সময়ের ভাবনা

ই-কমার্স: আস্থার সংকট কাটাতে পারবে কি?

আধুনিক মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় এক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ই-কমার্স। বিশেষ করে ঘরে বসেই মুঠোফোনের স্ক্রিন বা পিসি অথবা ল্যাপটপের পর্দায় এক ক্লিকেই পণ্য অর্ডার করার এ সুযোগ এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাজার করার চেনা দৃশ্য বদলে গিয়ে মোটরসাইকেলে করে ডেলিভারি এক্সিকিউটিভরা মানুষের ঘরে ঘরে বাজার পৌঁছে দিচ্ছে, এ দৃশ্য এখন শহরজুড়ে দেখা যায়। প্রথমদিকে মানুষ

আধুনিক মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় এক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ই-কমার্স। বিশেষ করে ঘরে বসেই মুঠোফোনের স্ক্রিন বা পিসি অথবা ল্যাপটপের পর্দায় এক ক্লিকেই পণ্য অর্ডার করার এ সুযোগ এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাজার করার চেনা দৃশ্য বদলে গিয়ে মোটরসাইকেলে করে ডেলিভারি এক্সিকিউটিভরা মানুষের ঘরে ঘরে বাজার পৌঁছে দিচ্ছে, এ দৃশ্য এখন শহরজুড়ে দেখা যায়। প্রথমদিকে মানুষ শুধু প্রসাধনী, অ্যাকসেসরিজ এবং নন-পেরিশেবল আইটেম (অপচনশীল দ্রব্য) অর্ডার করলেও বর্তমানে তরিতরকারি, মাছ-মাংস, ডিম, ফল এবং শাকসবজিও অনলাইনে অর্ডার করছে। এক্ষেত্রে অভিযোগের সংখ্যাও বিস্তর, তবে রিটার্ন এবং রিপ্লেসমেন্টের পলিসি থাকায় পণ্য ফেরত নিয়ে গুণগতমানসম্পন্ন সঠিক পণ্য দেয়ার কারণে অনেক ক্রেতা এখনো অনলাইনবিমুখ হননি।

তবে পণ্য ফেরত নেয়ার পর নগদ টাকা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ই-কমার্স কোম্পানির অ্যাকাউন্টে টাকা রিফান্ড করার নিয়ম রয়েছে, যেটা অনেক গ্রাহক মানতে পারেন না। কারণ ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেমে নগদ টাকা দিয়ে পণ্য কেনার পর একজন গ্রাহক স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকা ফেরত চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রিফান্ড করে দেয়া টাকার মাধ্যমে সে কোম্পানি থেকে পরবর্তীতে অন্য কিছু কেনার সুযোগ থাকায় এ নিয়মটিকে খুব একটা অস্বাভাবিক বলেও গণ্য করা যায় না। তাছাড়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে পেমেন্ট করলে টাকা  এমএফএসের ওয়ালেটে নেয়া যায়, সেজন্য সর্বোচ্চ সাতদিনের সময়সীমার কথা বলা হয়।

দৃশ্যত ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে কেনাকাটা করার এ প্রেক্ষাপট স্বাভাবিক মনে হলেও গ্রাহকরা খুব সহজে অভ্যস্ত হতে পারছে না। যে কারণে দেখা যায় যে অনলাইনে অর্ডার করে সময়মতো পণ্য না পেয়ে পরে বাসার সামনের গ্রোসারি বা কনফেকশনারি থেকেই সে প্রডাক্টটি কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় ডেলিভারি না পাওয়ার অভিযোগ থেকে ই-কমার্স সাইটগুলো মুক্ত হতে পারেনি। এবং সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো কোনো প্রডাক্ট ডেলিভারি দিতে দেরি হলে এটাকে ই-কমার্স কোম্পানিগুলো কিছু মনেই করে না। যে কারণে নির্দিষ্ট সময়ের ৫/৬ ঘণ্টা পর প্রডাক্ট নিয়ে এসে খুব স্বাভাবিকভাবেই ডেলিভারি দিয়ে যায়। কিন্তু এটা যে কোম্পানির প্রতি গ্রাহকের আস্থার সংকট তৈরি করে, সেটা আমলে নেয়া না হলে এ অনলাইন ব্যবসা ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়বে তা কোম্পানিগুলোর বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশে প্রথম ই-কমার্স শুরু হয় ২০০০ সালে, সাইটটির নাম মুন্সিজি ডটকম। বস্তুত ২০০৯ সাল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা শহর থেকে গ্রামেও বিস্তৃত হওয়ায় ই-কমার্সের সম্প্রসারণ হয়েছে। 

এখন সারা বিশ্বেই অনলাইনে কেনাকাটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ই-কমার্স দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অন্যান্য যেকোনো খাতের তুলনায় এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। করোনা মহামারীর সময়ে এ খাতের ব্যবসায় ২০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। 

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোয় যেখানে অর্ধেক মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করে, সেখানে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় সে সংখ্যাটা মাত্র ২ শতাংশ। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে তা ৫ শতাংশ এবং উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে ১৬ শতাংশ। তবে প্রতি বছর অনলাইনে কেনাকাটা করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। 

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করে।

আমাদের দেশে এ খাতে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ লাখের মতো উদ্যোক্তা রয়েছেন। ২০২১ সালে ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল প্রায় ৫৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। গবেষণা সংস্থা লাইটক্যাসল পার্টনার্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্সের বাজার দাঁড়াবে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। ডাবলিনভিত্তিক বাণিজ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটস ডটকমের মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে তা প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বাজারে পরিণত হবে। 

ই-কমার্সের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ই-কমার্স সাইট পরিচালনায় ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থাপনা, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কলসেন্টার, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইট ম্যানেজমেন্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, কাস্টমার হ্যাপিনেস টিম, কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজার, মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ, ডেলিভারি এক্সিকিউটিভ ইত্যাদি খাতে প্রচুর জনবল কাজ করছে। বর্তমানে ই-কমার্স সাইটগুলোয় প্রতিদিন দুই লাখের বেশি অর্ডার সরবরাহ হচ্ছে।

দেশে অনলাইন বাণিজ্য বেড়ে ওঠার সময়ে ২০১৫ সালে দারাজ বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশসহ পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারে দারাজের ই-কমার্স স্টোর রয়েছে। একই বছর যাত্রা করা এখনই ডটকম দেশের সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও ডিল সাইট। দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শপিং মল এবং বাংলা ভাষায় দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ই-কমার্স ওয়েবসাইট আজকেরডিল ডটকমও সে বছর কার্যক্রম শুরু করে। ২০১২ সালে যাত্রা করে দেশের অন্যতম সাইট রকমারি ডটকম। শুরুর দিকে বই বিক্রি করলেও বর্তমানে বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজ ও খাদ্য সম্পূরক পণ্য বিক্রি করছে সাইটটি। তবে রকমারির পর অনেক অনলাইন বুকশপ কার্যক্রম শুরু করলেও রকমারি এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন বুকস্টোর। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম অনলাইনভিত্তিক গ্রোসারি সাইট চালডাল ডটকম যাত্রা করে। 

ই-কমার্স সাইটগুলোর সফলতা দেখে স্বপ্ন, মীনাবাজার, আগোরার মতো সুপারশপ আউটলেটগুলোও এখন অনলাইন শপিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। 

সবমিলিয়ে দেশের ই-কমার্স সাইটগুলোর ব্যবসা এখন জমজমাট। তবে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের একটি প্রধান সমস্যা তারা জোয়ারে ভাসতে পছন্দ করে। যখন যার জোয়ার তখন তার পেছনেই ছোটে। ফলে কিছু অসাধু লোক বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। এর ফলে ইভ্যালি, কিউকম, ধামাকা শপিং, আলেশা মার্ট, ই-অরেঞ্জ, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের প্রদীপ, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিড ডটকম এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার পরও পণ্য বুঝিয়ে না দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করার জন্য এ কোম্পানিগুলোই বড় ভূমিকা পালন করেছে।

