সাতসতেরো

শরীর ও মনের খাদ্য!

বিশেষ এক লক্ষ্যে বেশ কিছুদিন হলো ‘সুখ’ বিষয়ে পড়ালেখা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় পড়ছিলাম Just Win Singh-এর লেখা Happiness: Gain & Retain বইটি। ভদ্রলোকের একটা কথা আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। সেটা হলো, শরীরের সুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা খাদ্য গ্রহণে অতিমাত্রায় সচেতন। অথচ তার চেয়ে শত-সহস্র গুণ দামি (বা সংবেদনশীল) মনের খাদ্যের ব্যাপারে আমরা কতই না উদাসীন! সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনাগুলো তুলে ধরাই আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

বিশেষ এক লক্ষ্যে বেশ কিছুদিন হলো ‘সুখ’ বিষয়ে পড়ালেখা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় পড়ছিলাম Just Win Singh-এর লেখা Happiness: Gain & Retain বইটি। ভদ্রলোকের একটা কথা আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। সেটা হলো, শরীরের সুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা খাদ্য গ্রহণে অতিমাত্রায় সচেতন। অথচ তার চেয়ে শত-সহস্র গুণ দামি (বা সংবেদনশীল) মনের খাদ্যের ব্যাপারে আমরা কতই না উদাসীন! সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনাগুলো তুলে ধরাই আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য। 

একটা শিশু মাতৃগর্ভে আসার ক্ষণ থেকেই সেই পরিবারে কত হিসাবনিকাশ শুরু হয়ে যায়। সুস্থ ও সুন্দরভাবে তার এই পৃথিবীতে আগমন নিশ্চিত করতে হবু মা-বাবা তো বটেই, এমনকি উভয় পরিবারের মুরব্বিরাও অতিশয় তত্পর হয়ে ওঠেন। তাছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশাতীত উন্নয়ন সেই প্রক্রিয়ার প্রত্যেক ধাপে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ভেবে দেখুন, সেগুলোর প্রায় শতভাগই অনাগত শিশুটির শারীরিক সুস্থতা-বিষয়ক। চারপাশের মানুষগুলো কোন কোন বিষয়ে যত্নশীল হলে শিশুটির মানসিক গঠন উন্নত হবে তা ভাবার মতো পরিবার সত্যিই বিরল!

বলতে পারেন, সেটা তো ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ বিষয়। সেটার কীভাবে যত্ন নেয়া সম্ভব? পদ্ধতি নিয়ে পরে ভাবা যাবে, আগে খুঁজে দেখা দরকার আমাদের সমাজে ঠিক কয়জন এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন? হয়তো বলবেন, চেষ্টা করে কি শিশুর মানসিক উত্কর্ষ নিশ্চিত করা যায়? তার মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব?

আমি নিশ্চিত নই; তবে একটা প্রশ্ন প্রায়ই মনে জাগে। সেটা হলো, যদি তা একেবারেই অসম্ভব হয়, তবে দুনিয়ার অধিকাংশ আউটস্ট্যান্ডিং অর্জনকারী ব্যক্তি কীভাবে ইহুদি পরিবারের সদস্য হয়? পৃথিবীর শীর্ষ ধনী, সেরা বিজ্ঞানী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা কেন দুনিয়ার মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের এক বিশেষ গোষ্ঠী থেকেই আসে?

এর পেছনে অসংখ্য কারণ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে উল্লেখযোগ্য একটি কারণ হলো, কোনো ইহুদি পরিবারের একজন হবু মা সারা দিন কী কী করবেন, কমিউনিটির বিশেষজ্ঞরা মিলে তার রুটিন করে দেন। যার বড় অংশ জুড়ে থাকে পড়ালেখা, প্রার্থনা ও শরীরচর্চা! সেই পড়ালেখার মধ্যে আবার থাকে জটিল ধাঁধা, লজিক, বিজ্ঞান, গাণিতিক ও অসংখ্য বাস্তব সমস্যার সমাধান!

তারা বিশ্বাস করে, মায়ের এমন চর্চা মার্তৃগর্ভে থাকা শিশুর চিন্তার গঠনে ভূমিকা রাখে। কিছুটা হলেও সেই বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও চিন্তা করে। অথচ আমাদের সমাজে কী কী করা হয়? ব্যতিক্রম কিছু পরিবার বাদে সারা দিন শুয়ে বসে হিংসা-বিদ্বেষ-কূটনামিতে ভরপুর উপাদান গোগ্রাসে গিলতে থাকে। অনেকের প্রার্থনাও বন্ধ হয়ে যায়। বই পড়ার রুচি হয় না। সারা দিন হয় টিভি নয়তো স্মার্টফোন! এর প্রভাব কি অনাগত সন্তানের ওপর কিছুটা হলেও পড়ে না?

