দেশে কমছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা, বয়স্কের চাপ ও পুষ্টিহীনতায় বাড়ছে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি

সুযোগ কাজে লাগাতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও শ্রমবাজারের সমন্বয় জরুরি

জনসংখ্যাবিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের যে সুবর্ণ সময় বাংলাদেশ এখন পার করছে তা ২০৫০ সাল নাগাদ শেষ হয়ে যাবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাবে বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম বয়সের হলেও ২০৫০ সালের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যার হার দাঁড়াবে ১৩ শতাংশের বেশি। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস বলছে, সেই হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ লভ্যাংশ পুরোপুরি আদায় করার আগেই বাংলাদেশ বার্ধক্যের চাপে পড়তে যাচ্ছে। এজন্য প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কেন এ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। বাকি প্রায় ৫৩ লাখ তরুণ কাজের বাইরে থেকে গেছেন। পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক দেখা যায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণে যুক্ত নয় এমন তরুণদের (এনইইটি) হারে। ইউএনএফপিএর হিসাবে দেশের ৪১ শতাংশ তরুণ এবং ৬২ শতাংশ তরুণী এ তিনটির কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। এত বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যদি জনশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই উৎপাদনশীলতার বাইরে থেকে যান, তাহলে জনমিতিক কাঠামোর সাময়িক সুবিধা কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হয় না। এর একটি বড় কারণ শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে দীর্ঘদিনের অসংগতি। শিল্প ও সেবা খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা থাকলেও শিক্ষাক্রম সেই চাহিদা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। ফলে একদিকে শিক্ষিত তরুণের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ জনবলের সংকট থেকেই যাচ্ছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সামাজিক অনীহা, বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের দুর্বল যোগসূত্র এবং শিল্পের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ না হওয়া কাঠামোগত দুর্বলতা। এগুলোর সমাধানে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেয়া যায়নি।

জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও দক্ষতার ওপরও জনমিতিক লভ্যাংশ নির্ভর করে। এখানেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ এখনো অপুষ্টির শিকার। সাম্প্রতিক সময়ে হাম ও নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু বৃদ্ধির পেছনে অপুষ্টিকেই প্রধান কারণ বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দারিদ্র্য ও অপুষ্টির দুষ্টচক্র প্রজন্মান্তরে জনমিতিক সম্ভাবনাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব ও মজুরিবৈষম্য নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ ঠেকিয়ে রাখছে, ফলে বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত ‘জেন্ডার ডিভিডেন্ড’ও অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের একাধিক দেশ একই ফাঁদে পড়েছে। চীনের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত দৃষ্টান্ত। এক সন্তান নীতির প্রভাবে চীন উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আগেই বার্ধক্যের চাপে পড়ে যায়। এ বার্ধক্য এমন এক পর্যায়ে ঘটছে যখন দেশটি এখনো মধ্যম আয়ের কাতারেই রয়ে গেছে। দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের অসংগতির প্রশ্নে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। রফতানি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশটির মোট শ্রমশক্তির মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশের কোনো স্বীকৃত সনদ বা প্রশিক্ষণ রয়েছে। আর কারিগরি শিক্ষা দীর্ঘদিন শিল্পের বাস্তব চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে গেছে। ফলে একদিকে যেমন যুব বেকারত্ব বেড়েছে, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও দক্ষ জনবলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

কারিগরি শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা কম থাকা এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল সংযোগ—এ একই সমস্যা বাংলাদেশেও স্পষ্ট। দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম ও সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলো পৃথক পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। অথচ জনমিতিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল। ফলে পৃথক একটি কমিশন বা মন্ত্রণালয় গঠন করার সুপারিশটি ভেবে দেখা যেতে পারে। বার্ধক্যের চাপ মোকাবেলায় পেনশন ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো এখনই প্রস্তুত করতে হবে, কারণ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে যে সময় প্রয়োজন, তা খুব বেশি নেই।

সরকারি বাণীতে তরুণদের সম্ভাবনাকে জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তি বানানোর যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সঠিক দিকনির্দেশনা। তবে নীতি আলোচনা ও বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে তা দূর করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো, বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ জরুরি। বাস্তবতা বিবেচনায় বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে বছরে লাখ লাখ নতুন শ্রমশক্তির সংস্থান সম্ভব নয়; বিনিয়োগবান্ধব নীতি, শিল্পায়ন এবং রফতানিমুখী খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাড়াতে হবে। শিশুপুষ্টি ও মাতৃস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কারণ আজকের অপুষ্ট শিশুই আগামী দিনের অকর্মক্ষম জনশক্তি। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির সঙ্গে পুষ্টি কর্মসূচিকে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণ বাড়াতে বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্ব রোধ, মজুরিবৈষম্য দূরীকরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত জনসংখ্যা কমিশন বা সমন্বিত মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম ও সামাজিক সুরক্ষা—এ খাতগুলোর নীতি সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে বাংলাদেশের সামনে এখন যে সময়টুকু আছে, তা সীমিত এবং অপরিবর্তনযোগ্য। জনমিতিক লভ্যাংশ একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না। চীন বা ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আমাদের যা শেখায় তা হলো শুধু তরুণ জনসংখ্যা থাকা যথেষ্ট নয়—তাকে সময়মতো দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তরিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আরও