এজন্য যেসব ই-কমার্স কোম্পানি স্বচ্ছভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে তারাও ভুক্তভোগী হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর দায় যে একেবারেই নেই, সেটাও বলা যাবে না। দেখা যায় যে অনলাইনে প্রথম যে অর্ডার করা হয় কোম্পানিগুলো সে অর্ডার দ্রুতসময়ে সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়। কিন্তু অর্ডার সংখ্যা বাড়তে থাকার পরই আর আগের সে মানসম্মত সার্ভিস পাওয়া যায় না। বিশেষ করে দেরিতে অর্ডার সরবরাহ করার অভিযোগকে গুরুত্ব না দিলেও ভুল পণ্য, ডেলিভারিম্যানের আচরণ এসব নিয়ে অভিযোগকে তারা গুরুত্ব দেয়। তার মানে পণ্য সরবরাহে দেরি করাকে তারা স্বাভাবিক চোখে দেখতে চায়। এটা সত্য, জ্যামের নগরীতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা খুবই দুরূহ একটি কাজ, কিন্তু তার পরও গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে হলে ই-কমার্স সাইটগুলোকে এক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে। আর এ কারণেই ই-কমার্সে এখনো প্রি-পেমেন্ট সিস্টেমকে জনপ্রিয় করা যায়নি। এর চেয়ে বরং ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য বুঝে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করার পদ্ধতিতেই গ্রাহকরা বেশি আস্থা রাখছেন। আবার অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে, যদিও অভিযোগ করার পর বদলে দেয়া হয়, কিন্তু এভাবে ভোগান্তির জন্য অনেক গ্রাহক ই-কমার্সে কেনাকাটা করতে আগ্রহী হন না।

কোনো পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার পর স্টকে থাকা পুরনো পণ্য দিয়ে বর্তমান মূল্য রাখার অভিযোগও রয়েছে। সেই সঙ্গে নিম্নমানের বা ডিসকাউন্টের মাধ্যমে অবিক্রীত পণ্য বিক্রি করার প্রবণতাও ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর আছে। ইদানীং নারী গ্রাহকদের সেলফোন নাম্বারে ফোন করে বিরক্ত করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া মার্কেটিংয়ের নামে যখন তখন ফোন করা বা খুদেবার্তা পাঠানোও গ্রাহকদের বিরক্তির উদ্রেক করে।

এসব অভিযোগ একপাশে রেখে যদি ই-কমার্সের ইতিবাচক দিকগুলো দেখা হয়, তাহলে তা খুবই আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে রেইনকোট জড়িয়ে বা কনকনে শীতের রাতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করার পর ডেলিভারিম্যানদের প্রতি এক ধরনের মমতাবোধ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। মোদ্দাকথা, গ্রাহক চাইলে ডেলিভারিম্যানরা একেবারে ঘরে এসে পণ্য পৌঁছে দিয়ে যান। 

এভাবে ই-কমার্স আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। তাই এ অনলাইন ব্যবসার মাধ্যম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে ই-কমার্স বর্তমান সময়ের চাহিদার আলোকেই তৈরি হয়েছে। তাই ব্যবসার এ মাধ্যমকে সহজ ভেবে গ্রাহকদের আস্থা রক্ষার্থে কাজ না করলে গ্রাহক কিন্তু ঠিকই আগের মতো অফলাইনের প্রচলিত কেনাকাটাতে ফিরে যাবে। তবে মানুষ যেহেতু অনলাইনে পণ্য কেনায় অভ্যস্ত হচ্ছে, তাতে আগামীতে ই-কমার্সের বহুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ই-কমার্স সাইটগুলো তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করলে আখেরে এ খাতের ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবেন। আর সেই সঙ্গে গ্রাহকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে সক্ষম হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের পথ ধরে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে অভিগম্যতার ক্ষেত্রে এটিই সবার একান্ত চাওয়া। 


তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক

আরও