কেন ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছিল? দুই বছরে আমরা কী শিখলাম, যাতে ভবিষ্যতে আবার রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে কিছু কনটেক্সট পরিষ্কার করা জরুরি।
গণতন্ত্র ও লিবারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক ধারণা হলো, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। একজন নেতা ভুল করতে পারেন। একটি রাজনৈতিক দল ভুল করতে পারে। এমনকি একজন ভোটারও ভুল করতে পারেন। এ কারণে লিবারেলরা যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রস্তাব করেন, অর্থাৎ গণতন্ত্র, সেখানে সেল্ফ কারেকশনের সুযোগটি সবসময় থাকে।
ধরুন একজন ভোটার একটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিলেন। পাঁচ বছর পর তার মনে হলো, আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল না। তখন তিনি বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিলেন। আরো পাঁচ বছর পর তার মনে হতে পারে, বিএনপিকে বেছে নেয়াও ঠিক হয়নি। তখন তিনি হয়তো তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক দলকে বেছে নেবেন। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট টাইম লিমিট থাকার কারণে ভোটার প্রতিবার তার আগের সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ পান। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে আজীবনের জন্য নিজেকে সমর্পণ করেন না। একটি দলও চিরদিনের জন্য রাষ্ট্রের মালিকানা পায় না।
এ ব্যবস্থা টিকে থাকার একটি পূর্বশর্ত হলো, সেখানে অন্তত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল থাকবে। এর বেশিও থাকতে পারে। তবে আলোচনার সুবিধার জন্য যদি আমরা দুটি দল ধরি, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাদের বিরোধ থাকবে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া একমত থাকবে। ব্যবস্থাটি টিকে থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট হলো একটি বড় ও স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ মধ্যবিত্তের একটি নিজস্ব লাইফস্টাইল থাকে। এ শ্রেণী মনে করে, তার লাইফস্টাইল টিকিয়ে রাখতে হলে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দরকার। নিয়মিত নির্বাচন দরকার। আইন দরকার। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর দরকার। কারণ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার চাকরি, ব্যবসা, সম্পত্তি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক নিরাপত্তা সবই হুমকির মুখে পড়বে। সেখান থেকেই রাজনৈতিক দল ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি তৈরি হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের নিয়ম মেনে চলবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী সে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করবে। এ সামাজিক চুক্তিতে ব্যত্যয় ঘটলে সংকট শুরু হয়। কোনো একটি বা উভয় দল সুযোগ পেলেই যদি এ চুক্তি থেকে সরে যায়, তাহলে ক্ষমতা গ্রহণ, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং দেশ পরিচালনার যে সাইকেল তৈরি হয়, তাকে আর গণতান্ত্রিক বলা যায় না। এবার বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন। তৎকালীন প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং সেই সময়কার মধ্যবিত্ত শ্রেণী একটি মৌলিক মীমাংসায় পৌঁছেছিল। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি হিসেবে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনকে বেছে নিয়েছিল। মোটামুটি ২০০১ সাল পর্যন্ত নির্বাচন করে সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থাটি টিকে ছিল।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির কাছ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে ক্ষমতা যায়। অর্থাৎ নব্বইয়ের পর অন্তত একটি জায়গায় বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একমত ছিল। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নির্বাচন। ক্ষমতা ছাড়ার পথও নির্বাচন।
২০০৬ সালে এ সামাজিক চুক্তির মধ্যে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। একই সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ আজিজের নিয়োগ এবং ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। ভোটার তালিকায় বিপুলসংখ্যক ভুয়া ভোটারের অভিযোগ ওঠে। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ওপর বিরোধী দলের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।
বিএনপি-জামায়াত সরকার হয়তো ভেবেছিল, আইনের মধ্যে থেকে সামান্য কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচনকালীন ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে রাখা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থার সমস্যা হলো, সেখানে সামান্য অবিশ্বাসও পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ আন্দোলনে নামে। আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়।
এ সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি সিভিল সোসাইটির ব্যক্তিরা। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সিভিল সোসাইটির একটি অংশ অত্যন্ত ভয়ংকর একটি খেলায় মেতে উঠেছিল। সেটি ছিল ‘মাইনাস টু’ নীতি। অর্থাৎ দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের দুই জনপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা। তখন বলা হয়েছিল, দুই নেত্রীই সব সমস্যার উৎস। তাদের সরিয়ে দিলে নতুন রাজনীতি তৈরি হবে। রাজনীতি শুদ্ধ হয়ে যাবে। নতুন করে রাষ্ট্র গড়া যাবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
সেনাসমর্থিত সরকার অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন আয়োজন করে তারা ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ায়। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি, অর্থাৎ নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সামাজিক চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিল। তার ফল ছিল দুই বছরের একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী শাসন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। নিয়ম অনুযায়ী ২০১৪ সালে তাদের পরবর্তী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানেও আওয়ামী লীগ বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি পরিকল্পিত ও সফলভাবে সেই সামাজিক চুক্তি ভেঙেছে। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়। ৩ জুলাই সেটি আইনে পরিণত হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়। এটি ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যে সামাজিক চুক্তি হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে দুই দলই সুযোগমতো তা অস্বীকার করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছিল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগকে অস্বীকার করেছে। এর মাধ্যমে ১৯৯০ সালের পর যে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে আমরা গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার জায়গায় একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিরোধী দল ও মতের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ বিষয়কে বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কারণ মানুষের নিজের ভুলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সংশোধনের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ আর ছিল না।
