বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এবং করণীয়

প্রতিদিনই বাড়ছে ডলারের দাম। দক্ষিণ আমেরিকার গুটিকয়েক দেশ (ব্রাজিল, উরুগুয়ে, পেরু, মেক্সিকো) ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রার বিপরীতেই মার্কিন ডলারের মূল্য বেড়েছে অভাবনীয় হারে। সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে শ্রীলংকান রুপির (প্রায় ৮০ শতাংশ), যদিও শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। ভারতীয় রুপিরও পতন হয়েছে

প্রতিদিনই বাড়ছে ডলারের দাম। দক্ষিণ আমেরিকার গুটিকয়েক দেশ (ব্রাজিল, উরুগুয়ে, পেরু, মেক্সিকো) ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রার বিপরীতেই মার্কিন ডলারের মূল্য বেড়েছে অভাবনীয় হারে। সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে শ্রীলংকান রুপির (প্রায় ৮০ শতাংশ), যদিও শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। ভারতীয় রুপিরও পতন হয়েছে বেশ। ব্রিটিশ পাউন্ডের ঐশ্বর্য মার খেয়েছে ডলারের কাছে। গত বছরের ঠিক এ সময়ের তুলনায় ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ড এবং জাপানি ইয়েনের মূল্য কমেছে ২০ শতাংশ এবং ইউরো ১৫ শতাংশ। এমনকি চীনা রেনমিনবি, যার দাম বেঁধে রাখা হয়েছিল ডলারের সঙ্গে, কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশের মুদ্রা মান কমেছে ২০ শতাংশেরও বেশি।

ডলারের হঠাৎ এত দাম বাড়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যকে। বিশ্ববাজারে এখন ডলারের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক বিশ্বব্যাপী একটা বড় মন্দার আভাস দিচ্ছে। এ অবস্থায় সব দেশই সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বেড়েছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি, এমনকি উন্নত অনেক দেশের তুলনায়ও বেশি। এ বর্ধিত সুদের হার বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করছে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মতো তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করতে। গত কয়েক মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড পরিমাণ তহবিল উদীয়মান বাজার থেকে সরিয়ে মার্কিন মুলুকে বিনিয়োগ করেছে। যেহেতু এসব সম্পদে বিনিয়োগ করতে দরকার ডলার, বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য মুদ্রার বিনিময়ে ডলার কিনছেন। এতে বিশ্ববাজারে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ডলারের দাম। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং পাহাড়সম বিদেশী ঋণের যুগপৎ উপস্থিতি যেকোনো অর্থনীতির কঠিন সময়ের ইঙ্গিত করে।

বর্তমানে কোনো সূচকই বাংলাদেশ অর্থনীতির ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে না। নভেল করোনাভাইরাসে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য দেশটি সব প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব লাঘবের নিমিত্তে সরকারের নানা ধরনের প্রণোদনা কিছুটা হলেও দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করেছে। তবে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। মূল্যস্ফীতির একটি প্রধান কারণ হলো টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ে। যেহেতু বাংলাদেশের রফতানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি, তাই ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়ায়। ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ দুই দেশ থেকে বাংলাদেশ জ্বালানিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করে। যুদ্ধের কারণে পৃথিবীব্যাপী সরবরাহ চেইনের ওপর এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে আমদানি পণ্যের। এর রেশ ধরেই সরকার গত আগস্টে প্রায় সব ধরনের জ্বালানি শক্তির দাম বাড়িয়েছে উচ্চহারে, যার প্রভাব পড়েছে পণ্য ও পরিষেবায়।

বলা বাহুল্য, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবটা বেশি পড়বে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে। বর্তমানে (২০২০-২১ অর্থবছরের শেষে) বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। এই এক বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এটা অনুমান করা হচ্ছে যে ২০২৩ সালের শেষে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে তবে ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের ঘাড়ে ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটা বিশাল ঋণের বোঝা তৈরি হবে।

প্রথম কয়েক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকায় বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে হয়নি বলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ঋণের চাপ কম ছিল। আগামী বছর থেকে নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে সুদসহ আসলের অংশ। যেহেতু বিদেশী ঋণের সিংহভাগই ডলারে, সেহেতু ডলারের মানের ঊর্ধ্বগতিতে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এতে দেশের আর্থিক কাঠামোর ওপর বেশ চাপ পড়বে। অর্থাৎ সরকার দেশীয় উৎস থেকে অধিক হারে ঋণ নেয়ার চেষ্টা করবে। সরকারি ঋণ সুদের ওপর নির্ভর করে না করলেও ব্যক্তি খাতের ঋণ সুদহার দিয়ে প্রভাবিত হয়। তাই দেশীয় উৎস থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণ আদতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে অনুৎসাহিত করবে।

এমনিতেই বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অবস্থা নাজুক। ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বছরের প্রথম সিকি ভাগে অর্থাৎ মার্চের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা যা দ্বিতীয় সিকিভাগ, অর্থাৎ জুনের শেষে এসে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এ তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা।

২০২০ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়েছে, যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি। আমানতের সুদের হার থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে থাকে প্রকৃত সুদের হার। সেই হিসাবে আমানতের ওপর প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের প্রকৃত মূল্য কমতে থাকবে। এ অবস্থা আমানতকারীদের বর্তমান ভোগকে উৎসাহিত করবে এবং সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করবে। দীর্ঘমেয়াদে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। তবে সব আমানতের সুদের হার এক রকম নয়। আমানতের ধরন এবং সময়ভেদে সুদের হারের তারতম্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে, আগস্টে ব্যাংকগুলোয় আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার আমলে নিলে আমানতকারীদের ব্যাংকে টাকা রাখার অর্থনৈতিক কোনো যুক্তি নেই।

সেই প্রভাব অবশ্য পড়েছে ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের প্রবৃদ্ধির ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২ রাজস্ব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আমানত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ২ শতাংশ যা চতুর্থ বা শেষ প্রান্তিকে (জুন ২০২২) কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ ২০২১ সালের জুনে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চেয়ে ঋণের সুদ (সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ) ঋণগ্রহীতাদের ঋণ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। ২০২২ সালের জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলে টান পড়বে, যা ব্যাংকের সহনশীলতাকে আরো নাজুক করবে।

এ সব কিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতি বিরাজমান মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর। সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে; যেমন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে কয়েক ঘণ্টা করে লোডশেডিং এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য কারবারি ঘণ্টা কমিয়ে আনাসহ কৃচ্ছ্র সাধন। এসব পরিকল্পনার কড়াকড়ি প্রয়োগ ব্যবসায়কে দুর্বল করে অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে নিম্নমুখী করবে যা জিডিপির উচ্চপ্রবৃদ্ধির প্রবণতাকে টেনে ধরবে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সরকারের জন্য অবশ্যই কঠিন হবে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে দরকার বিনিয়োগ যা নির্ভর করে কত স্বল্প হারে ব্যাংকগুলো গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে তার ওপর। এ অর্থে বর্তমানে বেঁধে দেয়া ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ একটি ভালো নীতি মনে হতে পারে। অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসে অর্থের প্রবাহ কমাতে ঋণের সুদ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ঋণের ওপর বেঁধে দেয়া সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেয়ার তাগিদ দিয়েছে। এটা সরকারের জন্য অবশ্যই একটা উভয়সংকট অবস্থা। ঋণের সুদ বাড়ালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, আবার বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ও মূল্যস্ফীতি হ্রাসে ঋণের সুদ বাড়াতে হবে। হয়তো এ ভাবনা থেকেই সরকার ঋণের সুদ কমানোর তাগিদ বোধ করছে না। কিন্তু ডলারের দাম দিয়ে প্রভাবিত মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য সরকারের বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

