জনমিতিক লভ্যাংশ

তরুণদের ভিন্ন বাস্তবতা সমস্যা নয় সুযোগের অসমতাই মূল সংকট

দেশের তরুণদের প্রসঙ্গে প্রায়ই আমরা বলি, ‘তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’ কথাটি সত্য হলেও অসম্পূর্ণ। কারণ তরুণরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়; তারা আজকের অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের সক্রিয় অংশ।

এ তরুণ সমাজ একরৈখিক নয়। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উপকূলের কৃষক পরিবারের তরুণ, কারিগরি শিক্ষার্থী, স্কুলের বাইরে থাকা কিশোর, ইংরেজি মাধ্যমের তরুণী কিংবা বিয়ের পর পরই সংসারের দায়িত্ব নেয়া কিশোরী—সবাই তরুণ। কিন্তু তাদের বাস্তবতা এক নয়। ভিন্ন বাস্তবতার তরুণদের জন্য একই ধরনের সমাধান তৈরি করার প্রশ্নটি তাই আমাদের সামনে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘ভিন্ন বাস্তবতা, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা’। আর এ প্রতিপাদ্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নটিকেই সামনে তুলে আনে। দিবসটি পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমাদের তাই এ নিয়ে আরো আলোচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। এ বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। কিন্তু এ সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে পরিণত হয় না। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ।

জন্মস্থান কি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?

ঢাকার তরুণের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও চাকরির সুযোগ তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে রয়েছে উচ্চ ব্যয়, প্রতিযোগিতা, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও নগরজীবনের চাপ। গ্রামের তরুণের সমস্যা ভিন্ন। তাদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সীমিত প্রবেশাধিকার, ডিজিটাল বৈষম্য, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও জলবায়ু ঝুঁকি। অতএব অবস্থানভেদে সমাধান এক হতে পারে না। কিন্তু নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই: কোনো তরুণের জন্মস্থান যেন তার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ না করে।

বৈবাহিক অবস্থা ও স্বাস্থ্য অধিকার

বাংলাদেশের যুব বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন হলো বৈবাহিক অবস্থা। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৪ শতাংশের ১৮ বছর বয়সের আগেই সন্তান হয়েছে। আবার ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের মাত্র ৪৭ শতাংশ নিজেদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে অবহিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যতথ্য ও কাউন্সেলিং পাওয়ার জন্য কি একজন কিশোরীকে বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? অবশ্যই নয়। বিবাহিত কিশোরীর প্রয়োজন হতে পারে পরিবার-পরিকল্পনা, গর্ভনিরোধ ও মাতৃত্ব বিষয়ে সহায়তা। অবিবাহিত কিশোরীর প্রয়োজন হতে পারে বয়ঃসন্ধি, মাসিক, সম্পর্ক, সম্মতি ও এসআরএইচআর বিষয়ে বয়সোপযোগী তথ্য। তাদের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে; অধিকার ভিন্ন হওয়া উচিত নয়।

শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও সুযোগ

বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০-২০২৪ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ৩৪-৯০ শতাংশ এবং নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ২৩-৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তাও প্রশ্ন করতে হয়, এ শিক্ষা কি তরুণদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করছে?

জাতীয় কারিকুলাম, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি শিক্ষা কিংবা স্কুলের বাইরে থাকা তরুণ প্রতিটি পথের বাস্তবতা আলাদা। এ পথগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা না করে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি পথ দক্ষতা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের দিকে নিয়ে যায়। একজন প্রকৌশলী, নার্স, কৃষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা বা শিক্ষক ভিন্ন পথে এগোতে পারেন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য একই—নিজের দক্ষতা দিয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তোলা।

তথ্যের বৈষম্য

তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যতথ্য পাওয়ার সুযোগেও বৈষম্য রয়েছে। কেউ নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কাউন্সেলিং পায়, কেউ বন্ধু বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় বিবাহিত নারীদের মধ্যে গর্ভনিরোধের অপূর্ণ চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ এবং ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই শুধু সেবা সরবরাহ নয়; প্রয়োজন তথ্য, কাউন্সেলিং, গোপনীয়তা, সম্মানজনক সেবা ও অবহিত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ।

লিঙ্গভিত্তিক সুযোগ ও ব্যবধান

দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ নারী ও পুরুষের সুযোগের ব্যবধান আরো স্পষ্ট। আইএলওর ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, তরুণ নারীদের ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে; তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যবধান প্রায় ৩১ শতাংশ পয়েন্ট। এ বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, অবৈতনিক যত্নের কাজ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ও সামাজিক প্রত্যাশা। অন্যদিকে তরুণ পুরুষের ওপরও রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চাপ। অতএব লিঙ্গভিত্তিক প্রত্যাশা কীভাবে তরুণদের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করছে, সেটিও যুবনীতির অংশ হওয়া উচিত।

তরুণদের নিয়ে নয়, তরুণদের সঙ্গে

যুব উন্নয়নে সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি হতে পারে দৃষ্টিভঙ্গিতে। তরুণরা শুধু ‘সুবিধাভোগী’ নয়। তারা নীতির সহনির্মাতা, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও কমিউনিটি নেতা। জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা বা কর্মসংস্থান, যে নীতির প্রভাব তাদের জীবনে পড়ে, সেই নীতি তৈরির আলোচনায়ও তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকা উচিত। শুধু কোনো সভায় কয়েকজন তরুণকে আমন্ত্রণ জানানো অংশগ্রহণ নয়। প্রকৃত অংশগ্রহণ হলো, শোনা, মতামত বিবেচনা করা, যৌথভাবে পরিকল্পনা করা এবং সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করা। ভিন্নতা নয়, অসম সুযোগই সমস্যা আন্তর্জাতিক যুব দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়: ভিন্নতা সমস্যা নয়; অসম সুযোগই সমস্যা।

একজন গ্রামীণ তরুণ ও নগর তরুণের প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। বিবাহিত কিশোরী ও অবিবাহিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যসেবাও এক হতে হবে না। কারিগরি ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীর পথ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তাদের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা একই: ভালো শিক্ষা। মর্যাদাপূর্ণ কাজ। সুস্বাস্থ্য। নিরাপদ সম্পর্ক। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার। সমাজে কথা বলার সুযোগ এবং এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে পরিশ্রমের মূল্য আছে।

তাই বাংলাদেশের যুবনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত সব তরুণকে একই জায়গায় নিয়ে আসা নয়, বরং তাদের ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করার বাস্তবতা স্বীকার করে প্রত্যেককে এগিয়ে যাওয়ার ন্যায্য সুযোগ দেয়া।

সমতা মানে সবাইকে একই জিনিস দেয়া নয়। ন্যায্যতা মানে যে তরুণের যতটুকু প্রয়োজন, তাকে ততটুকু সহায়তা দেয়া, যাতে সে নিজের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছতে পারে। তরুণরা শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়। তারা আজকের বাংলাদেশ নির্মাণ করছে।

তাই আন্তর্জাতিক যুব দিবসে প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘‌তরুণদের জন্য আমরা কী করছি?’ নয়, ‘‌তরুণদের সঙ্গে নিয়ে আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলছি?’

এমন বাংলাদেশ, যেখানে গ্রাম বা শহর, নারী বা পুরুষ, বিবাহিত বা অবিবাহিত, স্কুলে থাকা বা স্কুলের বাইরে থাকা, সাধারণ বা কারিগরি শিক্ষা—কোনোটিই একজন তরুণের সম্ভাবনার চূড়ান্ত সীমা হয়ে দাঁড়াবে না।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট। অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। এক বাংলাদেশ।

ড. নূর মোহাম্মদ: নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)

আরও