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে প্রতিটা ক্ষণ তার শারীরিক সুস্থতা ও বৃদ্ধির ব্যাপারে আমরা অতিমাত্রায় সচেতন থাকি। কিন্তু পাশাপাশি যে ‘সফটওয়্যার’ তাকে সারা জীবন পরিচালনা করবে তার গুণগত মান বৃদ্ধিতে আদৌ কি মনোযোগ দিই? বলতে পারেন, তখন কি তারা কিছু বোঝে?

আচ্ছা, তাহলে বলুন, ঠিক কবে থেকে তারা বুঝতে শেখে? এর সুনির্দিষ্ট জবাব নেই। তার প্রমাণ হলো, তিন বা ছয় মাস বয়সী শিশুদের আদর করে আমরা কত কথা বলি। তারা কি সেগুলো বোঝে? তার পরও বলি কেন? কারণ সেগুলো বলতে থাকলে কোনো এক সময় তারা সাড়া দেয়। মুখে বলতে না পারলেও তাদের হাসি দিয়ে বা হাত-পা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেয় যে আদর উপভোগ করছে!

শিশুরা শব্দ বা বাক্য বলা শেখার পরে আমরা তাদের কথা বলা শেখাতে চেষ্টা করি না; বরং অতি অল্প বয়সে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করি। একসময় তারাও সেটা অনুকরণ করে। আমাদের অজান্তেই তারা কথা বলা শিখে যায়! এটা বোঝার জন্য খুব সহজ একটা উদাহরণ হলো, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এলাকার দোকানদারদের রাশিয়ান ভাষা শেখার দক্ষতা।

এ দেশে বাধ্যতামূলক ১২ বছর ইংরেজি পড়ার পরেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী দুই লাইন ইংরেজি বলতে ভয় পায়। অথচ সেখানকার সবজি বিক্রেতা, জুতার দোকানের বিক্রয়কর্মী সাবলীলভাবে রাশানের মতো অপ্রচলিত ভাষায় কথা বলেন। তারা কখন সেই ভাষা শিখতে শুরু করেছেন তা হয়তো নিজেরাও খেয়াল করেননি। আবার দেশে ইংরেজিতে পাস করতে না পারা ছেলেটা আমেরিকা যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। 

অর্থাৎ আমাদের জীবনে অসংখ্য শেখার শুরুটা ঠিক কখন, কীভাবে হয় তা আমরা খেয়ালও করি না। তবে লেগে থাকলে কাজ হয়। ঠিক তেমনিভাবে শিশুর চিন্তার গঠনও ঘড়ি-ঘণ্টা বেঁধে হয় না। অনেক শিশু খুব স্বল্পতম সময়ে বাহ্যিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শেখে। কারো কিছুটা সময় বেশি লাগে। কিন্তু মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে চেষ্টাটা শুরু হওয়া উচিত।

অনেকে বলেন, এখনো বুদ্ধি হয়নি। বড় হলে সব বুঝবে বা ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কি তাই? আগের দিনে দাদী-নানী, চাচী-খালা এমনকি বড় ভাইবোনেরা শিশুকে অনেক সময় দিত। নিজেদের মতো করে গল্প বলত, গান শোনাত, ইশারা-ইঙ্গিতে অনেক কিছু বোঝাতে চেষ্টা করত। শিশুটিও তাতে প্রতিক্রিয়া দেখাত। এভাবে ক্রমেই যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পেত।

আজ ইট-কাঠ-পাথরের নগরে ‘মানুষের সংকট’ সবচেয়ে প্রবল হয়েছে। ফলে তাদের সঙ্গ দেয়ার জন্য হাজির হচ্ছে প্রাণহীন নানা বস্তু। সেগুলো ক্ষণিকের জন্য মজা দিলেও দ্রুতই আকর্ষণ হারায়। খেলনার ধাপ পেরিয়ে আসে টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ট্যাব প্রভৃতি। সেগুলো একমুখী, অর্থাৎ তারা শুধু বলে; শোনে না। তাছাড়া সেগুলোর উপাদান আমাদের ভাষা-সমাজ-সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের সঙ্গে শিশুদের পরিচিত করায় না। ফলে বুদ্ধি হওয়ার আগেই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

ক্রমান্বয়ে তারা বড় হতে থাকে। আগের দিনে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মননশীলতার বিকাশে শিক্ষামূলক ছড়া, কবিতা ও গল্প পড়া হতো। মহামানবদের জীবনী, ঐতিহাসিক ঘটনা, ধর্মীয় বাণী ইত্যাদি পড়া ও শোনার বন্দোবস্ত থাকত। শিক্ষামূলক নানা অনুষ্ঠান রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা হতো। ফলে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ও চর্চার কিছুটা হলেও খোরাক মিলত।

সেসব চর্চা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। শিক্ষিত তরুণদের মাঝেও গল্প-উপন্যাস বা ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে পড়াশোনার প্রবণতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আজকাল পাঠ্যবইয়ের বাইরে যা পড়া হয় তার সিংহভাগই ক্যারিয়ারে সমৃদ্ধি-বিষয়ক উপাদান, যেখানে চিন্তার খোরাক থাকে না। শুধু অন্যকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার থাকে। ফলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোয় খুব ভালো করলেও মানবিক গুণাবলি বিকাশে ঘাটতি রয়ে যায়। সততা ও নৈতিকতা বিষয়ে শেখার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপাদানগুলোর ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

এক্ষেত্রে একটা পার্থক্য বেশ লক্ষণীয়। আমরা ছোটবেলা রাশান কালচারাল সেন্টার অনূদিত অসংখ্য বই পেতাম। সেগুলোর মূল উপজীব্য ছিল সমাজ ও সংস্কৃতি, যা মানুষের মনকে নাড়া দিত, নানা বিষয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপী একক মার্কিন আধিপত্য ভাবনার জগতেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

প্রায় সব মার্কিন বেস্ট সেলার বইয়ের কনটেন্ট হলো দক্ষতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত। কীভাবে অন্যকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে—অধিকাংশ বই শুধু সেগুলো শেখায়। এমনকি লিডারশিপ বা সফট স্কিল-সংক্রান্ত কনটেন্টগুলোও মানুষকে মানবীয় গুণাবলির চেয়ে যন্ত্রের মতো অধিকতর ‘উৎপাদনশীল’ করতে তত্পর রয়েছে। ফলে মানুষ শুধু ‘সফল’ হওয়ার জন্য ছুটছে। কিন্তু তার মনের ডাক শোনার সময়-সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ এ সিস্টেমের ব্যাপারটাই এমন যে একবার এর মধ্যে মাথা ঢোকালে টিকে থাকার জন্যই আপনাকে শুধু ছুটতে হবে।

কিন্তু মানুষের জীবন তো যন্ত্র নয়। নানা কারণে একসময় শরীর ও মন আর সেই দৌড়ে শামিল থাকতে পারে না, ইচ্ছেও হয় না। তখন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির মতো (হঠাৎ নেশা ছেড়ে দিলে যেমন হয়) বিষণ্ন ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে হতাশ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন মনের খাদ্যের যথাযথ জোগান না থাকায় তা রুগ্ণ হয়ে পড়ে। ফলে তাকে জাগানো মোটেই সহজ হয় না। শিল্পোন্নত দেশগুলোয় এমন হতাশ, বিষণ্ন ও বিপন্ন মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। আমরাও যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছি, এ সমস্যা দ্রুতই বাড়বে।

আগে মানুষ অবসর সময়ে পছন্দের বই পড়ত, সিনেমা দেখত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিত। কিন্তু এখন প্রায় সবকিছু থেকে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে তথাকথিত সোস্যাল নেটওয়ার্ক। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ফেসবুক। কিন্তু এটা মনকে শান্ত করে না। ভালো লাগার চূড়ান্ত অনুভূতি দেয় না; বরং নিজেকে প্রতিনিয়ত অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। অধিকাংশ মানুষ নিজের সফলতার বা গর্বের দিকগুলো ওই প্লাটফর্মে তুলে ধরে। ফলে দিন শেষে আপনার নিজেকে পরাস্ত ও বিধ্বস্ত মনে হয়। তাছাড়া সেখান থেকে যে ইনপুট নেয়া হয়, তা মনের খাদ্য হিসেবে মোটেও পুষ্টিকর নয়।

তাই শুধু শরীরের সমৃদ্ধির জন্য খাদ্য বাছাই নয়; বিষমুক্ত খাবারের পাশাপাশি মনের খোরাক জোগানোর মতো কিছু নির্মল ভাবনার উপকরণ বরাদ্দ রাখুন। সাপ্তাহিক, মাসিক বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর মনকে স্বাস্থ্যকর খাবার দিন। নইলে একসময় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে তা হাল ছেড়ে দিতে পারে। তখন শত চেষ্টা করেও শরীরকে সচল করা যাবে না। কারণ মনই তো আমাদের প্রকৃত চালিকাশক্তি, তাই না?   

 

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক

আরও