ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোট আমাদের রাজনৈতিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক মানুষের কাছে কেবল কে জিতেছে বা হেরেছে- এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং জনগণ যে আবারো ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উঠে এসেছে। ভোটারদের অংশগ্রহণ, জনসাধারণের বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণভাবে ভোটদান- এ বিষয়গুলো সাংবিধানিক ধারা এগিয়ে যাওয়ার একটি সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এ নির্বাচনে। একই সঙ্গে নির্বাচনটি পরিচিত দুর্বলতাগুলোও প্রকাশ করেছে—যেমন রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং জনগণের একটা বড় অংশের পছন্দের দল বা প্রতীকের অনুপস্থিতি। সেই অর্থে নির্বাচনটি এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কতটা কাজ বাকি আছে- তাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পথ কখনো মসৃণ ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে, আমাদের দেশটি গণতান্ত্রিক অনুশীলনে বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছে—কর্তৃত্ববাদী শাসন, প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণ এবং সংঘর্ষমূলক রাজনীতির ফলে ঐকমত্যের খুব কম জায়গাই ছিল। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি করা একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, যা প্রায়ই পক্ষপাত, বয়কট এবং রাস্তার আন্দোলনের অভিযোগ দ্বারা ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নিরপেক্ষ তথ্যের সীমিত অধিকার নাগরিকদের অর্থপূর্ণভাবে অংশগ্রহণের ক্ষমতাকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ বাধা সত্ত্বেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত একটি ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা জনসাধারণের মনের গহীনে বেজে উঠেছে সবসময়ই, যার আত্মপ্রকাশ বিভিন্ন সময়ে বিশালকায় আন্দোলন হিসেবে আমরা দেখেছি—তার মধ্যে ১৯৯০ এবং ২০২৪ উল্লেখযোগ্য।
বিএনপি একটি বিশাল ম্যান্ডেট অর্জন করেছে, যা নির্বাচনী জয়ের বাইরেও ভোটারদের কাছ থেকে স্পষ্ট আস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর, দায়িত্ব কেবল এক পক্ষের ওপর বর্তায় না। যারা সরকার গঠন করে তারা সব নাগরিকের জন্য শাসনের ভারী বোঝা বহন করে, এমনকি যারা তাদের সমর্থন করেনি তাদের জন্যও। তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখতে হবে এবং ক্ষমতার ব্যবহারে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। যারা জয়ী হননি তাদের কর্তব্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্বাসযোগ্য বিরোধীদল ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে সংসদ এবং জনসাধারণের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করাটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের রায় গ্রহণ বেদনাদায়ক হলেও এটি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার ভিত্তি।
প্রায় দুই দশক ধরে প্রান্তিকীকরণ এবং নিপীড়ন সহ্য করা একটি দলের জন্য, এ ফলাফলটি সত্য প্রমাণের একটি শক্তিশালী মুহূর্ত। আসল পরীক্ষা এখন সামনে, বিএনপিকে দেখাতে হবে যে তারা অতীতে নিজেদের এবং অন্যান্য ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন ত্রুটিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং এ শিক্ষার আঙ্গিকে ২০০১-০৬ সালের শাসনামল থেকে ভিন্নভাবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ পরিচালনা করতে প্রস্তুত।
নতুন ক্ষমতাশীল জোটের প্রথম সপ্তাহটি প্রায়ই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হয়। গণমানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সমন্বয় এবং বিরোধীদের সতর্কাবস্থান সময়টিকে অনেকাংশে স্পর্শকাতর করে তোলে। তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধার বা নিশ্চিত করা, সবাইকে নিয়ে কাজ করার ইঙ্গিত দেয়া এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে এমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগগুলো মোকাবেলা করা। প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলো আগামী মাসগুলোর জন্য আগাম বার্তা দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি এ সময়কালটি নম্রতা, স্বচ্ছতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তাহলে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি করা সম্ভবপর হবে। যদি ভুলভাবে পরিচালনা করা হয়, তবে এটি বিভাজনকে আরো গভীর করতে পারে।
পরিশেষে, নির্বাচন একটি শেষ বিন্দু নয় বরং একটি শুরু। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কেবল ব্যালটের ওপর নয়, বরং ধৈর্য, আপস নিয়ে এবং ভয় বা বলপ্রয়োগ ছাড়াই বিভাজন এবং মতপার্থক্যের সমাধানের জন্য একটি যৌথ প্রতিশ্রুতির ওপর টিকে থাকে।
সাইফুর রহমান: এফসিএমএ, সিজিএমএ, এসিসিএ: পেশাদার হিসাববিদ এবং একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা।