যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জনের পর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মূলধারার অর্থনীতি এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য দেখতে পান, বিশেষত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে। যদিও তিনি মূলধারার পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বে এবং ধারায় প্রশিক্ষিত ছিলেন, তিনি দেখতে পান যে এ মডেলগুলো অত্যধিক বিমূর্ত ও তাত্ত্বিক এবং দারিদ্র্যপীড়িত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউনূস বিশ্বাস করতেন যে মূলধারার মুক্তবাজার অর্থনীতি মূলত মুনাফা বৃদ্ধি ও বাজারের দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণকে অবহেলা করে। এ সমস্যা আরো প্রকট যেখানে সরকার, সরকারি খাত এবং বেসরকারি খাত সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্যবান্ধব নয়। এ উপলব্ধি তাকে ক্ষুদ্র ঋণ ও সামাজিক ব্যবসার মডেল তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে, যা দারিদ্র্য মোকাবেলা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিকল্প পথ হিসেবে গড়ে ওঠে। সারা বিশ্বেই অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়।
তবে তিনি একা নন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে অর্থনীতি নিজেই একটি কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে, যা আসে এ শাস্ত্রের অভ্যন্তর ও বাইরের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। অনেকেই যুক্তি দেন যে এটি বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সঙ্গে সঠিকভাবে সংযুক্ত নয়, যেমন আর্থিক সংকট, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও পরিবেশগত অবক্ষয়। এ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো যখন বাড়ছে, তখন একটি বিকল্প ঐকমত্য গড়ে উঠছে যে অর্থনীতি অতিমাত্রায় তাত্ত্বিক মডেলের ওপর নির্ভর করে, যা বাস্তব জীবনের জটিলতা থেকে বিচ্ছিন্ন। সমালোচকরা বলছেন, মূলধারার অর্থনীতি এখন বিচারের কাঠগড়ায় এবং এর অনুশীলন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন। এমনকি কিছু সমালোচক অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার বাতিল করার দাবিও করছেন। উল্লেখযোগ্য যে ১৯৭৪ সালে অর্থনীতিতে সাবেক নোবেল বিজয়ী গুনার মিরডাল ১৯৭৭ সালে রক্ষণশীল পুঁজিবাদী ধারার মিলটন ফ্রিডম্যান নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় যুক্ত হলে তিনি এ পুরস্কার বাতিলের দাবি তোলেন।
একটি প্রধান সমালোচনা হলো আধুনিক অর্থনীতি অত্যধিক সরলীকৃত ধারণার ওপর নির্ভরশীল। মূলধারার তত্ত্বে "যুক্তিতাড়িত অর্থনৈতিক এজেন্ট" (rational economic agent) ধারণাটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যা এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত হয়, যে সবসময়ই নিজের সন্তুষ্টি বা তৃপ্তি সর্বাধিক করার জন্য কাজ করে। সূক্ষ্মতা ও জটিলতার চমৎকারিত্বে বিমূর্ত বা কল্পিত মডেল তৈরির জন্য এটি কার্যকর হতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে এটির প্রাসঙ্গিকতা কম, যেখানে মানুষের আচরণ আবেগ, সামাজিক নিয়ম ও পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হয়। সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে এ বিমূর্ততা অর্থনীতিবিদদের বাস্তব সিদ্ধান্তের প্রেরণা উপেক্ষা করতে বাধ্য করে, যার ফলে অনেক তত্ত্ব প্রাসঙ্গিকতা হারায়।
তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যে এ বিচ্ছিন্নতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকের বড় বৈশ্বিক সংকটের সময়। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে, অর্থনৈতিক মডেলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পূর্বাভাস দিতে বা তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সতর্কসংকেতগুলো যেমন অটেকসই পর্যায়ের ঋণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্টগুলো পর্যবেক্ষণে থাকলেও মূলধারার মডেল এগুলো ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করেছিল। আসলে এ বিষয়গুলো অর্থনীতিসংক্রান্ত শিক্ষা-গবেষণায়, বিশেষ করে স্বীকৃত তত্ত্ব ও নীতিমালাসংবলিত ডগমা বা মতবাদ হিসেবে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকের মূল অংশের মধ্যেই থাকে না। সংকটের পর অনেক অর্থনীতিবিদই স্বীকার করেছেন যে তাদের মডেলগুলো বৈশ্বিক ব্যবস্থার জটিলতাগুলো ধারণ করতে যথেষ্ট ছিল না। নোবেল বিজয়ী পল ক্রুগম্যান স্বীকার করেছিলেন, ‘অর্থনীতির পেশা ভুল পথে চলে গিয়েছিল। কারণ অর্থনীতিবিদরা একটি দল হিসেবে চমকপ্রদ গণিতের ছদ্মবেশে ঢাকা সৌন্দর্যকে সত্য ভেবে ভুল করেছিল।’ (দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ২০০৯)।
সংকটের পূর্বাভাস দিতে না পারায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে অর্থনীতি বৈজ্ঞানিক কোনো শাখা বা ডিসিপ্লিন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত কিনা। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো যেখানে তত্ত্বগুলো প্রায়ই পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা যায়, অর্থনীতি পরিবর্তনশীল সামাজিক ব্যবস্থা এবং অপ্রত্যাশিত মানব আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অর্থনীতি বিজ্ঞানের চেয়ে শিল্পের বা আর্টের কাছাকাছি, যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রমাদপ্রবণ মানুষের বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন হয়। কেবল কঠোর গণিতের মডেলের ওপর নির্ভরতার ভিত্তিতে হতে পারে না। এটি অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারকে বিতর্কের মধ্যে নিয়ে এসেছে। সমালোচকরা প্রশ্ন করছেন, এমন একটি পুরস্কার এমন একটি শাস্ত্রের জন্য প্রযোজ্য কিনা যাতে অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো কঠোর পরীক্ষামূলক মানদণ্ডের অভাব রয়েছে। জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স মন্তব্য করেছিলেন, অর্থনীতিকে বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। কারণ এটি পদার্থবিদ্যা বা রসায়নের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। পরমাণু বা অণুর তুলনায় অর্থনীতি মানুষের খেয়াল-খায়েশ ও অযৌক্তিকতার দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত"(দ্য গার্ডিয়ান, ২০১৩)।
১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারটি মূল নোবেল পুরস্কারগুলোর একটি নয়। সমালোচকরা যুক্তি দেন যে এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের অর্থনীতি যা নব্য ক্ল্যাসিক মতবাদভিত্তিক অর্থনীতিকে প্রচার ও প্রবর্তিত করে এবং সামাজিক কল্যাণের ওপর বাজার দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়। অনেক নোবেল বিজয়ী মুক্তবাজার নীতিমালার পক্ষে ছিলেন, যা বৈশ্বিকভাবে বেসরকারীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার পক্ষে ছিল। সমালোচকদের মতে, এ নীতিগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বৈষম্য বাড়িয়েছে। ফলে কিছু লোক অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বাতিল করার দাবি জানাচ্ছেন। কারণ এটি এমন একটি শাস্ত্রকে অযৌক্তিকভাবে এমন মর্যাদা দিয়েছে যা এখনো সর্বজনীনভাবে গৃহীত নয়।
এ প্রেক্ষাপটেই সংস্কারের দাবি অর্থনীতির শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে। কারণ অনেকে যুক্তি দেন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম নব্য ক্ল্যাসিক তত্ত্বের ওপর অত্যধিকভাবে নির্ভরশীল যা বাজার এবং দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু মানবকল্যাণের মতো বৃহত্তর বিষয়গুলো উপেক্ষা করে। বিকল্প চিন্তাধারা, যেমন পরিবেশগত ও আচরণগত অর্থনীতি প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বা গুরুত্বহীনভাবে বিবেচিত হয়। ফলস্বরূপ, অর্থনীতির শিক্ষায় আরো বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি আন্দোলন গড়ে উঠছে, যা মূল ধারার বাইরেও বিভিন্ন মতামতকে স্বীকৃতি দেয় এবং নব্য ক্ল্যাসিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলোকে তুলে ধরে।