প্রথমত, দেশীয় অর্থনীতিতে ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে রেমিট্যান্সের আন্তঃপ্রবাহ বাড়ানোর দিকে। সরকার এরই মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ নীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহে সাড়া মিললেও তা আশানুরূপ নয়। রেমিট্যান্স প্রবাহে যত বাধা আছে তা দূর করতে হবে। বিদেশ থেকে বৈধ পথে টাকা পাঠানোর প্রধান অন্তরায় হলো হুন্ডি। একাধিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে যে হুন্ডিতে প্রদেয় বিনিময় হার ব্যাংকের বিনিময় হার থেকে এত বেশি হয় যে সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা যোগ করেও পার্থক্যটা বেশিই থেকে যায়। সুতরাং সরকারকে এই চ্যানেল অনেক কাজ করতে হবে যাতে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে আগ্রহ বোধ করে।

দ্বিতীয়ত, দেশে ডলারের চাহিদা বাড়ায় এমন কর্মকাণ্ডের পরিধি আপাতত সীমিত করতে হবে। বিলাসবহুল পণ্যের আমদানিতে কড়াকড়ি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে মৌলিক পণ্যের আমদানি যতটা সম্ভব কমাতে হবে। যেমন চাল, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দেশে উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এবং তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। আর যদি একান্তই আমদানি করতে হয়, তবে আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য একান্তই কাম্য। রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আমদানি সামগ্রীর বিকল্প কোনো উৎস আগে থেকেই জানা থাকলে এ দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ হয়তো আমদানি পণ্যের খরচ এত বেশি বাড়তে দিত না।

তৃতীয়ত, ডলারের চাহিদা হ্রাসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ওপর নির্ভর করা যেতে পারে। ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) নিজেদের মধ্যে কমন কারেন্সি বাস্কেট উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েছে। সময়ই বলে দেবে এই কারেন্সি বাস্কেট কতটা সফলতার মুখ দেখে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় লেনদেনে নিজেদের মুদ্রার ওপর নির্ভর করার দাবি এখন অনেকটাই বাস্তব। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেনে ভারতীয় রুপির মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এমন সম্ভাবনার দিক অবশ্যই ভালো করে খতিয়ে দেখা উচিত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য অনেক বেশি। তবে ব্যালান্স অব পেমেন্ট ভারতের অনুকূলে। অর্থাৎ ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ রফতানি বাবদ যা পাবে, আমদানির জন্য তার চেয়ে বেশি দিতে হবে। এ অবস্থায় ভারতীয় রুপিতে লেনদেন করলে ভারতের কিছুটা লাভ হলেও সঠিক পরিকল্পনা করে অগ্রসর হলে কোনো দেশেরই ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে না। স্বর্ণমানের নিরিখে দুই দেশের মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। শুরুতে রুপির মাধ্যমে লেনদেনের একটা সর্বোচ্চ সীমা, যেমন ভারতে বাংলাদেশের রফতানি মূল্যের সমান বা তার চেয়ে কম, নির্ধারণ করা সমীচীন হবে। দরকার হলে পরবর্তী সময়ে সেটা আবার সমন্বয় করে নেয়া যাবে। পরীক্ষামূলকভাবে কোনো একটি দেশের সঙ্গে এভাবে লেনদেন শুরু করলে তার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা করে লেনদেনে মুদ্রার বৈচিত্র্য অবশ্যই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাবে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি কৃত্রিম বা তৈরি করা কোনো ঘটনা নয়; বরং বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির একটা যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক পরিণতি। সারা বিশ্ব যখন সম্ভাব্য একটা অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রবৃদ্ধি তখনো অনেকটাই স্থিতিশীল। এ স্থিতিশীলতা ডলারের মূল্যকে ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে যার জন্য ডলার-বিন্যস্ত যেকোনো আর্থিক সম্পদকে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ মনে হয়। তাই অর্থনৈতিক কোনো অশুভ ইঙ্গিত পেলে বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান অর্থনীতি থেকে নিরাপত্তার আশায় ডলার-বিন্যস্ত সম্পদে বিনিয়োগ করেন। সুতরাং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব এড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে নিজের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: বিভাগীয় প্রধান, ফাইন্যান্স ও অর্থনীতি বিভাগ, নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান

আরও