আলোকপাত

কূটনীতিতে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানে তার বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। পরে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে তিনি ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনায় রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসেন। জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পূর্ণতা লাভ করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানে তার বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। পরে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে তিনি ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনায় রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসেন। জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পূর্ণতা লাভ করেছে। 

১৯৭২ সাল ও পরবর্তী তিন বছরে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন তা আমার স্মৃতিতে গভীরভাবে গাথা। ব্যক্তিগত দূরদর্শিতা আর জনগণের প্রতি করা প্রতিশ্রুতির বলে শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত পরিস্থিতি সামলে সমস্যাসংকুল পরিবেশে থেকেও আমাদের দেশকে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার অবদানের কারণে আমরা গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পথে হাঁটতে পেরেছি।  

তিনি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। দেশ ও দশের কল্যাণে এগুলোর প্রয়োজন বলে তিনি অনুভব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু এ দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তার মাঝে বাঙালি আদর্শ, ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক স্ফুরণ ঘটেছিল, যা তাকে সোনার বাংলার গর্বিত বাঙালি করে তুলেছিল।  

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের জন্য এক নিবেদিত ও প্রতিশ্রুত প্রাণ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে থাকতেই তিনি সদ্যোজাত বাংলাদেশের জন্য তার স্বপ্ন এঁকেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার যাত্রাকে তিনি ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে, পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতার যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি  আরো বলেন যে, তিনি স্বাধীন  বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন হৃদয়ে কারো প্রতি ঘৃণা নিয়ে নয়, বরং সন্তুষ্টির সঙ্গে। কেননা শেষ পর্যন্ত মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্য, উন্মাদনার স্থলে বিবেক, ভীরুতার স্থলে সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং মন্দের বিরুদ্ধে ভালো  জয়লাভ করেছে।

ঢাকা ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু ভারতকে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার জন্য অকপটে ধন্যবাদ জানান। আবার একই সঙ্গে এ অনুরোধও করেন যেন বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারত দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সব সৈন্য ফিরিয়ে নেয়। অথচ তৎকালীন পাকিস্তানি নেতারা তখনো বাংলাদেশকে ভারতীয় উপনিবেশ হিসেবেই প্রচার করছিল।

বঙ্গবন্ধুর আশাবাদী চেতনায় প্রতিফলিত হয়েছে তার মহৎ ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস। এ আশাবাদী চেতনাই তাকে  যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন বাংলাদেশ গঠনে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি যুদ্ধকালীন ভারতে আশ্রয় নেয়া ১০ মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশীর জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন। দেশীয় অর্থনীতির অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে পুনরুজ্জীবিত  করেছেন। সব মিলিয়ে এ ছিল যেন এক দুঃসহ পরিস্থিতি আর দুঃসাধ্য কাজের মেলা। কিন্তু জাতিসংঘের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু এবং তার  রাজনৈতিক দল দক্ষতার সঙ্গে দেশকে পরিচালনার জন্য কাজ করছিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একাধারে একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং একজন প্রতিভাধর বক্তা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের বিজয়ী জনতার উদ্দেশে তার ভাষণে সে দক্ষতা ও নিপুণতার ছাপ সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথমেই তিনি হুঁশিয়ারি করেন যেন কেউ অবাঙালিদের  ওপর কোনো অত্যাচার না করে। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে আটকা পড়া চার লাখ বাঙালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।  তার এ ধরনের চিন্তা ছিল গভীর অর্থপূর্ণ। অবশেষে পাকিস্তানের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আটকে পড়া হতভাগ্য বাঙালিদের বাংলাদেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। 

