বিপরীতে ক্রমেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায়ই আমদানি ব্যাহত হয়েছে এবং জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। জ্বালানি সংকটের মতো এসব পর্যালোচনাও নতুন না। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সরকার যখন আবারো ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের পথে হাঁটছে। এছাড়া আরো তিনটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা জানিয়েছে সরকার। এতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সরকারও কি অতীতের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে?
দেশে চলমান গ্যাস সংকট কমাতে তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আবার সম্প্রতি বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাময়িকভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসে। এ পরিস্থিতি এলএনজি আমদানির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। এ বিবেচনায় বর্তমান সরকারের নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এ উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেশের আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
বিগত সময়ে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান না করে এলএনজি আমদানিকেই প্রধান কৌশল হিসেবে নেয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে আমদানি শুরুর পর থেকে গত আট বছরে (২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে) এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এত বিপুল ব্যয়ের পরও গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। উপরন্তু নানা সময়ে সামান্য কারিগরি ত্রুটি বা দুর্ঘটনায় বিদ্যমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর কোনোটি বন্ধ হয়ে গেলে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। আবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি পরিবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে না পারলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে সরকারকে। সব মিলিয়ে এ ধরনের জটিলতাগুলো জ্বালানি খাতে নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করেছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় বাড়িয়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। আবার ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও আমদানি ব্যাহত হবে না এমন কোনো উৎস দেশও নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির পরও দেশে গ্যাস সংকটের মুখে একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে। কোনোটা আংশিক চালু রাখা হচ্ছে। সারা দেশে লোডশেডিং, রেশনিং করে বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব সংকট এখনো বিদ্যমান। জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং টার্মিনালনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি বেড়েছে। এসব স্থানীয় গ্যাস কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে একেবারেই বিনিয়োগ করা হয়নি তা নয়। তবে সেটি অপ্রতুল এবং সেই বিনিয়োগও কার্যকর পদ্ধতিতে হয়নি, তা স্থানীয় গ্যাসের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি থেকে উপলব্ধি করা যায়। এর পরও সরকার স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে মনোযোগ ও বিনিয়োগ না বাড়িয়ে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে পেট্রোবাংলা ৫০টি কূপ খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। অনেক কূপে গ্যাস পাওয়া যায়নি, আবার অনেক কূপে প্রাক্কলনের তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। বিশেষজ্ঞ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা এর অন্যতম কারণ হিসেবে অতীতের দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) সিসমিক জরিপের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কূপ খনন করে অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা না বাড়িয়ে এখানে নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন আরো জরুরি হয়ে পড়েছে। যদিও যেসব কূপ খনন করছে তার প্রতিটি এলাকায় থ্রিডি সাইসমিক সার্ভে করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বাপেক্স।
ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) সিসমিক জরিপের পরিধি বাড়ানো, আধুনিক ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার, গভীর কূপ খনন, নতুন রিগ সংগ্রহ এবং দেশীয় অনুসন্ধান সক্ষমতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বর্তমানে দেশে দ্বিমাত্রিক জরিপ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৬৪৩ লাইন কিলোমিটার, কিন্তু ত্রিমাত্রিক জরিপ হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ১৩৭ বর্গকিলোমিটার। এ পরিস্থিতি বলে দেয়, উন্নত অনুসন্ধান প্রযুক্তিতে আমাদের বিনিয়োগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। গত দুই দশকে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ শুধু আট বছরেই এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদনক্ষম সম্পদ তৈরির তুলনায় ভোগনির্ভর আমদানিতে ব্যয় হয়েছে বহু গুণ বেশি। এ ব্যয়ের ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
অবশ্য এটাও সত্য যে দেশীয় অনুসন্ধান বাড়ালেও রাতারাতি গ্যাস পাওয়া যাবে না। নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার সময়সাপেক্ষ। তাই স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি চলমান রাখতে হবে। কিন্তু এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ভবিষ্যতে কোনো টেকসই সমাধান হিসেবে কাজ করবে না। কিন্তু সময় নিয়ে হলেও গ্যাস উৎপাদনে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিনিয়োগ, রিগ বৃদ্ধি, বিদেশী সহায়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।