করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিক থেকে, বিশেষ করে মার্চের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, করোনাবিষয়ক যে পর্যবেক্ষণটি প্রথমে মাথায় আসে তা হলো, মানুষ করোনা মহামারীকে আর শুরুর মতো ‘ভয়’ পায় না। এখানে ‘ভয়’ কেবল মৃত্যুভয় নয়, এ ভয়টা একভাবে করোনাসংক্রান্ত জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সব বিধিনিষেধ সামাজিক-ব্যক্তিক পর্যায়ে চর্চিত হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘করোনা মহামারী’ মূলত একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতা এই ২০২০ সালের। তবে এই ভীতি থেকে মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় ফিরেছে বলা যায়। কলকারখানা, অফিস-আদালত সবই তার নতুন-স্বাভাবিক বাস্তবতাকে মেনে চালু হয়েছে খাতাকলমে, তবে বাস্তবতায় স্বাস্থ্য সতর্কতা কতটা গ্রাহ্য হয় ব্যক্তিক আচরণে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। পাশাপাশি ‘অনানুষ্ঠানিক খাত’গুলোও (নন-ফরমাল) চালু হয়েছে ‘নব্য স্বাভাবিক’ সময়কে আমলে নিয়ে, কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষ অনেকাংশেই ‘করোনা-পূর্ববর্তী’ বাস্তবতায় ফিরে গেছে (গণপরিবহন, বাজার-ঘাট ইত্যাদি)। আর এখানেই সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আর এই গণসচেতনতায় সমাজে বিদ্যমান তথ্যপ্রবাহ কাঠামো কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখছে, সে বিষয়টিও প্রাসঙ্গিকতা পায়।
সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে করোনা ধাক্কার শুরুর দিকে বিআইজিডির একটা গবেষণার বরাত নিয়ে দেখা যায় যে গবেষণা দল করোনা স্বাস্থ্যবিধিসহ অন্যান্য সামাজিক সচেতনতাবিষয়ক তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিভ্রাট ও বিভ্রান্তির উপস্থিতি অনুধাবন করে এবং সেটাকে ‘ইনফোডেমিক’ (বিভ্রাট ও বিভ্রান্তির বাস্তবতা) ধারনার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টা করেছে। সেই বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, বাংলাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর সময় থেকে তথ্যপ্রবাহে যে বিভ্রাট ও বিভ্রান্তির বাস্তবতা (ইনফোডেমিক), তা এখনো কম-বেশি নানা মাত্রায় বিদ্যমান, আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে মানুষের মনে করোনা নিয়ে এক মিশ্র অনুধাবন পরিলক্ষিত হয়। সম্প্রতি মানুষ যেন ‘মহামারী-ভীতি’র ভেতর থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিকতায় ফিরেছে, অনেক কিছু বুঝে কিংবা না বুঝে।
যদিও এই স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার পেছনে নানা ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, মনোসামজিক প্রেক্ষাপট জড়িত, যেগুলোর জরুরত ব্যক্তিক/সামাজিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবন-জীবিকা, জ্ঞাতি সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনসহ অনেক কিছুই আছে, যা মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন করে।
সাম্প্রতিক সময়ে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এটা অনুধাবিত হয় যে সমাজের মানুষ স্বাভাবিক আর্থসামাজিক বাস্তবতায় ফিরতে চায় করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের মতো করে, কিন্তু বিষয়টিকে সরলরৈখিকভাবে দেখার বা সাধারণীকরণের কোনো সুযোগ নেই। এখানে বিবিধ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত জড়িত, যেগুলোর ভিন্ন ভিন্ন দ্যোতনা রয়েছে ব্যক্তিক প্রাত্যহিক জীবনাভ্যাস চর্চায়।
করোনার কারণে তৈরি হওয়া ‘নব্য স্বাভাবিক’ সময়ে করোনা মোকাবেলার তিনটি প্রধান প্রতিরোধমূলক অভ্যাস (হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা, সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখা) সামাজিক ও ব্যক্তিক পর্যায়ে কী পর্যায়ে আছে, কী রূপে চর্চিত হচ্ছে, তার একটা সম্যক ধারণা পাওয়ার নিমিত্তে ব্র্যাকের উদ্যোগে বিআইজিডি কর্তৃক একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। এ গবেষণায় মূলত বুঝতে চাওয়া হয়েছিল যে করোনাকালীন সমাজে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের লক্ষ্যে যে তথ্য বিস্তার প্রক্রিয়া (কমিউনিকেশন টুল), তা অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে কী আবেদন তৈরি করছে কিংবা মানুষের অভ্যাসে কী পরিবর্তন এসেছে?
আর এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমরা দেখতে পাই, মানুষ করোনা সম্পর্কিত জীবন রক্ষাকারী নানা তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তাগুলোকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে নিজের একটা বোঝাবুঝি বা উপলব্ধিকে প্রাধান্য দেয়, যা মূলত প্রাত্যহিক জীবন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে করোনাকে উপলব্ধি করা।
‘ইনফোডেমিক’ বাস্তবতার মাঝে সমাজে মানুষের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক তথ্যপ্রাপ্তির উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যক্তিক ও সামাজিক পর্যায়ে একটা ধারণা তৈরি করে, সেই ‘তথ্যপ্রাপ্তি ধারণায়নকে’ ব্যক্তি তার প্রাত্যহিক জীবন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যাচাই করে, যেমন তার আত্মীয়স্বজন, গ্রামে বা প্রতিবেশীদের মাঝে করোনা রোগী আছে কিনা, জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদিনের মৃত্যুহার এবং তার চারপাশ, তার জীবিকা, স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো; যা মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে আসে। আর সেই মিশ্র পরিপ্রেক্ষিত ব্যক্তিক ও সামাজিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধিগুলো আচরণের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। আর আমাদের চারপাশে হাটবাজার বা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় ঢিলেঢালাভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চিত্র হরহামেশাই চোখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি অভ্যাসে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেকটা পথ যাওয়ার বাকি, সবার আগে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং সব ভ্রান্তি আর বিভ্রাট দূরীকরণে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া দরকার।
এ অবস্থায় করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নানামুখী বাস্তবতার মাঝে কিছু ভালো অভ্যাস পরিলক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নানা বিভ্রান্তিও দেখতে পাওয়া যায়। যেমন হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে বললে, সবাই কমবেশি সচেতনতামূলক তথ্যগুলো জানে, যদিওবা নিজেদের ব্যক্তিজীবনের অভ্যাসে সেগুলো প্রকটভাবে দেখা যায় না। এর পেছনে কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিক স্বস্তি পাওয়া না-পাওয়া পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে।
করোনা স্বাস্থ্যবিধিচর্চার পরিপ্রেক্ষিতে একজন ব্যক্তি করোনায় মৃতের সত্কারে যে বাস্তবতা, তার ওপর গুরুত্বারোপে জানান, “আমি জানি করোনা কতটা ভয়াবহ! আমি ‘কু-মরা’ চাই না, ‘সু-মরা’ চাই। মরলে অন্তত আত্মীয়স্বজনরা যাতে ঠিকমতো জানাজাটা দিতে পারে। করোনা হয়ে মরলে তো কপালে সেটাও জুটবে না। তাই আমি সব নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। সুযোগ হলেই সাবান দিয়ে হাত ধুই।”
আবার আরেকজন জানান, সবসময় হাত ধোয়া সম্ভব হয় না। কাজের চাপে হাত ধোয়া হয়ে ওঠে না, আর তাছাড়া বাইরে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও নেই। তাই ইচ্ছা থাকলেও সবসময় সব হয় না।
আবার কেউ মনে করেন, মুসলিম যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তারা ওজু করেন। আর এই ওজু করা করোনা মোকাবেলায় যথেষ্ট। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওজু করার সময় মানুষকে সাবান ব্যবহার করতে দেখা যায় না।
আবার কেউবা মনে করেন, ‘করোনা হলো শহরের বড়লোকের রোগ, গ্রামে কিংবা গরিবদের এই রোগ কিছু করতে পারবে না, গরিবের আল্লাহ আছে। আল্লাহ না চাইলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, হাত ধোয়ে সাদা বানাইয়া ফেললেও করোনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। তাই আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হবে এসব স্বাস্থ্যবিধি আর হাত ধোয়ার থেকে।’
এমন মিশ্র বাস্তবতায় কিছু ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগ আশাবাদী করে তোলে সামনের দিনগুলোয় করোনা মোকাবেলার পরিপ্রেক্ষিতে। ব্যক্তিক ও সামাজিক উদ্যোগের নানা উদাহরণ আছে। যেমন একটা জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় মসজিদ কমিটির উদ্যোগে মসজিদের ওজুখানায় সাবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল আর মুসল্লিরা ওজু করার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসন থেকে মাইকিং করে, কড়াকড়ি আরোপ করে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করা হয়েছে কিংবা বেসরকারি নানা উন্নয়ন সংস্থা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে। বর্তমানে আবার যখন করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা কড়া নাড়ছে, ভয় রয়েছে দ্বিতীয় দফায় দেশময় করোনা বিস্তারের (যদিওবা প্রথম ধাক্কা শেষ হয়েছে কিনা, তার সঠিক হদিস নেই), সেখানে মানুষকে অন্তত প্রধান তিনটি করোনা প্রতিরোধমূলক অভ্যাসের ভেতর নিয়ে আসতে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এখানে মানুষকে নতুন বাস্তবতায় অভ্যস্ত হতে উৎসাহিত করাই এখন বড় কাজ। তথ্যকে সুপ্রসারিত করা এবং জনসচেতনতামূলক কাজে মনোযোগী হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলে বিস্তৃত ব্র্যাকের মতো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বাস করি।
হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যকর পয়োনিষ্কাশন নিয়ে ব্র্যাকসহ উন্নয়ন সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে কাজ করে এলেও এই করোনা সময়ে ডায়রিয়ার মতো নানা রোগবালাই থেকে রক্ষার পাশাপাশি করোনা বিস্তার রোধে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নতুন এক মাত্রা পায়। করোনা মোকাবেলায় সাবান ব্যবহার করে হাত ধোয়ার গুরুত্ব উপস্থাপন এবং এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণে সামাজিক পর্যায়ে হাত ধোয়ার জন্য ব্যবস্থা করার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্র্যাক এরই মধ্যে কাজ করছে। একটা সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমন্বিত প্রচেষ্টায় করোনাকালের নতুন অভ্যাসগুলো মানুষের মাঝে তৈরি হওয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হোক সব প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে। আর সেই সঙ্গে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস, ১৫ অক্টোবর ২০২০ সফল হোক।
[কৃতজ্ঞতায়: ড. শাহাদুজ্জামান, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়
ইউনাইটেড কিংডম]
তানভীর শাতিল: উন্নয়ন গবেষক, বিআইজিডি
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