সাধারণ পাকিস্তানিদের প্রতি ছিল না তার কোনো ‘‌বিদ্বেষ’, আবার এটাও বেশ জোর দিয়ে বলেছেন, যারা অন্যায়ভাবে আমাদের জনগণকে হত্যা করেছে এবং এ অপরাধে সহায়তা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার করা হবে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তান দখলদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধগুলোর তদন্ত শেষ হওয়ার পর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ-৩ লঙ্ঘন প্রভৃতির মতো  গুরুতর অপরাধের জন্য ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে বিচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। জেনেভা কনভেনশন এবং হত্যা, ধর্ষণ,  অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধগুলো আইন ও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। এছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে এ ধরনের অপরাধের পরিকল্পনা ও সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং অন্যদের শাস্তি সর্বজন স্বীকৃত বিচারের নিয়ম অনুসারে অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের আগস্টের সেই ভয়াল রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার আগ পর্যন্ত এ-সংশ্লিষ্ট বিচার প্রক্রিয়াটি সচল ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তার মৃত্যুর পর পুরো বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। সৌভাগ্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই বিচার প্রক্রিয়া পুনরায় সচল হয়েছে এবং সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা ঋণী সেই লাখ লাখ মানুষের কাছে, যারা তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন এবং সেই হাজার হাজার নারীর কাছে, যাদের শ্লীলতাহানি করা হয়েছে।

১৯৭৩ সালে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্ব এবং ওআইসির প্রতি তার এবং বাংলাদেশের সমর্থন প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিসর ও সিরিয়ার জন্য বাংলাদেশী সেনা চিকিৎসকদের একটি দল ও বাংলাদেশী চা পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশের এ উদ্যোগ ওআইসিতে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ফলে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বাংলাদেশকে ওআইসির সদস্য হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু সব জাতির সার্বভৌমত্ব ও সমতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। সমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে” বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ওপর তিনি বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তিনি এ অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে  সম্পদের ব্যবহার ও উন্নয়নে  বিশ্বাস করতেন। এ ধরনের চিন্তার ফলপ্রসূত  তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি যৌথ নদী কমিশন গঠনে ভারতকে সম্মত করতে সচেষ্ট হন।  এর উদ্দেশ্য ছিল ‘দুই দেশের মধ্যে  বিস্তৃত নদী ব্যবস্থাপনার ওপর জরিপ চালানো এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে উভয় দেশের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের যৌথ বৈঠকে ভারতসংলগ্ন এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক স্থাপনা সংযোগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়েরও উল্লেখ ছিল। বর্তমান সরকার এখন সে লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে  দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড এবং আঞ্চলিক জল ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয়  পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম বহু দশক আগের বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দুদেশের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের এ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ভূমির সীমানাবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৭৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ‘‌স্থল সীমান্ত চুক্তি’ সই করেছিলেন। ওই বছরই বাংলাদেশ দ্রুত সময়ের মধ্যে চুক্তিটি অনুমোদন করলেও ভারতের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। অবশ্য দীর্ঘ ৪১ বছর পর ২০১৫ সালের ৭ মে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন দিয়েছিল ভারতের পার্লামেন্ট। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার জোর প্রয়াসের ভূমিকা রয়েছে, যার জন্য তিনি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। 

একইভাবে বঙ্গবন্ধু  ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘‌দ্য টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেছিলেন। তখন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে এমন কোনো আইন ছিল না। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক “দ্য টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট” প্রণয়নের প্রায় আট বছর পর, জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে “দি ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব সি প্রণয়ন করে।

পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিচল মনোযোগের কারণে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ১২০টি দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন,  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে।   দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুসংহত ও শক্তিশালী হয়েছে। 

অতি অল্প সময়েই বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য বিশ্ব পরিমণ্ডলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।  ১৯৭৩ সালে তিনি জুলিও কুরি পদকে ভূষিত হন। একই জিনিস দেখা যায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু একজন উল্লেখযোগ্য বিশ্বনেত্রী হিসেবেই নন, বরং ভূষিত হয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতেও। তিনি ও তার সরকারের আর্থসামাজিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার। দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যসেবা সহজীকরণ, লিঙ্গ ক্ষমতায়ন, সুশাসনের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা  নিশ্চিতকরণ প্রভৃতি  গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ডিজিটালাইজেশন, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা অর্জন প্রভৃতি প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে এবং এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম করেছে। বর্তমানে আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে রয়েছি।

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত; পররাষ্ট্র, তথ্য অধিকার ও সুশাসন-সংক্রান্ত বিষয়াদির বিশ্লেষক

আরও