‘মালিকানা’, ‘নেতৃত্ব’,
‘পরিচালন পদ্ধতি’, ‘সিদ্ধান্ত
গ্রহণ ব্যবস্থা’ ও ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও সফলতার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পাঠ্যবইয়ের ভাষা অনুসারে, শেয়ারহোল্ডাররাই প্রকৃত মালিক এমনটি বলা হয়। এ তত্ত্বটি বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সত্য বলে মনে হয় না। মালিকানার সঙ্গে মূলধনের সম্পৃক্ততা এবং ঝুঁকি গ্রহণ একান্তভাবে সম্পর্কিত। বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন প্রথম স্থাপন করা হয়, তখন স্বল্পসংখ্যক উদ্যোক্তা তাদের পুঁঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন এবং এ-সংক্রান্ত ঝুঁকি গ্রহণ করেন। ব্যাংকের আত্মপ্রকাশ একটি অর্থনীতিতে শরীরের রক্তনালির সঙ্গে একটি নতুন অঙ্গ যুক্ত করার শামিল। সংযুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির এই অঙ্গে রক্তপ্রবাহ অথবা ব্যাংকে আমানতকারীর অর্থপ্রবাহ শুরু হয়। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগকারী ও ঝুঁকি গ্রহণকারীর সম্পৃক্ততা ঘটে ব্যাংকের সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে সমীকরণ পাল্টে যায় এবং আমানতকারীরা মালিকানা সত্তার বিচারে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকে পরিণত হন। আর উদ্যোক্তারা বা পর্ষদ সদস্যরা হয়ে যান সংখ্যালঘিষ্ঠ মালিক চক্র। সুতরাং ব্যাংকের প্রকৃত মালিক বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকরা আর কেউ নন, সামগ্রিকভাবে আমানতকারী। আর তাই সঠিক বিবেচনায় একটি ব্যাংককে ব্যক্তিমালিকানা বা সরকারি মালিকানা নাম দেয়া যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। ব্যাংকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক যদি সাধারণ আমানতকারী হন, তাহলে যেকোনো ব্যাংকের প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র। আমানতকারীরা মূলত সরকারি বা বেসরকারি নন, বরং দেশের সাধারণ নাগরিক। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের ক্ষেত্রে ‘সরকারি’ বা ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন’ শব্দগুলোর চেয়ে ‘সরকারি খাতে পরিচালিত ব্যাংক’ এবং ‘ব্যক্তি খাতে পরিচালিত ব্যাংক’—এ শব্দগুলো অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
মালিকানার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। যেহেতু আমানতকারীদের অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকদের স্বার্থ তারা নিজেরা সরাসরি সংরক্ষণ করতে পারেন না, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব থাকে আমানতকারীর অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ। সংখ্যালঘু মালিক পক্ষ অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডাররা পরিচালনা পর্ষদের অংশ হিসেবে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের সুযোগ পান, যেহেতু তারাই সাধারণত সূচনাকারী উদ্যোক্তা এবং সর্বোচ্চ ঝুঁকি গ্রহণকারী। তবে এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকপক্ষের অর্থাৎ আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন, এমনটাই আশা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে একটি ব্যাংকের দীর্ঘকালীন স্বার্থ সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ, নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি গ্রহণ এবং দক্ষ পরিচালনা স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে এবং তত্ত্বাবধানে পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল আচরণ একটি ব্যাংকের টেকসই বিকাশে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
‘মালিক’
শব্দটি একজন ব্যক্তি বা পক্ষকে এমন একটি বোধ প্রদান করে, যা তার বা তাদের সিদ্ধান্ত প্রণালি বা তাদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। এ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত অধিকারবোধ তৈরি হতে পারে বা একজন ব্যক্তি বা পক্ষকে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সরাকারি বা বেসরকারি, যে খাতেই একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হোক না কেন, আমানতকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিই সবসময় মূল লক্ষ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেক্ষেত্রে আমানতকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পরিচালনা পর্ষদের। এই দুই পক্ষের ব্যর্থতা বা দায়িত্বশীল আচরণের ব্যত্যয় হলে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার মাঝে অধিক ঝুঁকি নেয়ার প্রবৃত্তি জন্ম নিতে পারে এবং ব্যাংকের আর্থিক স্থিতি সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্দশা শুধু আমানতকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের মন্দা অর্থনৈতিক মন্দার জন্ম দিয়ে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করতে পারে। যুগে যুগে এমনটি প্রমাণিত হয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাত বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা অন্যান্য বাণিজ্যিক
প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ধারণা তত্ত্বের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাতে ‘প্রিন্সিপাল ও এজেন্ট তত্ত্ব’ প্রযোজ্য, যা সাধারণত অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক রকম নয়। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পদ্ধতিও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় জটিল। সেক্ষেত্রে ব্যাংকাররা প্রকৃতপক্ষে মালিক চক্রের (আমানতকারী ও উদ্যোক্তা) এজেন্ট বা প্রতিনিধি। এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন বা সফলতা অর্জনের জন্য প্রতিনিধি তথা এজেন্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘মালিকানাসংক্রান্ত বোধ’ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। পরিচালনা পর্ষদের অতি মালিকানাবোধ কখনো কখনো তাদের ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপে উৎসাহ দিতে পারে। সার্বিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল আচরণ আমানতকারীদের প্রকৃত স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে, যা ব্যাংক সুশাসনের মূল দিক। ব্যাংকের সুশাসন কাঠামোয় পরিচালনা পর্ষদকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একটি দূরত্ব বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত আচরণ করতে হয়।
সার্বিকভাবে মালিক চক্রের (আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার) প্রতিনিধি হিসেবে তাদের নির্ধারিত নীতি ও প্রণালির বাস্তবায়ন করে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাঝে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এ মালিক চক্রের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হবে এমনটি কাম্য। এক্ষেত্রেও মালিকানাসংক্রান্ত বিভ্রান্তি ব্যাংকারদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। একজন ব্যাংকার যদি তার চাকরিজীবনের প্রথম দিনই জানতে পারেন ‘ব্যাংকের শাখায় যে সাধারণ মানুষগুলো সারিবদ্ধভাবে প্রতিদিন টাকা জমা করতে আসেন বা টাকা উত্তোলন করতে আসেন, তারাই প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানের মালিক, তখন তাদের সার্বিক আচরণ এবং সেবা প্রভাবিত হয়।’ এ ধরনের বোধ ব্যাংকার তথা ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে বলে মনে করি।
ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় ব্যাংকারদের কার্যপ্রণালি ও কর্মদক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘকালীন লক্ষ্য সামনে রেখে নির্ধারিত নীতি ও কৌশলের আওতায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা মালিক চক্রের স্বার্থ সংরক্ষণ করার কথা। সেক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বা ব্যাংকাররা কার লক্ষ্য অর্জন বা স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবেন? প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাগুরু মালিকপক্ষ হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা তথা ব্যাংকাররা আমানতকারীদেরই প্রতিনিধি, যদিও তারা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ও নীতির মধ্যে ব্যাংক পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন ও তত্ত্বাবধান কাঠামো আমানতকারীদের স্বার্থকেন্দ্রিকই হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট হতে হয়।
ব্যাংক পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করতে ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে কারা?
পরিচালনা পর্ষদ, নাকি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা? প্রকৃতপক্ষে পরিচালনা পর্ষদ বা একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এককভাবে একটি ব্যাংক পরিচালনা করতে পারে না। এটি তাদের একটি সমন্বিত নেতৃত্ব চক্র।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট আইন ও তত্ত্বাবধান কাঠামোর মাঝেও পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় আমানতকারীদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদ সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করলেও তাদের কাজের ক্ষেত্র বা সীমানা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামোর মাঝে নির্ধারিত থাকে। সাধারণভাবে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যপ্রণালিতে পরিচালনা পর্ষদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা ভূমিকা কাম্য নয়। ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিপূরক ও সহযোগিতামূলক আচরণের মাঝে এবং পরিচালনা পর্ষদের নিজস্ব কার্যসীমানা কঠোরভাবে পালন করার মাঝেই ব্যাংকের দীর্ঘকালীন সফলতা লুক্কায়িত। এ দুই পক্ষের অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাও ক্ষতিকর ফল বয়ে আনে। দুর্বল পরিচালনা পর্ষদের সুযোগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে পারে। সুতরাং ব্যাংক পরিচালনায় এ দুই পক্ষের একান্ত সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রিত আচরণ অত্যন্ত জরুরি।
সার্বিকভাবে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা হলো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব চক্র, যারা নিজেদের মাঝে আইন ও আদর্শগত নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে সমন্বয়ের মাধ্যমে সফলভাবে ব্যাংক পরিচালনা করবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট হবে—এমনটাই কাম্য।
ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব:
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব্ ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ও পরিচালক প্রশিক্ষণ