লন্ডনে ব্র্যাক জীবনের এক বছর

আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে লেখাপড়া করতে যান, তাদের বেশির ভাগই দেশে ফেরেন না। যদিও এ ব্যাপারে আমার নিজের মনে কখনো কোনো সংশয় ছিল না। দেশে মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও ব্র্যাক। এ টান তো অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে দেয়া যাবে না। তবুও লন্ডন থাকাকালীন নায়েলাসহ অনেকেই বলেছিল, লন্ডনে যখন এসে গেছ, পিএইচডি শেষ করে যাও। কোনো একসময় ভাবতে শুরু করলাম, সত্যিই তো। পিএইচডি শেষ করে তারপর দেশে ফিরলে কেমন হয়? আবেদ ভাইকে আমার নতুন ইচ্ছার কথা লিখে জানালাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতি দিলেন। এও বললেন, পিএইচডি তো কিছুদিন পরও করতে পারবে। তবে যেহেতু একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাই চেষ্টা করে দেখ। উৎসাহ নিয়ে ক্রিস লেংফোর্ডকে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। তিনি বললেন, ভালো কথা। কিন্তু তুমি কী নিয়ে কাজ করতে চাও? মাথায় দেশের অধিক জনসংখ্যার বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার ওপর ডেমোগ্রাফি পড়ে নতুন নতুন ধারণার উদ্রেক হচ্ছিল। পড়েছিলাম, কীভাবে সমাজ বা পরিবার তাদের চোখে Value of children-কে দেখে। যে সমাজে সন্তানের বৈশ্বিক মূল্য বেশি, সেই সমাজে জন-উর্বরতা বা ফার্টিলিটি বেশি থাকে। এটা তো সহজবোধ্য। কোরিয়া ও তাইওয়ানে এ বিষয় নিয়ে বিশদ গবেষণা হয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তেমন একটা হয়নি।

(গতকালের পর)
 আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে লেখাপড়া করতে যান, তাদের বেশির ভাগই দেশে ফেরেন না। যদিও এ ব্যাপারে আমার নিজের মনে কখনো কোনো সংশয় ছিল না। দেশে মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও ব্র্যাক। এ টান তো অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে দেয়া যাবে না। তবুও লন্ডন থাকাকালীন নায়েলাসহ অনেকেই বলেছিল, লন্ডনে যখন এসে গেছ, পিএইচডি শেষ করে যাও। কোনো একসময় ভাবতে শুরু করলাম, সত্যিই তো। পিএইচডি শেষ করে তারপর দেশে ফিরলে কেমন হয়? আবেদ ভাইকে আমার নতুন ইচ্ছার কথা লিখে জানালাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতি দিলেন। এও বললেন, পিএইচডি তো কিছুদিন পরও করতে পারবে। তবে যেহেতু একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাই চেষ্টা করে দেখ। উৎসাহ নিয়ে ক্রিস লেংফোর্ডকে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। তিনি বললেন, ভালো কথা। কিন্তু তুমি কী নিয়ে কাজ করতে চাও? মাথায় দেশের অধিক জনসংখ্যার বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার ওপর ডেমোগ্রাফি পড়ে নতুন নতুন ধারণার উদ্রেক হচ্ছিল। পড়েছিলাম, কীভাবে সমাজ বা পরিবার তাদের চোখে Value of children-কে দেখে। যে সমাজে সন্তানের বৈশ্বিক মূল্য বেশি, সেই সমাজে জন-উর্বরতা বা ফার্টিলিটি বেশি থাকে। এটা তো সহজবোধ্য। কোরিয়া ও তাইওয়ানে এ বিষয় নিয়ে বিশদ গবেষণা হয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তেমন একটা হয়নি।

ক্রিসকে বললাম, এটা নিয়ে কাজ করলে কেমন হয়? মনে হলো তিনি ব্যাপারটি ভালোভাবে বুঝেই তবে সায় দিলেন।

জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সুপারভাইজার কে হবেন? এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন এমন অধ্যাপক আমাদের ডিপার্টমেন্টে নেই। এমনকি সারা এলএসইতে আছেন কিনা আমার সন্দেহ ছিল। নায়েলার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, টিম ডাইসন নামে একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপক রয়েছেন, যিনি কিনা পরের বছর এলএসইতে যোগ দেবেন। তাঁর সাহায্য পেতে হলে আরো এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা করতে চাইনি। ওদিকে মা-বাবা, দেশ ও ব্র্যাক আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তাই আপাতত পিএইচডির কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেশে ফেরার চিন্তা করতে লাগলাম।

আগেই বলেছি, বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক বাংলাদেশী আর দেশে ফেরেন না। কেন এ রকম হয় তার কারণ বুঝতে কষ্ট করতে হয় না। উন্নত বিশ্বের আকর্ষণ অনেক। ভালো থাকা-খাওয়া, ঘুরে বেড়ানো, ব্যক্তি স্বাধীনতা, এসবই ভীষণভাবে টানে। কিন্তু ইচ্ছা করলেই সবাই থাকতে পারে না। ইমিগ্রেশনের সমস্যা রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ওই সময় অর্থাৎ সত্তরের দশকের শেষ দিকে বিলাতে ইমিগ্রেশন পাওয়াটা বেশ কষ্টকর ছিল। কিন্তু বাংলাদেশীদের জন্য একটা সহজ পথও খোলা ছিল। বিলাতে অনেক বাংলাদেশীর বাস। তারা সেখানে কয়েক যুগ ধরে বসবাস করছে। যার বেশির ভাগ অবশ্য সিলেটি। সেখানকার মা-বাবা তাদের কন্যাসন্তানের জন্য সবসময় বাঙালি (এবং সিলেটি) ছেলেদের দিকে বেশি ঝোঁকে। আর শিক্ষিত হলে তো কথাই নেই। একদিন সাহেরীন বলল, তুমি এখানে থেকে যাও। এলএসইর ডিগ্রি নিয়ে ভালো চাকরি করবে আর আমি একজন সিলেটি মেয়ে খুঁজে বের করব। তুমি পছন্দ না করে পারবে না। এ কথা বলে সে কয়েকজন সম্ভাব্য কনের কথাও বলল। আমি মনে মনে হাসলাম আর তাকে বললাম, আমার পক্ষে সেটা করা সম্ভব নয়। বললাম, আমি দেশে ফিরে যাব এবং সেখানেই বিয়ে করব। সেটাই আমার ভবিষ্যৎ। আরো বললাম, এ দেশে নিশ্চিন্তে থাকা যায় সত্য, কিন্তু এখানে তো আমি হব তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। এরা কখনো আমাকে তাদের সমকক্ষ মনে করবে না এবং সেই হিসেবে আমার সন্তানরাও তা-ই হবে। বাংলাদেশ আমার দেশ। খাওয়া-থাকার সমস্যা থাকলেও সেখানে তো আমি প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। তারপর এ বিষয়ে আলোচনা খুব বেশি এগোয়নি।

মনে পড়ে, নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের এক কর্মীকে আমরা এলএসইতে পাঠিয়েছিলাম হেলথ ইকোনমিকসে মাস্টার্স করতে। স্বাস্থ্য গবেষণা বিষয়ে উত্কর্ষ বৃদ্ধির জন্য তাকে নিয়ে আমাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল। খুবই বড় এক আঘাত পেয়েছিলাম যখন সে আর ফিরল না। সে আঘাত এখনো আমাকে তাড়া করে ফেরে।

নতুন শিক্ষার্থীদের যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছিল, সবাই নিজ নিজ পরিচয় দিচ্ছিল। তারা বলছিল, আমি অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। আমি ওই সংস্থায় কাজ করি ইত্যাদি। কিন্তু আমার খারাপ লাগছিল। কারণ ব্র্যাককে কেউই চেনে না। কেউ নামই শোনেনি! ব্র্যাক তো দূরের কথা, বাংলাদেশই অনেকের কাছে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন। ব্যাখ্যা করে বলতে হলো যে, বাংলাদেশ হলো নবীন এক দেশ, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যার জন্ম। এটা ভারতীয় উপমহাদেশে ইত্যাদি। লন্ডন কেন, বাংলাদেশের ক’জনই বা তখন ব্র্যাককে চেনে? আমি যখন ঠিক করলাম ব্র্র্যাকে যোগদান করব, তখন অনেককেই ভ্রু কুঁচকাতে দেখেছি। আজ যেটাকে মনে হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত, ওই সময় জোর করে তা বলতে পারিনি। আমার বন্ধুদের মধ্যে বশির ও শহীদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে, ফারুক আহমদ বিশ্বব্যাংকে, শেখ আলীনূর ইউএসএইডে, আহমদ আল কবীর ইউএনএফপিএতে, মেহরাজ ঝোরা ইউনিসেফে, হাবীব খন্দকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছে। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। যাহোক, আমার দৃঢ়তা দেখে এবং এক বছর পরই উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাচ্ছি শুনে অনেকেই আশ্বস্ত হয়েছিলেন। আজ তো ব্র্যাক কী তা আর ব্যাখ্যা করতে হয় না। ব্র্যাকে কাজ করার সুযোগ পেলে সবাই নিজেকে ধন্য মনে করেন—কি দেশী, কি বিদেশী!

আগেই বলেছি, বিলাতের অনেক কিছুই ঈর্ষণীয়। এর একটি হলো তার বিভিন্ন সিস্টেমের দক্ষতা। একটি উদাহরণ দিই। আমার বন্ধু ঝোরা কানাডার কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছে। সে লন্ডনে আসবে বেড়াতে, তাই আমার খোঁজ। কিন্তু আমার সত্যিকার ঠিকানা তার জানা ছিল না। সে জানত আমি এলএসইতে পড়ি। তাই একটি চিঠি পাঠিয়ে দিল। খামে ভুলবশত এলএসইর বদলে এলএসি লিখে দিল এভাবে: আমার নাম, এলএসি-লন্ডন। ডেমোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের পিজিয়ন হোলে এ চিঠি পেয়ে আমি তো অবাক! নিশ্চয়ই ডাক বিভাগের লোকজনকে এটা নিয়ে বেশ মাথা ঘামাতে হয়েছিল, কিন্তু সঠিকভাবে আমার কাছে চিঠিটি পৌঁছেছিল।

বন্ধু রকীব সম্পর্কে আগেও বলেছি। সে তখন কেমব্রিজে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করছে। দারুণ ছাত্র। এসএসসিতে সব বোর্ডের মধ্যে প্রথম হয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিল। আমরা তার গর্বে ছিলাম গর্বিত। আমাকে সে একটি বই উপহার দিয়েছিল, যা আজ সবারই চেনা এবং অনেকেই পড়েছেন। সেটা হলো স্টিফেন হকিংয়ের ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’। হকিং কিছুদিন আগে দেহত্যাগ করেছেন। ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনি একজন। লন্ডনে থাকাকালীন আরেকটি বই আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। মাহমুদ মামদানীর লেখা The Myth of Population Control। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ভারতের পাঞ্জাবে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুরু করে। তারা দেখতে চেয়েছিল পরিবার পরিকল্পনা সহজলভ্য করলে গ্রামের মানুষ সেটা কতটা গ্রহণ করে। প্রকল্পের নামকরা গবেষকরা একমত হলেন যে, এ প্রকল্প সার্বিকভাবে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল এবং এ সম্পর্কে তারা একটি বইও লিখেছিলেন। বইটির নাম The Khanna Study। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর হার্ভার্ডের একজন ছাত্র মাহমুদ মামদানী ওই এলাকায় ফিরে যান। তিনি ওই প্রকল্প সম্পর্কে আরো নিবিড়ভাবে নিরীক্ষা করেন এবং প্রকল্প তথা তৃতীয় বিশ্বে পরিবার পরিকল্পনা প্রসারের সম্ভাবনা দেখতে চান। হার্ভার্ড প্রকল্পে দেখানো হয়েছিল যে, গ্রামবাসী সহজেই পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মামদানী তার নৃতত্ত্বজ্ঞান প্রয়োগ করে দেখান যে ওই ফলাফল অনেকটাই ছিল অতিরঞ্জিত। যেমন কোনো এক গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করে মামদানী সহজেই বোঝেন যে হার্ভার্ড প্রকল্পের হিসেবে ওই লোক ছিলেন পরিবার পরিকল্পনার একজন গ্রহীতা, কিন্তু বাস্তবে তিনি তা নন। মামদানীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেখুন (আমেরিকান) সাহেবরা আমাদের গ্রামে এসে কোনো একটা ওষুধ গ্রহণ করতে বলেছে। যদিও এটা আমাদের শুরু থেকেই অপছন্দ, কিন্তু আমরা তাদের নাখোশ করতে চাইনি। তারা ওষুধ দিয়েছে আর আমরা তা ফেলে দিয়েছি। যেহেতু আমাদের বড় পরিবার দরকার, সেহেতু একই সময় আমরা সন্তানও জন্ম দিয়েছি। কিন্তু সাহেবরা তা খেয়াল করেনি। মামদানীর উপসংহার ছিল, পাঞ্জাবের মতো দরিদ্র গ্রামবাসী কখনো পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না আর্থসামাজিক কারণে তাদের বড় পরিবারের প্রয়োজন ফুরোয়। অনেকটা মার্ক্সীয় মতবাদ।

আমি মামদানীর উপসংহারের সঙ্গে ব্র্যাকের দৃষ্টিভঙ্গির মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। নৃতাত্ত্বিক গবেষণার উপযোগিতার এটা একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মনে মনে রঞ্জিত সেনারত্ন ও আবেদ ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানের এ বিশাল ক্ষেত্রে আমাকে পরিচিত করার কারণে। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে শাল্লাতেও আমাদের একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তখন অনেক চেষ্টা করেও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতার হার কুড়ির বেশি করা যায়নি। ব্র্যাক তখন গ্রামে গ্রামে নামমাত্র মূল্যে কনডম ও খাবার বড়ি বিতরণ করত। কর্মীদের প্রতি মাসের টার্গেট থাকত। শোনা কথা, টার্গেট অর্জন না হওয়ায় কর্মীদের কেউ কেউ তখন নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কিনে পরে তা ফেলে দিত। এর পরই ব্র্যাকের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করা হয়।

আগের পর্বে বলেছি, এলএসই ডেমোগ্রাফি কোর্সের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ডেমোগ্রাফিক পরিমাপ (Demographic measurement)। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ডেমোগ্রাফিক ডাটা খুব নিম্নমানের। এগুলোর মধ্যে অনেক ভুলত্রুটি বিদ্যমান। আমাদের শেখানো হতো কীভাবে এ নিম্নমানের তথ্যাবলিকে উন্নীত করে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তৈরি করা যায়। উইলিয়াম ব্রাস, জন ব্লেকার নরমেন কেরিয়ারের মতো অধ্যাপকরা এ কাজে বিশ্বখ্যাত। তাদের কাছে পড়ে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। অনেক ধরনের টেকনিক আমরা শিখেছিলাম, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জন্মহার, মৃত্যুহার ও জন উর্বরতাহার পরিমাপ করতে পারতাম। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল বেশ জটিল। আমাদের ক্লাসে অনেকেই এজন্য বেশ সমস্যায় পড়ত। সমাপনী পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এলো। দিন-রাত পড়েও কুলানো যাচ্ছিল না। পরীক্ষায় তো এসব টেকনিক সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যাচাই হবে। যেসব টেকনিক পড়ানো হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটি প্রস্তুতি নিলাম। মোহাম্মদ কবীর নামে এক বাংলাদেশীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক এবং ব্রাসের সঙ্গে পিএইচডি করছিলেন। সামনে ঈদ। কবীর ভাই আমাকে বললেন, ঈদের দিন দুপুরে আমাদের বাসায় খাবে। যথারীতি চলে গেলাম। কবীর ভাবির তৈরি করা মজার মজার খাবার শেষ করার পর কবীর ভাই বললেন, ব্রাস সাহেব নতুন একটি ডেমোগ্রাফিক টেকনিক আবিষ্কার করেছেন। হয়তো তোমাদের পরীক্ষায় তিনি এটি দেবেন। তিনি আরো বললেন, তোমাকে আমি সেটা শিখিয়ে দেব। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখলাম, সত্যি সত্যি ওটা এসেছে। সেই পেপারে আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলাম। কবীর ভাই সম্প্রতি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। অক্টোবরে সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ১৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল। এ যেন এক সুনামি!
২০১৮ সালের অক্টোবরে আমি আরেকবার লন্ডনে গিয়েছিলাম। বিলাতে বাংলাদেশীদের দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত অনেক ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’ আছে। এদের সংখ্যা কম করে হলেও প্রায় ১০ হাজার হবে। বিলাতের প্রতিটি ছোটবড় শহরের আনাচে-কানাচে এগুলোর অবস্থান। এ রেস্টুরেন্ট মালিকদের (যাদের বলা হয় ‘গাভনার’) সংগঠনের নাম ‘বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ)’। প্রতি বছরের অক্টোবরে তারা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্রিটেনবাসীর কাছে বাংলাদেশের খাবার তথা বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টের ইমেজ তুলে ধরা এবং সেটা বৃদ্ধি করা। এ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে তার সমাজসেবামূলক কাজের জন্য সম্মাননা জানানো হয়। এ পর্যন্ত যারা এ সম্মাননা পেয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই ব্রিটেনবাসী, ইংরেজ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর। ২০১৮ সালে এ সম্মাননার জন্য আমাকে নির্বাচিত করা হয়। এর আগে বাংলাদেশ থেকে এ সম্মাননা পেয়েছিলেন কৃষি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ।
যথাসময়ে লন্ডনের এক বিখ্যাত হোটেলের বলরুমে উপস্থিত হলাম। সেখানে নারী-পুরুষ-শিশু মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক মানুষ। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ছাড়াও বেশকিছু স্থানীয় অর্থাত্ শ্বেতাঙ্গ লোককে দেখতে পেলাম। বিসিএর প্রেসিডেন্ট কামাল ইয়াকুব ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পাশা খন্দকার আমাকে তাদের অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বেশির ভাগই স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কয়েকজন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য বা এমপি। অনুষ্ঠান শুরু হলো। দুজন উপস্থাপক চমত্কার ভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করলেন। তারপর পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা হলো BCA Honour Award 2018 বিজয়ী মোশ্তাক চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে মেগাস্ক্রিনে আমার সংক্ষিপ্ত জীবনী ভেসে উঠল। মুহূর্তে উত্তেজনায় মনটা ভরে গেল। আমাকে ডেকে নেয়া হলো ডায়াসে। দেখলাম সেখানে উপস্থিত রয়েছেন ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী পেনি মরডেন্ট। তিনিই আমার হাতে পুরস্কারটি তুলে দিলেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিসিএকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি ব্র্যাক সম্পর্কে একটু আলোকপাত করলাম। ধন্যবাদ জানালাম বিলাতের সাধারণ মানুষকে, যারা জন্মকাল থেকে ব্র্যাককে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে এসেছেন। বিসিএ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন, তাই খাওয়া-দাওয়ার কোনো কমতি ছিল না। বিচিত্র সব মজাদার খাবার!
বিলাতে এসব রেস্টুরেন্ট খুবই জনপ্রিয়। এদের সিংহভাগ খদ্দেরই শ্বেতাঙ্গ। কোনো না কোনোভাবে তারা উপমহাদেশীয় মসলাযুক্ত খাবারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালে লন্ডনে পড়ার সময় এ রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। ২০ সেপ্টেম্বর এমএসসির শেষ পরীক্ষাটা হয়ে গেল। ফল বেরোবে অক্টোবরের শেষ দিকে। সাহেরীন বলল, তোমার তো প্রায় সপ্তাহ পাঁচেক হাতে আছে। এ সময়টায় একটু আয় করলেই পারো। সে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির ছাত্র, তাই অনেক রেস্টুরেন্টের গাভনারদের সঙ্গে পরিচিত। বলল, তুমি Isle of Wight-এচলে যাও। ওখানকার এক রেস্টুরেন্ট মালিক আমার খুবই পরিচিত। যেমন কথা তেমন কাজ। লন্ডন থেকে ট্রেনে পোর্টসমাউথ। সেখান থেকে আধাঘণ্টার জাহাজ ভ্রমণ করলেই Isle of Wight। এটা ছোট্ট একটা দ্বীপ। অনেকগুলো ছোট শহর মিলে এ দ্বীপ। ইংলিশ চ্যানেলের বুকে অবস্থিত দ্বীপটির অধিবাসী প্রায় এক লাখ, যার সবাই প্রায় শ্বেতাঙ্গ। প্রধান একটি শহর নিউপোর্ট। সাহেরীনের সেই রেস্টুরেন্টটি এ শহরেই। রেস্টুরেন্টের দুজন মালিক। মনে হলো আমার বয়সী। ডাক নামেই তাদের চিনলাম। একজন মোতাহার আর অন্যজন মাখন। পরে দেখলাম শেষোক্তজন স্থানীয়দের কাছে মাইকেল নামেই বেশি পরিচিত। যৌথভাবে তারা এ রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করেন এবং নিজেরা ওয়েটার হিসেবে কাজ করেন। ওই রেস্টুরেন্টে তারা দুজন ছাড়া আরেকজন ওয়েটার ছিলেন। কিচেনে ছিলেন আরো তিনজন, যার একজন শেফ বা প্রধান পাচক। আমি হলাম সপ্তম কর্মী। আমাকে দেয়া হলো ওয়েটারের কাজ। সাহেরীনের সঙ্গে নাকি সে রকম কথাই হয়েছিল। রেস্টুরেন্টের পাওয়ার স্ট্রাকচারে ওয়েটার হলো একটু ‘হাইয়ার স্ট্যাটাস’, যদিও বেতনের দিক থেকে শেফ সর্বাগ্রে।
প্রথম দিনই কাজ শুরু করে দিলাম। খাবার পরিবেশন করা তেমন কিছুই না, যদিও এ কাজ আগে করার সুযোগ ঘটেনি। ড্রিংকস পরিবেশন করতে গিয়ে বিপত্তি বেধে গেল। বিলাতিরা অনেক ধরনের পানীয় পান করে, যার প্রতিটির নাম আমার জানা ছিল না। শ্যাম্পেইন, হুইস্কি, রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইন, লাগার, বিয়ার, লিকার, আইরিশ কফি ইত্যাদি। কাউকে কিছু একটা ড্রিংক দেব কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে ওটা কি বা ওটা কী ধরনের গ্লাসে পরিবেশন করতে হবে। মোতাহার বিষয়টা বুঝতে পেরে আমাকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে এল। শুনতে পেলাম আরেক ওয়েটার নিচুস্বরে বলছে, ‘এই বুঝি এক্সপার্ট ওয়েটার?’ মোতাহারের কাছ থেকে পরে জেনেছিলাম যে, সাহেরীন আমাকে ওদের কাছে এক্সপার্ট হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যা হোক, দু-তিনদিনের মধ্যেই আমি সত্যিকারের ‘এক্সপার্ট ওয়েটার’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলাম। বেতন সপ্তাহে ৭০ পাউন্ড। রেস্টুরেন্টেই খাওয়া-দাওয়া এবং ওপরের তলায় থাকার ব্যবস্থা। সবই নিখরচে। তাই বেতনের পুরোটাই সঞ্চয়। পাঁচ সপ্তাহে আমার রোজগার হয়েছিল ৩৫০ পাউন্ড!
বাংলাদেশী ‘ইন্ডিয়ান’ রেস্টুরেন্ট শিল্প বর্তমানে বেশ সমস্যায় আছে। এর মূল কারণ হলো কর্মী সংকট। ইমিগ্রেশনের বিধিনিষেধ আরো কঠিন হওয়ার কারণে বাংলাদেশ থেকে তেমন কেউ যেতে পারছেন না। অন্যদিকে বিলাতের নতুন বাংলাদেশী প্রজন্ম এ কাজে আর উত্সাহী নয়। তাদের অনেকেই উচ্চতর শিক্ষা শেষে বিভিন্ন ‘হোয়াইট-কলার’ পেশায় নিযুক্তি পাচ্ছে। সিভিল সার্ভিস, অধ্যাপনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতিতেও বাংলাদেশীরা বিশেষ অবদান রাখছে। এমনকি ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও এখন চারজন সদস্য রয়েছেন, যাদের রুটস বাংলাদেশে। তারা সবাই নারী। অবাক হব না, যদি বাংলা ভাষাভাষীদের কেউ বিলাতের মন্ত্রিত্ব পান।
মোতাহার ও মাখনের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিল। মোতাহার তো আমার বিয়েতে যোগ দেয়ার জন্য পরের বছর সিলেটে এসেছিল। কিছুদিন কাজ করার পর যখন আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল, তখন ওদের মন খারাপ হয়ে গেল। মাখন বলল, চলে যাওয়ার আগে এই Isle of Wight-টা ভালো করে দেখে নাও। জানলাম, দ্বীপে একটি বাস ট্যুর আছে। একদিন টিকিট কেটে চড়লাম সেই বাসে। সারা দিনের ট্যুর। এক শহর থেকে আরেক শহরে। সব শহরই খুব ছোট, কিন্তু দেখতে ছবির মতো। নিউপোর্ট থেকে উঠে প্রথমেই Ryde। তারপর একে একে Sandown, Shanklin, Venture Quays & East Cowes। ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ Osborne House, যা East Cowes-এ অবস্থিত। মহারানী ভিক্টোরিয়ার গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ এই Osborne House। রানীর স্বামী রাজকুমার আলবার্ট এ প্রাসাদের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং ১৯০১ সালে এখানেই মহারানীর মৃত্যু হয়। বিরাট এক প্রাসাদ। তখন সম্ভবত বিদ্যুত্চালিত লিফট ছিল না। দেখলাম একটি মাত্র লিফট। যেটা শুধু মহারানীই ব্যবহার করতেন। বিদ্যুতের বদলে রশি দিয়ে টেনে ওঠানো হতো এ লিফট। ইংল্যান্ডের রাজপরিবার বলে কথা! তাও আবার মহারানী ভিক্টোরিয়া! ট্যুর বাস একের পর এক শহরে যাচ্ছে আর বাসের ড্রাইভার সেই শহরের বিশেষত্ব সম্পর্কে আরোহীদের জ্ঞান দিচ্ছেন। ইংরেজরা বেশ রসিক। একটি শহরে বাস ঢুকেছে। ড্রাইভার বললেন, On your left is a major attraction. Many touriststhrong this place everyday. It is a toilet!

 
আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী: ব্র্যাকের সাবেক ভাইস চেয়ার

আরও