সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী নড়বড়ে করছে কারা?

গরিব ও সুবিধাবঞ্চিতদের সম্ভাব্য সব সহায়তার আওতায় আনাই হলো সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতা-পিতাহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার রাখা হয়েছে।

গরিব ও সুবিধাবঞ্চিতদের সম্ভাব্য সব সহায়তার আওতায় আনাই হলো সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতা-পিতাহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার রাখা হয়েছে। 

জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যসহায়তা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি ও নগদ অর্থসহায়তা দেয়া হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং মোট জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব কর্মসূচির জন্য মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বা ৫ শতাংশ বেশি। তবে আগের অর্থবছরের মোট জিডিপি (২ দশমিক ৫৫ শতাংশ) থেকে বরাদ্দ কমেছে।

বর্তমানে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কভিড, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জনগণের জীবনযাপন কষ্টকর হচ্ছে। সরকার টিসিবির মাধ্যমে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা ও রেশন কার্ডের ব্যবস্থা চালু করেছে। তাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা কিছুটা হলেও হাঁপ ছাড়ছে। 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছেন ১ কোটি ৮ লাখ ২১ হাজার ৪২ জন। বয়স্ক ভাতা মাসিক ৫০০ টাকা করে ৫৭ লাখ ১ হাজার জন, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা মাসিক ৫০০ টাকা করে ২৪ লাখ ৭৫ হাজার জন, প্রতিবন্ধী ভাতা মাসিক ৮৫০ টাকা করে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার জন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর মাসিক ৬০০ টাকা করে ২ হাজার ৬০০ জন, বেদে জনগোষ্ঠীর মাসিক ৫০০ টাকা করে ৫ হাজার ৬৬ জন এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাসিক ৫০০ টাকা হারে ৪৫ হাজার ২৫০ জন ভাতার টাকা পাচ্ছেন। এছাড়া ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ৪০ হাজার রোগীকে বছরে একাকলীন ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ৬০ হাজার জনকে বছরে এককালীন ৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হচ্ছে।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় দারিদ্র্য কমানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২-এর তথ্যানুযায়ী, দারিদ্র্যের হার এখন ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে বলা হচ্ছে, দেশে অতি দারিদ্র্যের হারও কমেছে। দেশে অতি দারিদ্র্যের হার এখন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে সমস্যা হলো সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বরাদ্দকৃত অর্থ বা সামগ্রী যথাযথ বিতরণ হয় না। যাদের এ বেষ্টনীর আওতায় আসার কথা তাদের অনেকেই বাদ পড়েন। আবার যাদের আসার কথা নয়, তারা অনেকেই এর আওতায় আসেন। এজন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সবচেয়ে দায়ী। 

সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপে বয়স্ক ভাতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। মাসিক ৫০০ টাকার বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে একেকজন সুবিধাভোগীকে গড়ে ২ হাজার ৬৫৩ টাকা করে ঘুস দিতে হয়। সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা কার্ড করতে গিয়ে একজন উপকারভোগীকে ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুস দিতে হয়েছে। ঘুস নিয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও সরকারের কর্মকর্তারা। জরিপে দেশের ২৯টি উপজেলার ৪৮৬ জন বয়স্ক ও বিধবা ভাতার সুবিধাভোগীর মত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০৮ জন বয়স্ক, ২০০ জন বিধবা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ১৭৮ জন অভিভাবক। সিপিডির তথ্যে, ৩৩ লাখ বয়স্ক ও ২৫ লাখ বিধবা ভাতা পাওয়ার উপযোগী হওয়া সত্ত্বেও পাচ্ছেন না। অন্যদিকে প্রায় ৩০ শতাংশ বয়স্ক ও ৩৩ শতাংশ বিধবা ভাতা পাওয়ার অযোগ্য হয়েও নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। এমন অযোগ্যদের পেছনে বছরে দেড় হাজার কোটি টাকা অপব্যয় হচ্ছে। এ টাকা দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ প্রকৃত সুবিধাভোগীকে ভাতার আওতায় আনা সম্ভব। জরিপে দেখা গেছে, ভাতাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩৭ শতাংশের কোনো এমএফএস (মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবা) নেই। এছাড়া ৫-৩০ শতাংশ প্রাথমিকের শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে উপবৃত্তি পায় না। এতে বোঝাই যায়, এ প্রকল্পে যথাযথ নজরদারি নেই।

এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ছে। এ খাতে সম্ভাব্য বরাদ্দ ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। সরকার আগামী অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা এবং বিধবা ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫০ টাকা করার কথা ভাবছে। পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে (সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ৬ মে, ২০২৩)। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিঃসন্দেহে এটি ভালো পদক্ষেপ। তবে সরকারের দরিদ্রবান্ধব এ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যেভাবে অনিয়ম গেড়ে বসেছে, তা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না। গরিবের ভাতা বণ্টনে যারা কারসাজি করছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। নিয়ম অনুযায়ী যারা ভাতা পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে দরিদ্রদের তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিচয় দিতে হবে। তালিকাভুক্ত অনুপযুক্তদের নাম বাদ দিতে হবে। নতুন অর্থবছরে তালিকায় যোগ্যদেরই স্থান দিতে হবে।

দেশে সঠিকভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচনে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সত্যিকারের উপকারভোগী চিহ্নিত করতে অনেক দেশই ‘‌প্রক্সি মিনস টেস্ট’ নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ পদ্ধতির আওতায় পরিবারের সদস্যদের অবস্থা, আবাসনের মান, পরিষেবাগত সুবিধা ও রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত, স্থায়ী সম্পদ ও স্থানীয় সুবিধা বিবেচনা করা হয়। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। যেমন কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহনকর্মী, দোকান বা কারখানাকর্মী, রিকশাচালকের পরিবারের আয় কম। তাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যাও বেশি থাকে। আবার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীপ্রধান পরিবারের দরিদ্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে পাকা বা আধাপাকা বাড়ি, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, গবাদিপশু, দামি আসবাব, ফ্রিজ ও মোটরসাইকেল রয়েছে সেসব পরিবারকে দরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। দেশে সব অঞ্চলে দারিদ্র্য এক রকম নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে দ্রুত নগরায়ণ ছড়িয়ে পড়ার ফলে সেসব এলাকায় দরিদ্র লোকের সংখ্যা কমছে। সে অনুপাতে রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেশি। 

তারপর দেশে আবহাওয়ার ব্যাপার আছে। হঠাৎ করে বন্যা এসে কৃষকের ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোথাও কোথাও খরা দেখা যায়। উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লে সেখানে সামাজিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। জমিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ার কারণে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারেন না। বর্তমানে কৃষকের সারের দামও বেড়েছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি হবে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখনো খাদ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষকদের দারিদ্র্যের প্রান্তিক সীমা থেকে উঠাতে হবে। এর আগে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনার অর্থ বিতরণে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তেমনিভাবে অন্যান্য সুবিধা বিতরণেও এ রকম ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার সংস্থা—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন প্রকৃত উপকারভাগী বাছাইয়ে যথেষ্ট সতর্ক হতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় এনজিওগুলোকেও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। আমাদের যতটুকু সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে, এটির যথাযথ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার হোক। ‌এর অনিয়মে সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে, সেটিই কাম্য।

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও