লন্ডনে ব্র্যাক জীবনের এক বছর

(গতকালের পর) টেমস নদীর নিচ দিয়ে এ সুড়ঙ্গ পথগুলো তৈরি হয়েছে। সাহেরিনের গাড়িতে চড়ে প্রথম যখন ব্ল্যাকওয়েল টানেলের ভেতর দিয়ে গেলাম, তখন অবাক বিস্ময়ে সভ্যতার ক্রমবিকাশের কথাই ভাবছিলাম। মানুষের সৃষ্টিশীলতা আর সৃষ্টিকর্মের এ এক অনন্য নিদর্শন! ব্ল্যাকওয়েল পৃথিবীর প্রথম টানেল, যা কোনো বড় নদীর নিচ দিয়ে গেছে। ১৮৯৭ সালে এর ভেতর দিয়ে প্রথম যাতায়াত শুরু। বর্তমানে টেমস নদীর নিচে কয়েক ডজন টানেল রয়েছে। আমাদের দেশেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে একটি টানেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

(গতকালের পর) 

টেমস নদীর নিচ দিয়ে এ সুড়ঙ্গ পথগুলো তৈরি হয়েছে। সাহেরিনের গাড়িতে চড়ে প্রথম যখন ব্ল্যাকওয়েল টানেলের ভেতর দিয়ে গেলাম, তখন অবাক বিস্ময়ে সভ্যতার ক্রমবিকাশের কথাই ভাবছিলাম। মানুষের সৃষ্টিশীলতা আর সৃষ্টিকর্মের এ এক অনন্য নিদর্শন! ব্ল্যাকওয়েল পৃথিবীর প্রথম টানেল, যা কোনো বড় নদীর নিচ দিয়ে গেছে। ১৮৯৭ সালে এর ভেতর দিয়ে প্রথম যাতায়াত শুরু। বর্তমানে টেমস নদীর নিচে কয়েক ডজন টানেল রয়েছে। আমাদের দেশেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে একটি টানেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

লর্ডসে বসেই ভাবছিলাম ব্র্যাকের গোড়াপত্তনে এই লন্ডনের অবদানের কথা। আবেদ ভাইয়ের এক বিশেষ সময় কেটেছে এ শহরেই। গ্লাসগোতে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ত্যাগ করে তিনি লন্ডনে এসে অ্যাকাউন্ট্যান্সি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। এই লন্ডনেই আবেদ ভাই তাঁর অনেক বন্ধুর সন্ধান পান এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন, যারা পরবর্তী পর্যায়ে ব্র্যাক গঠনসহ বিভিন্ন কাজে সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন। এদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ ফজলে আলী, ফারুক চৌধুরী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ লন্ডনে বসেই আবেদ ভাই আর তাঁর বন্ধুরা বিদেশে বাংলাদেশের জন্য জনমত সৃষ্টিতে উদ্যোগী হন। ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার প্রথম পুঁজি এসেছিল আবেদ ভাইয়ের লন্ডনের বাড়ি বিক্রির টাকা থেকেই। বিলাতি সংগঠন ‘অক্সফাম’ ছিল ব্র্যাকের প্রথম দাতা সংস্থা।

যাহোক, রকীব প্রথমেই নিয়ে গেল এলএসইর প্রধান ভবন ওল্ড বিল্ডিংয়ে। ওখানেই এমএসসি ডেমোগ্রাফি কোর্সে আমার নিবন্ধন হলো। কোর্স ফির পুরোটা আগে থেকেই ফোর্ড ফাউন্ডেশন দিয়ে দিয়েছিল। এলএসইর সন্নিকটে অনেকগুলো টিউব স্টেশন আছে। টেম্পল স্টেশনে নেমে মিনিট দশেক হাঁটলেই এলএসই— লন্ডনের Adwych এলাকা। এখানেই ওল্ড বিল্ডিং এবং অন্যান্য স্থাপনা। স্বপ্নের এলএসই! গেলাম বিখ্যাত Economists’ Bookshop-এ। এর দুটো ভাগ—একটিতে নতুন প্রকাশিত বই, আরেকটিতে ব্যয়সাশ্রয়ী পুরনো বই। অনেকটা উঁচুদরের নীলক্ষেত! বিদেশে নতুন বইয়ের অনেক দাম। তাই পুরনো দোকানেই বেশি ভিড়। হাঁটতে হাঁটতে এলাম একটি পুরনো বাড়ির সামনে। বেশ পুরনো। দেখলাম সাইনবোর্ড—The Old Curiosity Shop। তার নিচে লেখা ‘Immortalised by Charles Dickens’। চার্লস ডিকেন্স বিখ্যাত ইংরেজ লেখক। ‘David Copperfield’, ‘A Tale of Two Cities’, ‘Oliver Twist’ এবং আরো অনেক জনপ্রিয় উপন্যাসের রচয়িতা। The Old Curiosity Shop নামে তার উপন্যাস ছাপা হয়েছিল ১৮৪০-৪১ সালে, যার প্রেক্ষাপট এ দোকানটি ঘিরেই। এলএসইর প্রাঙ্গণে থাকা Old Curoisity Shop নামের দোকানটি ষোড়শ শতাব্দীতে স্থাপিত হয়েছিল, যা আজও টিকে আছে। ভাবতেই অবাক লাগে।

রকীব আমাকে নিয়ে গেল Gloucester Road, যেখানে আমাদের ডেমোগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট। এলএসইর মূল ক্যাম্পাস থেকে এর দূরত্ব ১০-১৫ মিনিট। ভাবলাম, এখানেই আমাকে এক বছর পড়ালেখা করতে হবে। দেখা করলাম বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে, যারা আমাকে সম্পূর্ণ বিভাগটি ঘুরিয়ে দেখালেন। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, বিভাগীয় প্রধান ডেভিড গ্লাস সপ্তাহ দুয়েক আগে লোকান্তরিত হয়েছেন। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। অধ্যাপক গ্লাস ডেমোগ্রাফি জগতের এক বরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং পপুলেশন স্টাডিস নামে এক নাম করা সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আর দেখা হলো না।

প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে ছিল ব্যাংক হিসাব খোলা। রকীবের সহায়তায় সহজেই কাজটা সমাধা করা গেল আমাদের বিভাগের অতি নিকটের Lloyds Bank-এ। এরপর সেন্ট্রাল লন্ডনের দর্শনীয় স্থান দর্শন। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম Leicester Square-এ, যাকে লন্ডনের সংস্কৃতিচর্চার তীর্থস্থান বলা হয়। তার পাশেই Soho, যা লন্ডনের বিনোদন এলাকা হিসেবেই বেশি পরিচিত। একে একে ঘুরে দেখলাম Piccadilly Circus ও Trafalgar Square-এর Nelson Column। ইতিহাস বলছে, ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের ট্রাফালগার নামক স্থানে ফরাসি এবং স্পেনের যৌথ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি হরেশিও নেলসন মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধে অবশ্য ইংরেজরা জয়লাভ করে, যার স্বীকৃতি হলো এই কলাম। ট্রাফালগার স্কোয়ারের কাছে আরো অনেক বিখ্যাত স্থান ও স্থাপনা রয়েছে। রয়েছে সেন্ট জেমস পার্ক ও বাকিংহাম প্রাসাদ। পার্লামেন্ট হাউজও খুব দূরে নয়। আরো আছে রয়েল আলবার্ট হল। এটি একটি বিশাল মিলনায়তন, যেখানে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত সংগীতশিল্পী, যেমন লতা মুঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, মুকেশ বা মেহেদী হাসান সেখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। ইদানীং কালে আমাদের একান্ত পরিচিতজন লুভা নাহিদ চৌধুরী ও অদিতি মহসিন এখানে পঞ্চকবির গান পরিবেশন করে আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন।

এতসব দেখে ফিরে এলাম এলএসইর ওল্ড বিল্ডিংয়ে। এখানে সন্ধ্যায় শুরু হলো নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য রিসেপশন, আমরা যাকে বলি নবীনবরণ। রকীব আমাকে রেখে চলে গেল। অনেক লোক, একেবারে গমগম করছে। কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলো। কেউই ডেমোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের নয়। এলএসইতে অনেক ডিপার্টমেন্ট রয়েছে এবং রিসেপশনে সব ডিপার্টমেন্টের নবীন শিক্ষার্থীরাই এসেছে। তবে খুব কম শিক্ষকেরই দেখা পেলাম। এলএসইর পরিচালক রলফ ডারেনডর্ফ, যার জন্ম জার্মানিতে, তিনি সংক্ষিপ্ত স্বাগত বক্তব্য রাখলেন। বক্তব্যে এলএসইর ঐতিহ্যের কথা বললেন। ১৮৯৫ সালে জর্জ বার্নার্ড শ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুলে পড়েছেন বা শিক্ষকতা করেছেন এমন নামিদামি লোকের সংখ্যা অগণিত। কিছু কিছু বিতর্কিত লোকও আছেন। যাদের কথা মনে পড়ে তাঁরা হলেন: জন কেনেডি, পিয়ারে ট্রুডো, মিক জেগার (সংগীত শিল্পী), জর্জ সরোজ (ফিলানথ্রপিস্ট), নেলসন ম্যান্ডেলা, অমর্ত্য সেন, ডেভিড এটেনবরো, ডেভিড রকফেলার, হেরল্ড লাসকি, রবার্ট মুগাবে ও মনিকা লুইনস্কি। এদের মধ্যে আছেন ১৬ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং ৩৪ জন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এলএসই থেকে পিএইচডি করেছেন ১৯৭৬ সালে। 

পরদিন ক্লাস শুরু। গেলাম Gloucester Road-এর ডেমোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টে। সেখানে আমাদের স্বাগত জানালেন ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ক্রিস লেংফোর্ড। গুরুগম্ভীর প্রকৃতির ছোটোখাট একজন মানুষ। পরিচয় করিয়ে দিলেন আরো দুজন শিক্ষকের সঙ্গে, সাবিত্রী থাপার ও ক্রিস্টিন ম্যাকইলরয়। বুঝলাম তাঁরাই আমাদের মূল শিক্ষক। আমাদের ক্লাসে প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী। তাঁরা এসেছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। ভারত, জর্ডান, হংকং, উগান্ডা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং স্বাগতিক ইংল্যান্ড। কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। মনে হলো ভালোই যাবে বছরটা। প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য একজন সুপারভাইজরও ঠিক হয়ে গেল। আমার ভাগে পড়লেন ক্রিস লেংফোর্ড। আগেই বলেছি তিনি গুরুগম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। সারা বছরই তিনি আমার সুপারভাইজর। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর হাবভাব দেখে মনে হলো তারা তাঁকে (ক্রিস লেংফোর্ড) ভয় পায়। কিন্তু আমার মনে হলো তিনি আমাকে বেশ স্নেহের চোখেই দেখেন।

বড়দিনের ছুটির প্রাক্কালে এক শনিবার লেংফোর্ড আমাদের সবাইকে তাঁর বাসায় নেমন্তন্ন করলেন। পূর্ব লন্ডনের স্ট্রেটফোর্ড এলাকায় তার বাস। ভদ্রলোক একাই থাকেন। আমরা সবাই যার যার মতো করে গিফট নিয়ে গেলাম। স্যান্ডউইচ, পাস্তা, বনরুটি আর বিভিন্ন ধরনের জুস ছিল খাবারের তালিকায়। মোটামুটি ভালোই মজা হয়েছিল। বিকালে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন পাশের একটা পার্কে। বিরাট পার্ক। আমরা সবাই খুব খুশি। তখনো তেমন শীত পড়েনি, তাই পার্কে প্রচুর ফুল। আবিষ্কার করলাম এখানকার ফুলে কোনো গন্ধ নেই। মনে পড়ল আশা ভোঁসলের সেই গান ‘ফুলে গন্ধ নেই এ তো ভাবতেও পারি না’।

যাহোক, ক্রিস লেংফোর্ড একজন কড়া পরিচালক। ৮ বা ৯ ডিসেম্বর। আমাদের টার্ম-শেষ পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শেষে খাতা জমা দিয়ে বাইরে এসে কয়েকজনের সঙ্গে সম্ভবত একটু উচ্চঃস্বরে কথা বলছিলাম। তখনো সবার পরীক্ষা শেষ হয়নি। ক্রিস রুম থেকে বের হয়ে এলেন এবং একটু রাগতস্বরে আমাদের চুপ থাকতে বললেন। আমরা বললাম, সরি! উত্তরে যা বললেন, তা এখনো আমার কানে বাজে—A sorry isn’t enough. Please get out of this building for today। আর কি? সবাই চলে গেলাম। কিন্তু তাঁর অন্যরূপও দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। এলএসইতে এমএসসি প্রোগ্রামের শেষ তিন মাস একটি ছোটখাটো থিসিস বা ডিসারটেশন করতে হয়। সুপারভাইজর এটিও দেখাশোনা করেন। এই থিসিসের কথা ভেবে ঢাকা ছাড়ার সময় কিছু উপাত্ত সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। মানিকগঞ্জে ‘জনসংখ্যা সীমিতকরণ সমিতি’ নামে একটা সংস্থা পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করত। ভাবলাম, স্টেরিলাইজেশন গ্রহীতার তথ্য দিয়ে একটা থিসিস তৈরি করা যাবে। সংস্থার প্রধান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান খুবই ভালো মানুষ। ব্র্যাক মানিকগঞ্জের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। তাঁকে বলায় সহজেই রাজি হয়ে গেলেন। দুজন গবেষণা সহকারীকে দিয়ে দুই বছরের তথ্য তিনি কপি করিয়ে দিলেন। মানিকগঞ্জের এ উপাত্ত নিয়ে যখন আমি ক্রিস লেংফোর্ডের সঙ্গে কথা বলি, তখন তিনি খুব কৌতূহল দেখান। অনেকের মতে, বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার দেশ। কাজেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটি স্থানীয় উদ্যোগের সাফল্য (বা ব্যর্থতা) দেখা খুবই সমীচীন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, মানিকগঞ্জ ছাড়া আর কি করতে পারো? বললাম, আমি বাংলাদেশ ফার্টিলিটি সার্ভেতে কাজ করেছি এবং এ সার্ভের প্রধান আমিনুর রহমান খান বলেছেন, আমি চাইলে তিনি সার্ভের সব উপাত্ত আমাকে দেবেন। মনে হলো, এ কথা শুনে ক্রিস লেংফোর্ড আরো খুশি হলেন। বললেন, এটি (ফার্টিলিটি সার্ভে) একটি আন্তর্জাতিক জরিপ, কাজেই এর ওপর কাজ করাই ভালো। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। 

ডেমোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের একটি ছোট সেমিনার রুম ছিল। সেখানে একদিন দেখা হলো নায়েলা কবিরের সঙ্গে। নায়েলা তখন সবেমাত্র পিএইচডি শুরু করেছেন। ক্রিস লেংফোর্ড তাঁর সুপারভাইজর। তাকে পেয়ে খুব ভালো লাগল এবং প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা হতো। মাঝেমধ্যেই তিনি মেইন ক্যাম্পাসে আমাকে কফি খাওয়ার জন্য নেমন্তন্ন করতেন। নায়েলা কবির এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন বিদগ্ধ গবেষক এবং এলএসইর অধ্যাপক।

ফক্সলি হাউজে সাহেরীন ও তার বন্ধুদের সান্নিধ্যে আমার লন্ডন জীবন ভালোই কাটছিল। আমি উইকেন্ডের প্রতীক্ষায় থাকতাম। শনি আর রোববার দিন দুটো পুরো আমাদের। সাহেরীনের ফোর্ড গাড়িতে চড়ে বিভিন্ন স্থানে যেতাম। মাঝেমধ্যেই তার বন্ধুদের বাসায় নেমন্তন্ন হতো। বাংলা খাবারের আয়োজন। বেশ উপভোগ করতাম। তখন ইউটিউব এমনকি ডিভিডিও ছিল না। সাহেরীনের বাসায় ছিল একটা মিউজিক সেন্টার। সেখানে আমরা ক্যাসেটে গান শুনতাম—রবীন্দ্র, নজরুল, হাসনরাজা (সাহেরীন হাসন রাজারই বংশধর) আর হিন্দি গান। বো রোড থেকে প্রায় প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় আমরা চলে যেতাম কিলবার্নে। সেখানে একটা সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমা চলত। এক টিকিটে তিনটি সিনেমা। শুরু হতো রাত ৯টায়। আর শেষ হতে হতে ভোর হয়ে যেত। তারপর ঘরে ফিরে ঘুম।

জুন-জুলাইয়ের কোনো এক শনিবার। ভোরে টেলিফোন বেজে উঠল। ধরলাম। অন্য প্রান্ত থেকে জিজ্ঞাসা করছেন, May I speak to Mushtaque? বললাম, This is he। বললেন, মোশতাক, আমি আবেদ ভাই। আমি তো অবাক! বললেন, বাহার (আবেদ ভাইয়ের স্ত্রী আয়েশা আবেদের ডাক নাম) আর আমি দুদিন হলো লন্ডনে এসেছি। তারপর খোঁজখবর নিলেন—পড়াশোনা কেমন চলছে ইত্যাদি। বললাম, আবেদ ভাই আমি কি আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে পারি? বললেন, নিশ্চয়। কাল সকাল ১০টার দিকে চলে এসো। সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানাও দিয়ে দিলেন। পরদিন রোববার। ঠিক সময়মতোই রওনা হয়ে গেলাম। সঙ্গে লন্ডনের A-Z ম্যাপ। টিউবের সেন্ট্রাল লাইনে Chigwell স্টেশন। স্টেশনে নেমে একটু হাঁটলেই বাসা। Chigwell বড়লোকদের এলাকা, তাই খুই সুন্দর ও পরিপাটি। খুবই সবুজ। জানলাম, সেই বাসাটি আবেদ ভাইয়ের এক সহোদরের। বাহার ভাবি ও আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গল্প হলো। বললেন, কোর্স শেষ হলেই চলে এসো। আমরা একটি নতুন ও খুব এক্সসাইটিং কাজে হাত নিচ্ছি। যেটাতে তোমার একটা বিশেষ দায়িত্ব থাকবে। খুব গভীরে গেলেন না। আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আর তাঁর কথা শুনে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম এবং দেশে ফেরার আগ্রহ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। [চলবে]

আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী: ব্র্যাকের সাবেক ভাইস চেয়ার

আরও