একটি সক্রিয় দল, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর প্লুরালিজম ইন ইকোনমিকস, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটি যুক্তি দেয় যে অর্থনীতির শিক্ষার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের আজকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ও সঠিকভাবে প্রস্তুত করে না। দলটি একটি আন্তর্বিভাগীয় পদ্ধতির আহ্বান জানায় যা সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যার অন্তর্দৃষ্টিগুলোকে একীভূত করে। অর্থনীতিবিদ কেট রাওয়ার্থ, যিনি তার ডোনাট ইকোনমিকস (২০১৭) মডেলের জন্য পরিচিত, এ দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক। তার মতে, আমাদের এমন একটি অর্থনীতির প্রয়োজন, যা ২১ শতাব্দীর জন্য উপযোগী, যা সমাজ ও পরিবেশের মধ্যে অর্থনীতিকে স্থাপন করে, এমন কিছু নয় যা ওগুলোকে বিসর্জন দিয়ে প্রবৃদ্ধির পেছনে ছোটে।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠ্যক্রমে আরো বৈচিত্র্যময় মতামত অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ পরিবেশগত অর্থনীতি, যা অর্থনীতিকে পরিবেশের একটি উপব্যবস্থা হিসেবে দেখে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় মনোযোগ আকর্ষণ করছে। আচরণগত অর্থনীতি, যা মনোবিজ্ঞানের অন্তর্দৃষ্টিগুলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মডেলে অন্তর্ভুক্ত করে, ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো প্রথাগত, নব্য ক্ল্যাসিক তত্ত্বভিত্তিক মূলধারাকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং সেসব ধারায় লেখা পাঠ্যপুস্তকগুলোই শিক্ষা কার্যক্রমে একচ্ছত্র প্রাধান্য পায়।
সংস্কারের প্রচেষ্টা কেবল পাঠ্যক্রম প্রসারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকরা যুক্তি দেন যে অর্থনীতিতে দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধির ওপরে মানবকল্যাণ এবং স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ পরিবর্তন সম্পদের বাজারভিত্তিক সর্বোত্তম বণ্টন ব্যবস্থার এ অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং সরকারের ভূমিকা, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নিয়মগুলো অর্থনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা তুলে ধরবে। সাবেক বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী জোসেফ স্টিগলিটজ বলেছিলেন, ‘অর্থনীতিকে একটি বিস্তৃত বুনিয়াদের ওপর পুনর্গঠন করতে হবে, যা অসমতা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর কেন্দ্রীয়তাকে স্বীকৃতি দেয় এবং এটি বোঝায় যে বাস্তবে অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে।’ (দ্য প্রাইস অব ইনইকুয়ালিটি, ২০১২)।
এ লেখকও একজন অর্থনীতিবিদ আর তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে অর্থনীতিশাস্ত্র যে মর্যাদা পেয়ে আসছে তার আমিও ভাগীদার। কিন্তু একজন মানুষ ও সমাজবিজ্ঞানের বৃহত্তর পরিসরের একজন হিসেবে অর্থনীতিকে কীভাবে আরো জীবনঘনিষ্ঠ এবং অসমতাবিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়, সে আকাঙ্ক্ষার গুরুত্ব হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের পথিকৃৎ ভূমিকা ও ত্যাগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফল হিসেবে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য আকাঙ্ক্ষিত সংস্কারের ধারার অংশ হিসেবে অর্থনীতির সংস্কারও প্রয়োজন। সম্ভবত বাংলাদেশেও অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতিশাস্ত্র সংস্কারের বিষয়ে এবং এটি কীভাবে শেখানো ও অনুশীলন করা উচিত, সে বিষয়ে একটি নতুন আলোচনা শুরু করতে পারেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনীতিবিদরা জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো অধ্যয়ন, গবেষণা ও সমাধানে আরো কার্যকরী ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি