চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) গত ১ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তারা ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করেছে, যা তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে ৩০ হাজার টন বেশি। ইআরএলের বর্ধিত উৎপাদনের বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশের প্রায় ৭৫ লাখ টন বার্ষিক জ্বালানি তেল চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন তেল উৎপাদন দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মোটেও কোনো সুখবর নয়। তজ্জন্য ইআরএল পুরোপুরি দায়ী না হলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তথা সরকার এত বেশি দায়ী যে, কোনো যুক্তি দিয়েই এ ব্যর্থতার দায়কে কমানো সম্ভব নয়—মুছে ফেলা সম্ভব নয়ই।
ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৮ সালে উৎপাদনে গেলেও এটির স্থাপনকাজ আসলে শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। এর মানে হচ্ছে, এ দেশে একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল এখন থেকে প্রায় ৬২ বছর আগে। চরম বিস্ময় ও হতাশার বিষয় এই যে, বিগত ৬২ বছরের মধ্যে এ দেশে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় আরেকটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপিত হলো না। অথচ জ্বালানি তেলের চাহিদা দেশে দিন দিন শুধু বাড়ছেই না, ২০৩৫ সাল নাগাদ তা দেড় কোটি টনে পৌঁছবে বলে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেল পরিশোধন এখন পৃথিবীজুড়ে একটি লাভজনক ব্যবসাও।
ব্যবসানির্ভর অর্থনীতির দেশ সিঙ্গাপুর বর্তমানে সমুদ্র বন্দরের পাশাপাশি যেসব ব্যবসা থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করে থাকে, তার মধ্যে জ্বালানি তেল পরিশোধন অন্যতম। কিন্তু সে ব্যবসায় যাওয়া তো অনেক পরের কথা, নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলটুকুও পরিশোধন না করে বাংলাদেশ তা সিঙ্গাপুর, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে আমদানি করছে। এমনটি কেন ঘটছে, তা মোটামুটি সবারই কমবেশি জানা এবং সে আলোচনা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান গোপনীয় (open secret) বিষয়। অর্থাৎ তেল পরিশোধন না করে পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে সরকারি দপ্তরের কতিপয় কর্মী, বেসরকারি খাতের কতিপয় ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের দীর্ঘদিনের কায়েমি স্বার্থকে বহাল রাখাই বস্তুত এর মূল উদ্দেশ্য।
২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা যদি ১ কোটি ৫০ লাখ টনে উন্নীত হয়, তাহলে ওই চাহিদা পূরণের জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির সমসক্ষমতাসম্পন্ন আরো নয়টি পরিশোধনাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই অত্যন্ত রহস্যজনক কারণে এ ব্যাপারে এতটুকুও এগিয়ে আসেনি। আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু একটি অস্থায়ী সরকার, সেহেতু তারা তো এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক। তবে বিপিসি চেয়ারম্যানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তারা মহেশখালীতে ১০ লাখ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্যে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট প্রোফরমা) প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। তার মানে হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছা করলে ওই ডিপিপিটি অনুমোদনের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে একটি ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ধরনের ভালো কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপনের নজির অতীতেও রয়েছে। ১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ কয়েকটি আইনের বেশকিছু ধারা সংশোধনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যে দৃষ্টান্ত এ দেশের ইতিহাসে তা এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে বিপিসি চেয়ারম্যান পায়রাতে অন্য একটি তেল শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা থাকার যে তথ্য দিয়েছেন, সেটিও নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। এ বিষয়ে অত্র লেখকের বক্তব্য হচ্ছে: জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেহেতু কোনো সন্দেহ নেই, সেহেতু ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিটের ডিপিপি প্রণয়নের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রস্তাবিত পায়রা প্রকল্পের সম্ভাবতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে নভেম্বরের মধ্যে এ ক্ষেত্রে একটি ডিপিপি তৈরি করে ফেলা খুবই সম্ভব। আর তা করা গেলে ডিসেম্বরের মধ্যে সেটি একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) কর্তৃক অনুমোদন করে ফেলাও সম্ভব। প্রক্রিয়াটি এ সরকারের আমলেই মহেশখালীর পাশাপাশি পায়রাতেও আরেকটি তেল পরিশোধনাগারের স্থাপনকাজের যাত্রা শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু কাজ দুটি বাস্তবে আদৌ হবে কিনা, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যাদের কারণে বা যাদের কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে গত ৫৭ বছরেও ইস্টার্ন রিফাইনারির পর এ দেশে দ্বিতীয় কোনো জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার গড়ে উঠতে পারল না, তারা তো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সর্বত্র এখনো সমান দাপটের সঙ্গে সক্রিয়।
২০৩৫ সাল নাগাদ দেড় কোটি টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশে স্থাপিতব্য পরিশোধনাগারগুলো যে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অধীনেই হতে হবে, তা তো নয়। বরং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার বিবেচনায় সেগুলো বেসরকারি খাতে হওয়াটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সমীচীন। যতটুকু জানা যায়, কতিপয় বেসরকারি উদ্যোক্তা এ ধরনের পরিশোধনাগার স্থাপনের জন্য এরই মধ্যে সরকারের অনুমতি চেয়ে আবেদনও করেছেন। কিন্তু সরকার তাদের এখনো সে অনুমতি দেয়নি।
অথচ স্টারলিংককে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বিক্রি করে লাভবান হওয়ার ব্যবসায় অনুমতিদানের চেয়ে পণ্য উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনকারী জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের স্বীকৃতিদানের বিষয়টি নিঃসন্দেহে অনেক বেশি জরুরি। কিন্তু সরকারের মনোযোগ সেদিকে আছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে দেশের শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও অন্যান্য খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও বিতরণের চেষ্টা আরো কিছুকালের জন্য হয়তো বিলম্বিতই হয়ে রইল! বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন ও সাশ্রয় করতে যেয়ে আমরা নিয়ত খাবি খাচ্ছি। অথচ আমরা জানি যে, নিজ দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব, সে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বহু ক্ষেত্রে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও আয় করা সম্ভব নয়।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের সম্ভাবনা আরো বহুগুণে বেড়ে গেল, যেটি অন্য একাধিক লেখায়ও উল্লেখ করেছি। কিন্তু এ চমৎকার সম্ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপদানের ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আমলারা কতটা আন্তরিক, তা মোটেও স্পষ্ট নয়। এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই রাজনৈতিক পর্যায়ে হবে। কিন্তু কাজটিকে গুছানো ও এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজগুলো আমলাদেরই করতে হবে। এ মুহূর্তে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকায় আমলাদের দায়িত্ব আরো বেশি। কিন্তু হতাশার বিষয়, আগামী নির্বাচনে ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যারা নানাভাবে চেষ্টা-তদবির করে যাচ্ছেন, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলো কি তাদের চিন্তায় আছে? তারা কি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ও প্রস্তুত? যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে আসন্ন এ ভোটের ফলাফলের মাধ্যমে ক্ষমতার দলীয় পরিচয়ই হয়তো শুধু বদলাবে—রাষ্ট্রের মৌলিক জায়গাগুলোয় কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে না। সাধারণ জনগণের স্বার্থ তো রক্ষিত হবেই না।
সব মিলিয়ে বলব, ইস্টার্ন রিফাইনারি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে ৩০ হাজার টন অধিক জ্বালানি তেল পরিশোধন করতে পেরেছে—এ খবর জনসমক্ষে প্রচার করার জন্য সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করার চেয়েও এখন অধিক জরুরি হচ্ছে, ইআরএলের মহেশখালী দ্বিতীয় ইউনিটের অনুমোদন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ। অন্যদিকে বিপিসির উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রস্তাবিত পায়রা তেল পরিশোধনাগারের ডিপিপি প্রণয়ন করে তার ওপর একনেকের অনুমোদন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের উচিত হবে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে দেড় কোটি টন জ্বালানি পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন পরিশোধনাগার গড়ে তোলার জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা। তদুপরি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে কীভাবে ক্রমান্বয়ে সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। কিন্তু আত্ম-অন্বেষী আমলা এবং অগভীরতা ও অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকদের কি সেসব নিয়ে ভাবার মতো মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে?
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়