এ সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মূল ভিত্তি ছিল সাধারণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে আসা একটি পেশাজীবী শ্রেণী। তারা সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ শ্রেণীর একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে উদার রাজনৈতিক ভাষার মধ্যে বড় হয়েছিল। তারা একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রকে নিজেদের লাইফস্টাইলের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করত। কিন্তু দুই দশকে এ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সীমানা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে নতুন নতুন গোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে। এ নতুন গোষ্ঠীর একটি অংশ জীবনের কোনো পর্যায়ে মাদরাসায় পড়েছে এবং অন্য কোনো পর্যায়ে সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। ফলে তাদের সামাজিক পরিচয় ও রাজনৈতিক কল্পনা পুরনো মধ্যবিত্তের মতো নয়।
মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক উৎসও বদলেছে। এখন তারা শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল নয়। বেসরকারি পুঁজি, করপোরেট চাকরি, তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংক, এনজিও, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপরও তারা নির্ভরশীল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বহু পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান বদলে দিয়েছে। এর সঙ্গে নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এসেছে। নতুন স্বপ্ন এসেছে। নতুন রাজনৈতিক ভাষাও এসেছে।
এ নতুন মধ্যবিত্তের একটি অংশ গণতন্ত্র ও নির্বাচন ফেরত চেয়েছে। আবার অনেকেই উদার গণতন্ত্রের বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা ভেবেছে। তাদের কারো কাছে সে বিকল্প হলো ইসলামী শাসন ব্যবস্থা। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে যেমন দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দিক থেকে সামাজিক চুক্তির লঙ্ঘন ঘটেছে, ঠিক তেমনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বভাব, প্রকৃতি, বিস্তৃতি ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষারও পরিবর্তন ঘটেছে। ২০০০ সালের পর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুলসংখ্যক উচ্চ শিক্ষিত তরুণ তৈরি করেছে। অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী একটি বড় গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে তারা সমাজের পেশাজীবী বা এলিট পরিসরে প্রবেশের সম্ভাব্য প্রার্থী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে পরিমাণ সম্ভাব্য এলিট তৈরি করেছে, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি সে পরিমাণ এলিট স্পেস তৈরি করতে পারেনি। সবাই ভালো চাকরি পায়নি। সবাই গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, ব্যবসা বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। অনেকেই দেখেছে, তাদের শিক্ষা ও যোগ্যতার তুলনায় রাজনৈতিক যোগাযোগ, পারিবারিক পরিচয় অথবা দলীয় আনুগত্য বেশি কার্যকর। ফলে এখানে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সে প্রতিযোগিতা থেকে এক ধরনের এলিট বিরোধিতাও জন্ম নিয়েছে। একটি অদৃশ্য এলিট শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সংগ্রামের ভাষা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে জনপ্রিয় হয়েছে।
সুযোগটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের একটি অ্যানার্কিস্ট অংশ খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। তারা পেরিফেরি থেকে নিজেদের পাবলিক পরিসরের মূলধারায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। পুরো বিষয়টি সংক্ষেপে বললে দাঁড়ায় ২০২৪ সালে এসে কয়েকটি সংকট একসঙ্গে জমা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ ২০১৪-২৪ সাল পর্যন্ত একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। গুম, হত্যা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক মামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিসর সংকীর্ণ করা হয়েছিল। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া সম্ভাব্য এলিটদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত চাকরি ও সামাজিক মর্যাদার সুযোগ পায়নি। তাদের একটি অংশ অ্যানার্কিস্ট বয়ানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে সমাজের আরেকটি বড় অংশ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ফেরত চেয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় দমনের স্বীকার হয়েছে। সব মিলিয়ে একটি প্রচণ্ড শক্তি তৈরি হয়েছিল। সে শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল এর তাৎক্ষণিক সূচনা। কিন্তু ক্ষোভ জমেছিল বহু বছর ধরে। রাষ্ট্রীয় দমন, হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য সে ক্ষোভকে আরো বিস্তৃত করে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেয়। ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। এর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কর্তৃত্বে একটি ভয়ংকর শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। পুলিশ ও প্রশাসনের একটি বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো প্রায় ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
অর্থাৎ বিগত ২৪ বছরে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবর্তন, সম্ভাব্য এলিটদের বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস রাষ্ট্রকে প্রায় পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আর কতবার এ ধরনের ধ্বংসের মুখে যেতে পারবে? আমরা কি প্রতিবারই একটি সরকারকে সরাতে গিয়ে রাষ্ট্রকাঠামোকেও ভেঙে ফেলব? নাকি এ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিখব?
আমাদের এমন একটি নতুন সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে। তীব্র বিরোধ থাকবে। ইতিহাস, ধর্ম, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দলগুলোর অবস্থান আলাদা থাকবে। কিন্তু গণতন্ত্র ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল সেই সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ করবে না।
নির্বাচন হবে। নির্বাচনে হারলে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রের স্থায়ী মালিক হতে পারবে না। ক্ষমতা হারানো কোনো নেতার জন্য হত্যা, কারাগার বা নির্বাসনের স্বাভাবিক পথে পরিণত হবে না। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন নয়। জুলাইয়ের বড় শিক্ষা হলো, ভোটের মাধ্যমে সেল্ফ কারেকশনের পথ বন্ধ করে দিলে সমাজ একসময় বিস্ফোরণের পথ বেছে নেয়।
আসিফ বিন আলী: ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র