওপেন এআই চ্যাটজিপিটি ঘিরে রীতিমতো হইচই চলছে। শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্ক, অ্যাসাইনমেন্ট করার পাশাপাশি মাত্র কয়েক সেকেন্ডে কবিতা লেখার মতো এমন অনেক শিল্পিত কাজ করতে সক্ষম এটি। তাই ঘুরেফিরে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, তাহলে কি নিকট ভবিষ্যতে সৃজনশীল কাজগুলোতে প্রয়োজন ফুরাচ্ছে মানুষের?


প্রশ্ন উঠছে প্রযুক্তি যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকবে—প্রকৃতি না প্রযুক্তি? তথ্যবহুল আজকের পৃথিবীতে তো প্রযুক্তির জয়জয়কার। প্রযুক্তির বিপরীতে মানুষের সীমাবদ্ধতা শক্তি, বল ও তথ্য ধারণে। ভার্চুয়াল সহকারী অ্যালেক্সাকে যদি বলা হয় আজকের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলো কী? সে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহারকারীর সামনে একগাদা তথ্য এনে হাজির করে। তেমনি সার্চ ইঞ্জিন গুগলে একটা কোনো বিষয় লিখে খুঁজলে হাজারটা তথ্য চলে আসে নিমেষেই। প্রযুক্তির এ উত্কর্ষ মানুষের অনেক কাজকেই সহজ ও সাশ্রয়ী করে দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো ক্রমেই সম্পাদন করা হচ্ছে অটোমেশনের মাধ্যমে। কায়িক পরিশ্রমের কাজ অনায়াসে প্রযুক্তির মাধ্যমে করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা গেলেও মানুষের একান্ত সৃজনশীলতা, চিন্তার জায়গাগুলোতে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাগ বসাতে আসে, তখন খানিকটা খটকা লাগে বৈকি!


এমন অনেক অ্যাপস আছে যেখানে প্রয়োজন অনুসারে তাগাদা দিলে দারুণ সব ছবি চিত্রকর্ম এঁকে দেয়। কিংবা গার্ডিয়ান যেমন তাদের সম্পাদকীয় লিখিয়েছিল ওপেন এআই দিয়ে। বলা হচ্ছে এ কাজগুলোকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে মাইক্রোসফটের চ্যাটজিপিটি। যা মূলত একটি চ্যাটবট। এককথায় একটি রোবট। যেমন গুগল কিংবা টিকটক। অনলাইনে এ রকম চ্যাটবট আমরা প্রায়ই দেখি। যার নেপথ্যে কাজ করে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা। এর মাধ্যমে তথ্য অনুসন্ধান, ভিডিওচিত্র ধারণ তো আছেই তবে তার চেয়েও বড় ব্যাপার, এটি মানুষের মতো কথা বলে, প্রশ্নের জবাব দিতে পারে, উত্তরটি ঠিক মানুষের মতোই লিখে সাজিয়ে দিতে পারে।


চ্যাটজিপিটিকে কোনো একটি বিষয়ের ওপর একটি নিবন্ধ লিখে দিতে বললে, সে ঝটপট লিখে দিচ্ছে। তার এ দক্ষতা দিনে দিনে ঠিক কতটা চূড়ায় পৌঁছাবে, সে উত্তর রয়েছে ভবিষ্যত্ সময়ের কাছে। তবে মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি অবশ্য একে আগ্রাসী প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন। চ্যাটজিপিটি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেই মনে করেন তিনি। তাই চ্যাটজিপিটি উচ্চপ্রযুক্তি সক্ষমতাসম্পন্ন চুরির মাধ্যমে খেতাব দিয়েছেন তিনি। চমস্কি মনে করেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও সৃজনশীল শ্রম থেকে বাঁচতে এর আশ্রয় নিতে পারে।


চ্যাটজিপিটি নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, নিউইয়র্ক ও সিয়াটলের কিছু পাবলিক স্কুল চ্যাটজিপিটি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, একটি ফরাসি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়েছে, তারা যদি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাহলে তাদের বহিষ্কৃত পর্যন্ত করা হতে পারে। এছাড়া ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অর্থাত্ এরই মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে।


গবেষকদের একটি দলও অবশ্য মনে করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মোটেও মানুষের মতো সৃজনশীল নয়। এটি স্রেফ ধারণার অনুকরণ করতে পারে, সত্যিকারের মৌলিক কিছু তৈরি করতে পুরোপুরি অক্ষম। পৃথিবীতে যত উদ্ভাবনী ধারণা রয়েছে, তার মধ্য থেকে যা কিছু এর প্রোগ্রামে আপডেট করা থাকে তা বিশ্লেষণ করে এটি কেবল একটি ধারণা তৈরি করতে পারে। মানুষের সৃজনশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিল প্রক্রিয়ার ধারেকাছে নেই এটি। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতার যে বিস্তার ফারাক তা ডিঙানো মূলত খুব একটা সহজ হবে না।


যদিও ক্যাসপারভ ও ডিপ ব্লুর মধ্যকার পরবর্তী ম্যাচটি হয় ১৯৯৭ সালের ৩ মে। ততদিনে আইবিএমের তুখোড় প্রযুক্তিবিদেরা ডিপ ব্লুকে আরো উন্নত যন্ত্রের রূপ দেয়, আপগ্রেড করে। এবার ডিপ ব্লু প্রতি সেকেন্ডে ২০ কোটি দাবার চাল বিশ্লেষণে সক্ষম। প্রথম ম্যাচে যন্ত্র হেরে যায় মানুষের কাছে। দ্বিতীয় ম্যাচে জিতে যায় প্রযুক্তি। তবে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ম্যাচ ড্র হয়। ১১ মে শেষ ম্যাচে জয়ী হয় ডিপ ব্লু। এ জয়টি মূলত এগিয়ে দেয় আইবিএমের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রচার-প্রচারণার কাজকে। যদিও পরবর্তী সময়ে ক্যাসপারভ অভিযোগ করেন, খেলা চলাকালে ডিপ ব্লুকে বাইরে থেকে কোনো না কোনো মানুষ সাহায্য করেছে। তবে সে অভিযোগটি অস্বীকার করা হয় আইবিএমের পক্ষ থেকে। 


‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন সৃজনশীলতায় কখনো মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না’—এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান্টন ওলেইনিক। তিনি তার নিবন্ধে সৃজনশীল হওয়ার ক্ষেত্রে নিউরাল নেটগুলোর বড় ধরনের অসংগতির কথা তুলে ধরেন। নিউরাল নেট বা নেটওয়ার্ক হলো মানুষের মস্তিষ্ক দ্বারা অনুপ্রাণিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজের পদ্ধতি, যা মূলত কম্পিউটারকে ডেটা প্রক্রিয়ার নির্দেশ দেয়। এটি কেন সৃজনশীলভাবে তথ্য প্রক্রিয়া করতে পারবে না তার একাধিক কারণ তিনি তুলে ধরেছেন। এ প্রক্রিয়ার প্রথম অসংগতিটি হচ্ছে যখন কোনো একটি প্যাটার্ন পরিবর্তিত হয়, তখন তা চেনার অক্ষমতা। নিউরাল নেটগুলো প্রচুর পরিমাণে তথ্য শোষণ করে প্রতিটি প্যাটার্ন শনাক্ত করে অ্যালগরিদম শিখে। তবে একটি প্যাটার্নকে ভিন্ন প্যাটার্নের সঙ্গে মেলাতে ও প্যাটার্নটি কখন দিক পরিবর্তন করবে তা অনুমানের ক্ষেত্রে ঘাটতি বিদ্যমান।


এছাড়া আরো একটি বড় কারণ ওলেইনিক চিহ্নিত করেছেন যে নিউরাল নেটে মূলত সামাজিক বুদ্ধিমত্তার অনুপস্থিতি বিদ্যমান। অথচ সৃজনশীলতা বা নতুন নতুন উদ্ভাবনের কাজগুলো প্রায়ই সামাজিক সংযোগ ও সম্পর্কের মধ্যে নিহিত থাকে। এটি ইনপুট দেয়া তথ্যের বাইরে বৃহত্ পরিসরে পৌঁছতে অক্ষম। কল্পনাশক্তিহীন হয়ে সৃজনশীল হওয়াটা সম্ভব নয়। তাই দিন শেষে মানুষের চেতনাই তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে স্বতন্ত্র ও সৃজনশীল করে তোলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে মানুষের জন্মগত চেতনাটি বুনে দেয়াটা কঠিন তো বটেই, অসম্ভবও।


অ্যান্টন ওলেইনিক তাই খুব জোর গলায় বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনই মানুষের মতো বোধ সচেতন হবে না। তাই এটিতে কখনই উদ্ভাবনী চিন্তা কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত উপলব্ধি থাকবে না, যা শিল্প-সংস্কৃতির মোড় ঘোরাতে সক্ষম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প সৃষ্টিতে মানুষের পূর্ববর্তী সৃজনশীলতাকেই অনুকরণ করে। মানুষের আবেগ বোঝা ও ধারণ কিংবা সময়ের দাবি অনুসারে শিল্প তৈরির সক্ষমতা এর নেই। তাই তো গ্যারি ক্যাসপারভের মৌলিকতা ও সৃষ্টিশীলতার কাছে হেরে গিয়েছিল আইবিএমের কোটি তথ্য ধারণ সক্ষমতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

আরও