আলোকপাত

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে চাই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি

তাত্ত্বিকভাবে ধনতান্ত্রিকতায় সামষ্টিকভাবে অবমূল্যায়িত কাজ বেশি দিন টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু তথ্য না মানে এই তত্ত্ব। যে ধনতান্ত্রিক সমাজে পুঁজি যাওয়ার কথা সঠিক মেধা, দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনার পেছনে, সেখানে নানা ফন্দিফিকিরে আটকা পড়ে আছে আমাদের সুপ্ত বাসনা; মেধারা ধুঁকছে অপ্রকাশিত যন্ত্রণায়; নিয়মিত দায়পরায়ণতা জাগায় বিস্ময়, নৈতিক স্বাভাবিকতা হয়েছে অকাল। আমরা স্বাভাবিক

তাত্ত্বিকভাবে ধনতান্ত্রিকতায় সামষ্টিকভাবে অবমূল্যায়িত কাজ বেশি দিন টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু তথ্য না মানে এই তত্ত্ব। যে ধনতান্ত্রিক সমাজে পুঁজি যাওয়ার কথা সঠিক মেধা, দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনার পেছনে, সেখানে নানা ফন্দিফিকিরে আটকা পড়ে আছে আমাদের সুপ্ত বাসনা; মেধারা ধুঁকছে অপ্রকাশিত যন্ত্রণায়; নিয়মিত দায়পরায়ণতা জাগায় বিস্ময়, নৈতিক স্বাভাবিকতা হয়েছে অকাল। আমরা স্বাভাবিক কাজকেই বিস্ময়কর বলে উদযাপন করি। একজন শিক্ষক ভালো পড়াবেন, একজন পুলিশ নাগরিকের নির্ভরতার স্থল হবেন, একজন আমলা, রাজনীতিবিদমাত্র জনগণের সেবক হবেন, বিচারালয় ন্যায়বিচার প্রদান করবেন, একজন দায়িত্ববান নাগরিক সময়মতো সঠিক কর দেবেন—এটাই তাদের দায়িত্ব, এটাই তাদের কাজ। কিন্তু বাগাড়ম্বর বিশেষণ ব্যবহার করে আমাদের মনে করিয়ে দিতে হয় স্বাভাবিক, নিয়মিত ব্যবহার কোনটা। তবে গোটা বিশ্ব যেখানে ধনতান্ত্রিকতায় আটকা, আমাদের সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে সমাজতান্ত্রিকতায় ফেরার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ দেশেই সমাজতান্ত্রিক দলগুলো ধনতান্ত্রিকতারই দায় মিটিয়ে চলেছে। এই ব্যবস্থাতেই আমাদের উন্নয়ন ও মুক্তি খুঁজে পেতে হলে নিশ্চিত করতে হবে সক্রিয় জবাবদিহিতা। এখানে সেই বিষয়ে আলোকপাত করছি। 

‘সক্রিয় জবাবদিহিতা’ হলো নিয়মিত, সর্বগ্রাসী, আগাম জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। হাজার চুরি থেকে হঠাৎ এক চুরি ধরে তাকে ঢাকঢোল পিটিয়ে শাস্তি দেয়াটা সক্রিয় জবাবদিহিতা নয়। চুরি করতে পারার প্রক্রিয়াটা বরং এত বিস্তারিত হওয়া চাই যেন চুরি ধরা পড়ে মাঝপথে, নিয়মিতভাবে, ব্যাপ্তি ছোট থাকতেই। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এমন ব্যবস্থা? কে তৈরি করবে এমন ব্যবস্থা? কারা যুক্ত থাকবে এতে? আমার মনে হয়, সর্বব্যাপী এক আন্দোলন দরকার এতে, যাতে নেতৃত্ব দান করবে আমাদের নির্বাচিত সরকার এবং বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা। নারীর সক্রিয় ক্ষমতায়নকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নও করতে হবে দ্রুত। উপস্থাপন সহজ করার জন্য আমরা এই বিক্ষিপ্ত ভাবনার বলয়কে পাঁচ ভাগে  সরলীকরণ করতে পারি—ভোগের স্থল, উৎপাদনের স্থল, আর্থিক মাধ্যম স্থল, ত্যাগের স্থল এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার স্থল। কিছু উদাহরণ সঙ্গে পেশ করছি। 

ভোগের স্থল: ধনতান্ত্রিক সমাজে বিরাজমান দুর্নীতিতে আঘাত করতে গেলে তার একেবারে গোড়ায় হাত দিতে হবে। এতে মাথা হিসেবে ভোগের স্থল ভাবতে হবে। প্রধান ভোগের স্থল হলো পরিবার। পরিবারে আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশে নারী-পুরুষ সবার অধিকার থাকলে একে অন্যকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন বাজেটের বাইরে কেনাকাটা কোত্থেকে হচ্ছে, অর্থের উৎস কী? ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও আলাপ করা যায় উপার্জনকারী সদস্যের আয় কত এবং তাতে কীভাবে সবাই মিলেমিশে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে একেবার ব্যক্তি পর্যায়ে অল্প বয়স থেকেই একটা আর্থিক দায়বদ্ধতার প্রচলন না করে উপায় নেই। খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করলে সন্তানদের অনেক অপ্রয়োজনীয় চাওয়া কমে আসতে পারে। অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার ব্যাপার ছাত্রছাত্রীদের স্কুল-কলেজে শেখানো যেতে পারে। তার জন্য চাই স্কুল-কলেজে শিক্ষার পরিবেশ, সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতামূলক শিক্ষা সংস্কার। কিন্তু স্কুুল-কলেজে পরিচালনা পর্ষদে থাকা প্রভাবশালীরা কি তাদের হস্তক্ষেপ বাদ দিতে সবসময় রাজি থাকবে? পুরুষতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব আজও যে পারিবারিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান, তা পরিবর্তনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আমাদের পুরুষরা কি প্রস্তুত? 

উৎপাদনের স্থল: উৎপাদনের জায়গায় সুযোগ আছে নানা পুকুর চুরির। পাইকারি হারে ব্যাংক লোন প্রভিশনিং, খেলাপি সংস্কৃতি, ওভার ইনভয়েসিং এসবের সঙ্গে আমরা সবাই কিছু না কিছু পরিচিত। কিন্তু এদের ব্যবসা বিদ্যালয় বা অর্থনীতি শাস্ত্রের করিতকর্মা কৌশল হিসেবে দেখার ঢঙ বাদ দিতে হবে। এরা নিয়মিত দুর্নীতি, চুরি; মূল্যমান যা না, তা দিয়ে দেয়ার অপকর্ম। সাপ্লায়ার-ডিস্ট্রিবিউটর-বায়ার সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা উৎপাদন স্থলের সংঘটিত সম্ভাব্য মন্দ চর্চাকে আনতে পারি নিয়মিত দেখভালের আওতায়। করের অধীনের যে আয়, তার বাইরে আয় দিয়ে উৎপাদন পুঁজি ব্যবহার তা সর্বব্যাপী নীরিক্ষার আয়োজন দরকার। খদ্দেরদের অনিয়মিত আয়কে উৎস ধরে ভোক্তাঋণ  বা অন্যান্য ভোক্তা অধিকার দেয়ার কোনো সুযোগ থাকলে তা সংকুচিত করতে হবে। 

আর্থিক মধ্যস্থতাকারী স্থল: আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় পুকুর চুরির অবদান রেখেছে। পরিতাপের বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠান ঢাকঢোল পিটিয়ে, অনেক কঠিন পরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের মেধাবীদের চাকরিতে নিয়োগ দেয়। আর এই মেধাবীদের অনেকেই মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন অনায়াসে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, ক্ষমতায় থাকা লোকদের হুমকি-ধমকিকে দোষারোপ করা হয়। এ জায়গায় সরকারের দায় আছে নিয়মিত স্বচ্ছতা, সক্রিয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার। এক্ষেত্রে একেবারে লোন-লেভেলে সরাসরি পাবলিক রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যে গড়পড়তা ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট প্রকাশ (ব্যালান্স শিট, ইনকাম স্টেটমেন্ট ও ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট) করে কোনো স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না, দায়বদ্ধতার হিসাব থাকে না, তাতে সাধারণ মানুষের কোনো মুক্তি নেই। 

ত্যাগের স্থল: কালো টাকা সাদা করার একটা আলোচনা চালু আছে। এটা প্রতি বাজেটেই আসে। অনুদান ইত্যাদির মাধ্যমেও অনেক কর ফাঁকি দেয়া যায়। অনুদানের অনেক সুবিধা আছে। কিন্তু এটাতে স্বচ্ছতা থাকবে না কেন? অভিযোগ আছে বিদেশ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি অনুদান এনে অনেক এনজিও ঠিকই ধনপতিদের মতো কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ সত্য কতটুকু? প্রজ্ঞাবান আহমদ ছফা একসময় অনুতাপ করে বলেছিলেন, এনজিওগুলো ছোট অবস্থায় সামাজিক আন্দোলন এবং সমাজসংস্কারে বেশ ভালো কাজ করে। তবে আকার বড় হলেই তারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করে। আসলে কি এখনো তা-ই? তা জানতেই দানতান্ত্রিক (ফিলন্ত্রোপিক) কাজ থেকে শুরু করে এনজিও পর্যন্ত সবাইকে সক্রিয় জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।  

সরকারি ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল বাংলাদেশে সরকারি প্রজেক্টে অনেক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বিভিন্ন স্তর—ইউনিয়ন পরিষদ, থানা, জেলা ইত্যাদিতে তা প্রতিষ্ঠা না করে কী উপায় আছে! জনগণ যেখানে নিজেদের অধিকারকে প্রভাবশালীদের দান-খয়রাত মনে করে পুলক অনুভব করে, সেখানে এক সমন্বিত দায়িত্ব ও অধিকারবোধের জাগরণ ছাড়া কী উপায় আছে? এ জাগরণ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপড়ানোর দায় কিন্তু রাজনৈতিক। তাছাড়া যারা বেশি আয় এবং বেশি করের মানুষ, তাদের কর প্রদানের হিসাব জনগণের জানার অধিকার থাকবে না কেন? 

পরিশেষে বলতে চাই, ধনতান্ত্রিক পুঁজির অপব্যবহার দূর করতে কালেভদ্রে এক-দুই চোর ধরে পড়ে তাকে ঢালাওভাবে সাফল্য হিসেবে উদযাপন করে তেমন কিছু হবে না। বরং চাই সর্বব্যাপী জবাবদিহিতামূলক পরিবেশ। বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাষায়, ‘মানুষের মনের অমঙ্গলকর প্রবণতাগুলো দমন করে কল্যাণকর প্রবণতাগুলোর বিকাশ ঘটাতে হলে তার পূর্বশর্ত হচ্ছে বাস্তব মানবিক পরিবেশের অনুকূল পরিবর্তন সাধন (অনুবাদ এ কে ফজলুল হক)।’ সমাজের প্রতিটি স্তরে সক্রিয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা সেই রকম এক পরিবেশ সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ্বাস। এটাকে ইউটোপিয়া বা স্বাপ্নিক আলাপ বলতে পারেন। কিন্তু এ রকম স্বপ্ন দেখেই আমাদের মা-বাবারা এনে দিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ। তাই যদিও পথ অনেক দূর, সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে তা হয়তো এনে দিতে পারে আরেকটি বিজয়; সে প্রত্যাশা অমূলক নয়। 


আব্দুল্লাহ শহীদ: পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান, কর্নেল ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আরও