বিশ্ব হাতি দিবস

মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা ও সচেতনতা

দেশের বিন বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে কমপক্ষে ৫০ হাতি মারা গেছে। কেবল ২০২১ সালেই মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাতের ঘটনায় রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৪টি হাতি মারা যায়। এর পরবর্তী বছরে তিনটি, ২০২৩ সালে দুটি এবং গত বছর একটি হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মানুষ-হাতি সংঘাত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শেরপুর, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ সংঘাত বেশি ঘটছে। মানুষের অনুপ্রবেশ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় হাতিগুলো মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এ সমস্যা শুধু এ মহান প্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পরিবেশকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো হাতি ও মানুষের মৃত্যুর উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখাচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন হাতিকে"চরম সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সংস্থাটির ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ২৬৮টি বিপন্ন এশীয় হাতি রয়েছে, যাদের প্রধান আবাস চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলায়।

মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও দেশবাসীর কাছে এর সুফল প্রতীয়মান হয়নি। দেশের বিন বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে কমপক্ষে ৫০ হাতি মারা গেছে। কেবল ২০২১ সালেই মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাতের ঘটনায় রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৪টি হাতি মারা যায়। এর পরবর্তী বছরে তিনটি, ২০২৩ সালে দুটি এবং গত বছর একটি হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক থেকে হাতি মৃত্যুর যে তথ্য পাওয়া যায় সেগুলোও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর ঝিনাইগাতী উপজেলার একটি ধানক্ষেত থেকে একটি বন্য প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হাতির মরদেহ উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দা ও বন কর্মকর্তাদের ধারণা, ফসল রক্ষার জন্য স্থাপিত বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুতায়নের কারণে হাতিটির মৃত্যু হয়েছিল। গত বছর উখিয়া ও টেকনাফে সাতটি হাতির মৃত্যু রেকর্ড করা হয়, যার প্রধান কারণ ছিল বিদ্যুতায়ন, গুলিবিদ্ধ হওয়া, খাবার সম্পর্কিত রোগ ও অপুষ্টি। এছাড়া একই বছরের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেললাইনে একটি হাতির বাচ্চা ট্রেনে ধাক্কা খেয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং পরে মারা যায়। চলতি বছরের শুরুতে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে আরো কয়েকটি হাতির মৃত্যু রেকর্ড করা হয়, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংঘাতের নতুন হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া এ বছরেরই ২০ মার্চ নালিতাবাড়ী উপজেলার সোমসচুরা এলাকায় একটি স্ত্রী হাতি (আনুমানিক ১৫-২০ বছর বয়সী) বৈদ্যুতিক শকে মারা যায়। তদন্তে হাতির শুঁড়ে পোড়া দাগ পাওয়া যায়, যা সম্ভবত ক্ষুধার্ত হাতির পাল থেকে ফসল রক্ষার জন্য বসানো অস্থায়ী বৈদ্যুতিক ফাঁদের কারণে হয়েছিল। এভাবে প্রতিনিয়তই হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের কারণে শুধু যে হাতিরই মৃত্যু ঘটেছে তা নয়, হাতির পাশাপাশি বহু মানুষেরও প্রাণহানি ঘটেছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে কমপক্ষে ৮৩ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২০১৬ সাল থেকে নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের কারণ বের করার জন্য দেশের বিভিন্ন সংস্থা নানা রকম গবেষণার কাজ করেছে। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পরিষেবা মঙ্গাবেতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, আইউউসিএন বাংলাদেশ গবেষণা করে দেখেন বাংলাদেশের হাতিরা ঐতিহ্যগতভাবে ১২টি করিডোর ব্যবহার করে চলাচল করত, যার বেশির ভাগই নগরায়ণ, শরণার্থী শিবির ও অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে দখল হয়ে গেছে। কক্সবাজারের পাঁচটি করিডোর রোহিঙ্গা শরণার্থী বসতি দ্বারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেপিজেড), চায়না ইকোনমিক জোন এবং আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর মতো শিল্প প্রকল্পগুলো হাতির চলাচলের পথগুলোকে বিঘ্নিত করছে। এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক ও পরিকল্পিত রেলপথ সম্প্রসারণ হাতির প্রাকৃতিক আবাস ও চলাচলের পথ ধ্বংস করে ফেলছে, যার ফলে হাতির পাল কৃষিজমি ও মানুষের বসতির দিকে চলে আসছে যার ফলস্বরূপ মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, হাতি রক্ষায় বন বিভাগ দেশের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় ১৩০টিরও বেশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) মোতায়েন করেছে। তবে অধিকাংশ দলই তীব্র অর্থসংকটে ভুগছে, যা তাদের কার্যক্রমকে ব্যহত করছে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা না হওয়ায় তার বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবারই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করার কিছুদিন পরই আবার মানুষ হাতির প্রতি অসহনশীল হয়ে যায়।

হাতির প্রতি অসহনশীল আচরণের জন্য সরকারের রয়েছে বিভিন্ন আইন ও শাস্তির বিধান। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী কেউ কোনো বাঘ বা হাতি হত্যা করলে ওই অপরাধের জন্য সেই ব্যক্তি জামিন অযোগ্য হবেন এবং তিনি সর্বনিম্ন দুই বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

প্রায় তিন বছর আগে বিগত সরকারের আমলে হাতি সংরক্ষণে একটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বন বিভাগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব ও হাতির মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় বন বিভাগ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিন্তু আজ পর্যন্ত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে দেখিনি। সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাতি ও মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে আবারও হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বনভূমি সংকোচন ও খাদ্য ঘাটতিকে মানুষ-হাতি সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা এবং সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এ প্রকল্পের নকশা করা হয়েছে আর সঙ্গে থাকছে মানুষকে সচেতন করার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা। এই প্রকল্প যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হলে হয়তো হাতিরা তাদের করিডোর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে, তাদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত হবে এবং নিরসন হবে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব।

মো. মুজাফফর ফয়সাল: গবেষক ও পরিবেশবিদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি, বেলা

আরও