অভিমত

প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়া জরুরি কেন

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নিত করার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বৈশ্বিক পেক্ষাপটে এ মহাপরিকল্পনাকে অত্যন্ত যুগোপযোগী বলা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ের ব্যাস্টিক ও সামস্টিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে বলে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন। বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচলে বাধা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। এগুলোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ প্রবাহ কমতে শুরু করেছে। এদিকে দেশে স্থিতিশীল মুদ্রানীতি অনুসরণের অভাব, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব, সমুদ্রবন্দরগুলোয় অব্যবস্থাপনা, সড়কে অসহনীয় যানজট ও সীমাহীন দুর্নীতি বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না, কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বরং কমছে। সরকার নিশ্চয়ই বিনিয়োগের অন্তরায় এ বাধাগুলো দ্রুত দূর করার ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে।

একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীরা। পণ্য উৎপাদন, পরিসেবা এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করে থাকেন। প্রাক-ব্রিটিশ আমলে দেশের প্রতিটি গ্রাম স্বনির্ভর ছিল এবং গ্রামবাসীরা নিজেদের চাহিদা নিজেরাই মেটাতেন। সবাই ছিলেন একেকজন উদ্যোক্তা, প্রতিটি পরিবার ছিল উদ্যোক্তা পরিবার। ব্রিটিশ আমলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। আধুনিক শিক্ষার নামে চাপিয়ে দেয়া হয় সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের তাঁবেদারি করার জন্য সরকারি চাকরিনির্ভর এক শিক্ষা ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সরকারি চাকরিজীবীরাই জীবনে সবচেয়ে বেশি সফল। প্রায় ৮০ বছর আগে ব্রিটিশ উপনিবেশের পতন ঘটেছে। ইংরেজরা কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু আমরা এখনো চাকরিকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা বহাল রেখেছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চাকরির মানসিকতা থেকে বের হতে পারিনি। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে সরকারি চাকরির সংখ্যা অনধিক ১ শতাংশ। আধুনিক কোনো রাষ্ট্রে শতভাগ নাগরিককে সরকারি চাকরি দেয়া সম্ভব নয়, বহুবিধ বাস্তব কারণে উচিতও নয়। অতএব ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির একমাত্র উপায় হলো উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। দেশের প্রতিটি সক্ষম নাগরিকের জন্য একটি সম্মানজনক ও মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে বিভিন্ন আকারের হাজার হাজার কৃষি, শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য দরকার হবে লাখ লাখ দক্ষ উদ্যোক্তা। আর উদ্যোক্তা তৈরির প্রথম পাঠ থাকবে একেবারে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করে প্রতিটি শ্রেণীতে উদ্যোক্তা বিষয়ক একটি বিষয় থাকবে। তাত্ত্বিক বিষয়বস্তুর পাশাপাশি দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের সফল কাহিনী সেখানে পাঠবস্তু হিসেবে থাকবে। এতে শিশুকাল থেকেই মানুষের মনে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি হবে। পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু হবে।

পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ ও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষি উদ্যোগ নিয়ে একটি আবশ্যিক বিষয় থাকবে। একমাত্র কৃষিতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সম্ভব। এছাড়া আগামী পৃথিবীতে অধিক জনসংখ্যার কারণে খাদ্য সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়েই দক্ষ কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির কাজ হাতে নিতে হবে। গ্রামীণ প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসায় একজন করে প্রশিক্ষিত কৃষি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় হাতেকলমে চাষবাস শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন প্রায়োগিক শিক্ষা কাজে লাগিয়ে বাড়িতে ক্ষুদ্র খামার প্রতিষ্ঠা করে সফল হতে পারে সেটা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতি বছর বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে খুদে কৃষি উদ্যোক্তা মেলা। শিক্ষার্থীরা মেলায় তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করবেন, গ্রামবাসীরা উৎসবমুখর পরিবেশে সেখানে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করবেন। এতে শিক্ষার্থী, পরিবার ও দেশ সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসা ও ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি পশুপালন, মাছ চাষ, ক্ষুদ্র শিল্প, সেবা ইত্যাদি বিষয়ে উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সরকার এরই মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এজন্য সরকার প্রশংসার দাবিদার। দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরিও অত্যন্ত জরুরি। পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা পদ্ধতিতে ৬০ শতাংশ নম্বর রাখা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং পরিশেষে এসএসসি, এইচএসসি, ডিম্পোমা ও সমমানের পরীক্ষা পাসের পর শিক্ষা সনদ জামানত হিসেবে নিয়ে সহজশর্তে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হলে দেশের তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায় তরুণ উদ্যোক্তারা লিংকিং ইন্ডাস্ট্রি, সাপ্লাই চেইন ও সেলস চ্যানেল হিসেবে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারবে।

দেশের মহাবিদ্যালয়গুলোয় বিশেষ করে ডিগ্রি কলেজে তিন বছর মেয়াদি ফ্রিল্যান্সিং কোর্স চালু করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আগামী বিশ্বে ফ্রিল্যান্সিং কাজের বাজার ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ঘরে বসেই দক্ষ ফ্রিল্যান্সাররা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ক্রেতাকে সেবা প্রদান করছেন। আমাদের সামনে রয়েছে এ বিশ্ব বাজার ধরার বিশাল সুযোগ। ইন্টারনেট, ইংরেজি আর ইফিসিরেন্সি—তিনটি ‘‌ই’ আমরা বিশ্বমানের করে ফেলতে পারলে মিলিয়ন মিলিয়ন শিক্ষিত ফ্রিল্যান্সার উদ্যোক্তা শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করে আনতে পারবেন। এখন সরকারের উচিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিভিন্ন সেবাভিত্তিক মানসম্পন্ন কোর্সগুলো চালু করা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয় বিশ্বমানের প্রশিক্ষক ও আইটি ল্যাব স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং দেশব্যাপী দ্রুতগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা চালু করা।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি বিভাগের স্নাতক পাঠ্যক্রমে উদ্যোক্তা সৃষ্টি বা অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উদ্যোক্তা বিষয়ে এক সেমিস্টারে উদ্যোক্তা উন্নয়নে উচ্চতর ধারণা পাবেন। ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের ন্যূনতম দুটি কোর্স বাধ্যতামূলক থাকা দরকার। যারা অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপে মেজর বা মাইনর করতে চান তাদের জন্যও যথেষ্টসংখ্যক শিক্ষক রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পেশাজীবী, বিশেষজ্ঞ, নির্বাহী, ব্যবস্থাপক, গবেষক ও শিক্ষক তৈরির পাশাপাশি স্টার্টআপ উদ্যোক্তা তৈরি করবে। প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলো এখন বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন, বিশ্বব্যাপী ব্যবসা প্রসার, বিশালসংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং স্বল্পসময়ে কোম্পানির ভ্যালুয়েশন বাড়ানোর সুবিধা থাকায় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

ডিমান্ডসেইজ নামক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে বিশ্বে এখন ১৫০ মিলিয়ন স্টার্টআপ রয়েছে যার মধ্যে ১ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন স্টার্টআপই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। টেসলা, স্পেইস এক্স, গুগুল, মেটা, স্টাইপের মতো প্রায় ১৬০০ ইউনিকর্নগুলো (ন্যূনতম ১ বিলিয়ন ডলার ভেল্যুয়েশন) এখন বিশ্বকে দাপিয়ে চলেছে। দুনিয়ার অধিকাংশ স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। তথ্যপ্রযুক্তি, বায়োটেক, প্রকৌশল, স্থাপত্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষি, পরিবেশ রক্ষাসহ উচ্চশিক্ষার প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্টার্টআপের সুযোগ রয়েছে। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষে তাদের ব্যবসায়িক আইডিয়াগুলো যেন বাস্তবে রূপদান করতে পারে সেজন্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে লিংক করিয়ে দিতে হবে। সরকার এরই মধ্যে স্টার্টআপ খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্ট কোম্পানি গঠন করেছে। বেশ বড় একটা তহবিলও দেয়া হয়েছে। এখন দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্বমানের স্টার্টআপ উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে গণ্ডালিকা প্রবাহের বাইরে গিয়ে চিন্তা করার, ব্যবস্থা নেয়ার। বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে না কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে বেকারত্বের হার অভাবনীয় হারে বেড়েছে। আগামীদিনগুলোতে ভয়াবহতা আরো বাড়বে। সে সঙ্গে বাড়বে অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মাদকের ব্যাপকতা। বেকারত্বের লাগাম টেনে ধরতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থা আমূল সংস্কার করে ব্যাপক হারে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।

ড. শায়খ আহমদ: সহকারী অধ্যাপক (এডজান্ট ফ্যাকাল্টি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও লিড কনসালট্যান্ট, এক্সারশিয়ালস্

আরও