আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো, বৈশ্বিক অস্থিরতা এমন নানা কারণে প্রায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, স্থানীয় বাজারে পণ্যটির সংকট তৈরি হয় ও বাজারদর বেড়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের কোন নীতিগুলোয় পরিবর্তন আনা বা নতুন করে নীতি নেয়া প্রয়োজন?
জ্বালানি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু আসলে বিষয়টা শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিকভাবে শক্তি বা এনার্জি সম্পর্কিত। জ্বালানি শক্তির একটি উৎস। সমস্যাটিও শুধু জ্বালানির নয়, পুরো শক্তি ব্যবস্থার। পরিবহণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দুইই ব্যবহার হয়। বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার হয় মূলত আলোর জন্য, গরম বা ঠান্ডা করতে (হিটিং ও কুলিং), মোটর চালাতে, কম্পিউটিং ও যাবতীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্র পরিচালনায়। সুতরাং শুধু জ্বালানি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে চলবে না; শক্তির উৎস, কোথায় কেন কীভাবে কতটা শক্তি ব্যবহার হচ্ছে এসব দেখতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় জ্বালানি ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই, তবে কমানো সম্ভব। আবার আমদানিনির্ভরতা মানেই আমরা তলিয়ে গেলাম তা নয়। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া তো জ্বালানি আমদানির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তারা আমদানি করা জ্বালানি সুচিন্তিতভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে। তাই শুরুর প্রশ্ন হলো, আমাদের মনোযোগ ও গুরুত্ব কোথায়? আমরা মূল্যবান জ্বালানি কোথায়, কিভাবে, কতটা দক্ষতার সাথে ব্যবহার করছি?
যেমন ধরুন, ভবন শীতলীকরণের জন্য এখন আমরা খুব এসি ও পাখার ওপর নির্ভরশীল। অথচ এ নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটি ভবনের স্থাপত্য ও নির্মাণসামগ্রী শীতলীকরণের চাহিদা অনেকটাই নির্ধারণ করে। আবার ধরুন, ঢাকার প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ মূলত উত্তর-দক্ষিণ বরাবর। এ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শহরে বায়ু প্রবাহ করিডর থাকলে শহরের তাপমাত্রা কিছুটা কমত। অর্থাৎ স্থাপত্য, নির্মাণসামগ্রী, নগর পরিকল্পনা— এসবও শক্তি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে গরমের সময়ে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদার বড় অংশের উৎস এয়ারকন্ডিশনার বা এসি। এ চাহিদা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। শুধু এসি চালানোর জন্য ব্যয়বহুল আমদানি করা জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার কতটা যৌক্তিক, যখন দেশের শিল্প ও কৃষি জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত? আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? বাংলাদেশের শক্তি নীতিতে এসব প্রশ্নের যথাযথ মোকাবেলা করা হয়নি। আমাদের শক্তি পরিকল্পনায় তাই শিল্প ও কৃষির চিন্তা অনেক পেছনে। উচ্চ মূল্যের জ্বালানি ব্যবহার করে আমরা ঘর ঠাণ্ডা করছি।
তাছাড়া গ্রীষ্মকালের অতিরিক্ত কুলিং চাহিদা মেটাতে যে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে হলো, শীতকালে তা কম ব্যবহার হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। ফলে এসি শুধু জ্বালানি ব্যয় নয়, পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
তারপর ধরুন, ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রয়োজনীয় একটি বাহন, কিন্তু অত্যন্ত অদক্ষ। সাধারণত রাতে এগুলোর ব্যাটারি চার্জ হয়, যার জন্য প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। জ্বালানি হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, ব্যাটারি চার্জিং, এবং রিক্সায় তার ব্যবহার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার দক্ষতা ১৫ শতাংশের কম হবে। তাছাড়া চার্জারের হারমোনিকস বিতরণ নেটওয়ার্কের ছোট ট্রান্সফরমারগুলোকে অতিরিক্ত গরম করে। এর ফলেও বিদ্যুৎ ক্ষয় বাড়ে। এভাবে এখানে বিপুল পরিমাণ শক্তি ক্ষয় হচ্ছে। এক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জিং করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য গ্রিড পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই; গ্রিড বিদ্যুৎ চার্জিং গ্যারাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে অন্তত ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ ক্ষয় হয়। ধরুন, রেলস্টেশনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে সেখানেই চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে গ্রিডের ওপর চাপও কমবে, আবার বিদ্যুতের ক্ষয়ও কম হবে।
এ ধরনের আরো অনেক ইস্যু রয়েছে, যেগুলো নিয়ে ভাবতে হবে, কাজ করতে হবে। আমাদেরকে বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে হবে।
সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জ্বালানি চুক্তি করছে, যার লক্ষ্য হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। এই দুই বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখছেন?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জ্বালানি চুক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি পরস্পর সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগেই এসব চুক্তি হয়েছে। এগুলো মূলত ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতাকে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে চায়। তাই এসব চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দেবে— আমি তা মনে করি না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে না পারার অন্যতম কারণ নীতিগত অস্থিরতা। আমাদের দেশে এক সরকার একটি নীতি নেয়, পরের সরকার সেটি বদলে দেয়। জ্বালানি নীতি সরকারনির্ভর হওয়া উচিত নয়; এটি দেশের বাস্তব প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। সরকার পরিবর্তন হলেও শিল্প, কৃষি কিংবা বিদ্যুতের চাহিদা তো রাতারাতি বদলায় না। নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাড়বে।
বাংলাদেশ ভূমিসংকটের দেশ। বড় আকারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলতে জমির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাছাকাছি শিল্প ও বিদ্যুৎ চাহিদার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। যাতে করে সঞ্চালন ও বিতরণে ভূমি ব্যবহার কম হয়। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে তাকালে হবে না; উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, ভূমি ব্যবহার, শিল্প, কৃষি, পরিবহণ ও সরবরাহ (logistics) ব্যবস্থা— সবকিছুকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উৎপাদন বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। নিজেদের গ্যাস ও কয়লা উৎপাদন বাড়াতে হবে। গত দুই দশকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি আমাদের শক্তি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকী। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টসিকার বা খাজনাভোগী গোষ্ঠী অকল্পনীয়ভাবে সম্পদশালী হয়েছে। আদানীর সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী শর্তে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়েছে।
এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যে বিদ্যুৎকেন্দ্র তার বিনিয়োগের অর্থ অনেক আগেই তুলে নিয়েছে, তারপরও অস্বাভাবিক মুনাফা করছে, সেই ব্যয় রাষ্ট্র কেন বহন করবে?
এস আলমের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন আসে। একদিকে তারা উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা নিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের ব্যাংক লুটপাটের ভারও শেষ পর্যন্ত জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। জনগণ কেন এ বোঝা বহন করবে? এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে তাদের অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
প্রতি বছর বিপিডিবি লোকসান করছে। সরকারও বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখছে। কিন্তু এত সহায়তার পরও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না, বরং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিপিডিবিকে নিয়ে সরকারের কী ভাবা উচিত?
প্রথমেই দেখতে হবে, ভর্তুকির অর্থ আসলে কোথায় যাচ্ছে। বিপিডিবির কর্মকর্তারা বসে বসে এই টাকা খাচ্ছেন—বিষয়টি এমন নয়। ভর্তুকির বড় অংশ খাচ্ছে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো। এই চুক্তিগুলো সংশোধন বা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তাহলে বিপিডিবিকে এত ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজনও থাকবে না।
বিপিডিবি এখানে মূলত একটি মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠান। আইপিপিগুলোর সঙ্গে বিপিডিবির যে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) হয়েছে, এগুলো নীতিগতভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই পুরো দায় বিপিডিবির ওপর চাপানো সঠিক হবে না।
তবে বিপিডিবির নিজস্ব কার্যক্রমের দক্ষতা অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত। তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কতটা দক্ষ, জনবল কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কত শ্রমঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে—এসব দেখা দরকার। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি বছরের পর বছর বন্ধ থাকে, অথচ বেতন-ভাতা চলতেই থাকে, তাহলে সেই সমস্যার সমাধানও করতে হবে। তাদের পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে কারা কতটা পাচ্ছে সেটাও দেখতে হবে। এখন এসি ব্যবহারের জন্যও সরকারকে পরোক্ষভাবে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যারা আর্থিক সক্ষমতা থাকায় বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, এসি ব্যবহার করছেন, তাদের ভর্তুকির ভার কেন সমগ্র জনগণ বহন করবেন? ভোক্তা পর্যায়ে এ ধরণের বৈষম্য দূর করতে হবে, যাতে ভর্তুকি প্রকৃত প্রয়োজনীয় খাতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাতে করে সামগ্রিকভাবে ভর্তুকি কমে আসবে।
চীন, ভুটান বা নেপালের মতো অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং সে মাধ্যমে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাও অনেকটা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক বাজারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আমাদের শক্তি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাওয়া উচিত?
আসল বিষয় ‘শক্তি নিরাপত্তা’ বা এনার্জি সিকিউরিটি, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ তার একটি অংশ।
আমি বলব, শক্তি নিরাপত্তা সম্পর্কিত আমাদের চিন্তা কাঠামো বদলাতে হবে। শক্তি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু শক্তি নিরাপত্তা নয়, জাতীয় শক্তি নিরাপত্তাকেও বিপজ্জনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দ্বিতীয় গুরুতর সমস্যা হলো সমগ্র ব্যবস্থার অদক্ষতা।
একটি উদাহরণ দিই। শ্রমশক্তি জরিপ বলছে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১১ থেকে ১৩ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি খাতে সামগ্রিকভাবে অদক্ষতা রয়েছে।
বিভিন্ন কৃষিপণ্য ক্ষেত থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদনের একটি অংশ অর্থনীতিতে কোনো মূল্য সংযোজন করছে না, যদিও তার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে। তাছাড়া জমি চাষ, সার-, সেচ-, কীটনাশক ব্যবহার, ঝাড়াই-বাছাই, পরিবহণ, সংরক্ষণ সকল পর্যায়ে অদক্ষতা রয়েছে। যা এক হিসেবে কৃষিতে শক্তি ব্যবহারে অদক্ষতা।
কৃষির উদাহরণ দিলেও বিষয়টি শুধু কৃষির নয়। সামগ্রিকভাবে আমাদের পুরো অর্থনীতি ও শক্তি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই অদক্ষতা রয়েছে। সেগুলো চিহ্নিত করে দক্ষতা বাড়ালে শক্তি নিরাপত্তা টেকসই হবে।
এরপর আসবে নীতিগত পরিকল্পনা। রাজনৈতিক অবস্থা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য, দেশের ভূতাত্ত্বিক প্রকৃতি, অবকাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা, ভূমি মালিকানার ধরন, শিল্প-, কৃষি-, পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা, শহর পরিকল্পনা, স্থাপত্য, জীবনযাত্রা ইত্যাদি বহু কিছু নানা মাত্রায় শক্তি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে, এসব বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশনের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মোকাবেলা করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি নিরাপত্তা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, তবে যথেষ্ট নয়। আমাদের বিদ্যুতের গ্রিড উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে নেপাল ও ভুটান এবং পূর্ব দিকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড ও চীনের সাথে যুক্ত করতে হবে। মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। এসব দীর্ঘমেয়াদী। আজ যেটা ভূরাজনৈতিক কারণে অসম্ভব মনে হচ্ছে কাল সেটা সম্ভব হয়ে উঠবে।
আপনার মতে কোন খাতে সবচেয়ে বেশি শক্তির অপচয় হচ্ছে, যেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব?
সবচেয়ে বেশি শক্তি অপচায়ী খাত চিহ্নিত করতে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন। আমার কাছে তা নেই। পত্রিকার রিপোর্ট থেকে মনে হয় গ্যাস বিতরণ খাতে আশু মনোযোগ দেয়া দরকার।
আবাসন খাতে শক্তির ব্যবহারও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে এলপিজি, বিদ্যুৎ ব্যবহার—এসব বিবেচনায় আবাসন খাতকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আবাসন সহ সকল ধরনের ভবনে শক্তি দক্ষতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ আছে। অনেক ভবনের নকশা এমন যে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার কম হয়। দিনের বেলাতেও আলো জ্বালাতে হয়, এসি ও পাখার ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ নকশার মধ্যেই অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের শেকড় রয়েছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো আমাদের ব্যবহারগত অভ্যাস। এটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সাংস্কৃতিকও। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শক্তি, অদক্ষভাবে ব্যবহার করছি এবং শক্তির অপচয়ও করছি । এক্ষেত্রে পরিবর্তনটা মূলতঃ সাংস্কৃতিক, যা দীর্ঘমেয়াদী।
স্বল্পমেয়াদে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, যারা কোনো উৎপাদন নয়, নিছক ভোগের জন্য বেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার করবেন, তাদের জন্য কোনো ভর্তুকি থাকবে না। এতে করে অপ্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহার কমবে এবং ভর্তুকির চাপও হ্রাস পাবে।
সরকারের উদ্দেশে আপনার কোনো বিশেষ বার্তা আছে?
আমি বরং গণমাধ্যমকে কিছু বলতে চাই। আপনারা যদি পেশাদারী মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করেন, তাহলে দেখবেন আমাদের অনেক সমস্যারই মূলে রয়েছে রেন্ট সিকিং বা খাজনাখোরী।
বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি রেন্ট সিকিং অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে সমাজের একটি স্তর উৎপাদনের সাথে কোনো পর্যায়ে যুক্ত না থেকেও, বা যতটুকু যুক্ত তার তুলনায় বহুগুণ বেশী, পুঁজি ও সম্পদের মালিক হচ্ছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুতর সীমিত সম্পদ হলো জমি। জমিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত। সরকারিভাবে প্লট করে জমি বিক্রি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। জমি এখন সম্পদ হস্তান্তর ও অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেখবেন যে, মেট্রোরেলের ফলে ঢাকার অনেক এলাকায় জমি, বাড়ী, বাড়ী ভাড়ার বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফলে যে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হল সেটা ব্যক্তির হাতে চলে যাচ্ছে, যদিও বিনিয়োগের দায় সমগ্র জনগণের।
অনেক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিতে কাজ করার সময়ও আমরা দেখেছি, এ ধরনের চুক্তির মধ্যে শক্তিশালী রেন্ট সিকিং উপাদান রয়েছে। কমিটির রিপোর্টেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
অর্থনীতিতে খাজনাখোরী প্রাধান্যে থাকলে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, শিল্পায়ন, উন্নত পরিবহণ ও লজিস্টিকস, শক্তি সংরক্ষণ ও শক্তি দক্ষতা এসবের গুরুত্ব থাকে না।
তাই গণমাধ্যমের প্রতি আমার অনুরোধ, শুধু বাজার কারসাজি বা একচেটিয়া ব্যবসার খবর নয়; কোথায়, কীভাবে রেন্ট সিকিং বা খাজনাখোরী হচ্ছে, সেটিও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান করুন। তাহলে সমস্যার প্রকৃত কারণগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশগুলোর কোনো অগ্রগতি দেখছেন?
কমিটির পক্ষ থেকে আমরা সুপারিশ জমা দিয়েছি। এরপর সেগুলো নিয়ে কি করা হচ্ছে বা হবে সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিষয়। কোনো অগ্রগতি সম্পর্কে আমি অবহিত নই।