অর্থবছর

শুষ্ক মৌসুমে নতুন অর্থবছর নির্ধারণ করা হোক

আদিকালেও রাজকোষের নিশ্চয়ই একটা বার্ষিক হিসাব থাকত। রাজকোষের আয়ের প্রধান উৎসই ছিল ভূমি রাজস্ব।

প্রাচীনকালে ভারতে কোনো এক সময় অগ্রহায়ণ মাসে নতুন বছর শুরু হতো। এটাকেই বলে সৌরবর্ষ। অগ্রহায়ণ মানেই নবান্ন, নতুন ফসলের উৎসব। এ সময়ে রাজাকে খাজনা দিতে তেমন বিঘ্ন হতো না। এরপর মুসলিম শাসনামলে শাসকের সাল গণনাতেও এল পরিবর্তন। সৌর সনের বদলে চালু হলো চান্দ্র পঞ্জিকা বা হিজরি সন। ফলে প্রতি বছর খাজনা দেয়ার সময় বদলাতে থাকে। ৩৬৫ দিনের সৌর পঞ্জিকার তুলনায় ৩৫৪ দিনের চান্দ্র পঞ্জিকায় প্রতি বছরই গোটা বছরের দৈর্ঘ্য ১১ দিন কমে।

মোগল শাসনামলে সিংহাসনে আরোহণের ২৮ বছর পর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর চালু করেন তারিখ-ই-ইলাহি নামে নতুন অর্থবছর। এটি কার্যকর হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। নতুন এ বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস বৈশাখ। আর চৈত্র মাসের শেষ তারিখ নির্ধারিত হয় খাজনা পরিশোধের শেষ দিন হিসেবে। অনেকের অভিমত এ সনটিই বাংলায় নাম পেল বাংলা সন। হিজরি পঞ্জিকার বদলে বাংলায়ও হিসাবপাতি শুরু হলো বাংলা পঞ্জিকানুসারে। ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে,/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিবো কিসে!/ ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কি?/ আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।’ এই লোকছড়া সব বাঙালিই শৈশবে শুনে অভ্যস্ত। নবাব আলীবর্দি খান ও তার সময়ের আগে বর্গীদের উৎপাতে সর্বস্বান্ত হতো মানুষ। আবার জমির খাজনা পরিশোধ করতে হবে চৈত্রের মধ্যে। মানুষের তাই অপেক্ষা চৈতালি ফসলের, রাজার খাজনা যাতে মেটে। চৈতালি ফসলের একটি হলো রসুন।

এরপর ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন। কলকাতা, চেন্নাই আর মুম্বাইকে কেন্দ্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা শুরু হয়। এই তিন অঞ্চলে তারা তিন প্রেসিডেন্সি গড়ে তোলে। সেগুলো হলো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সি। ১৬৮৪ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি, ১৬৮৭ সালে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ও ১৬৯৯ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গঠিত হয় (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি কার্যকর হয় ১৭০০ সালে)। তিন প্রেসিডেন্সির জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন ও ব্যবসা ক্ষমতা নির্ধারিত ছিল। এ তিন প্রেসিডেন্সিতে তিন ধরনের সময়কে অর্থবছর বিবেচনা করে আর্থিক হিসাব হতো। ১৮৩৩ সালে তিন প্রেসিডেন্সিকে একীভূত করে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির গভর্নর জেনারেলকে ভারতের গভর্নর জেনারেল করা হয়। ১৮৬৭ সাল থেকে ব্রিটিশ ভারতে সরকারি আর্থিক বছর শুরু হলো ১ এপ্রিল হতে পরের বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এটি যুক্তরাজ্যের সরকারি অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালু করা হয়। তারও অনেক আগে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন কার্যকর হওয়ার সময় ভূমি রাজস্ব পরিশোধের জন্য সূর্যাস্ত আইন করা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে জমিদাররা ভূমি রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমিদারি বাজেয়াপ্ত হয়ে নিলামে উঠত।

পৃথিবীর একেক দেশে একেক হিসাবে অর্থবছর গণনা করা হয়। চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়াতে পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর; ভারত, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডায় পহেলা এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ; বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভুটানে পহেলা জুলাই থেকে ৩০ জুন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তা (ফেডারেল সরকার) পহেলা অক্টোবর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানেও ব্রিটিশ শাসনের ধারাবাহিকতায় পহেলা এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর গণনা করার নিয়ম ছিল।

১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান যথারীতি পহেলা এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অব্যাহত রাখে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে আসীন হন সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। গদিতে বসেই তিনি শুরু করলেন নানা পরিবর্তন। চালু করলেন অদ্ভুতুড়ে মৌলিক গণতন্ত্র। বাতিল করলেন সদ্যোজাত সংবিধান, পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশকে একত্র করলেন। মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, দশমিক মুদ্রা ব্যবস্থা, স্কুল শিক্ষাবর্ষ জুলাই-জুন (যদিও একবারের পরেই জানুয়ারি-ডিসেম্বরে প্রত্যাবর্তন) সর্বোপরি জুলাই-জুনে অর্থবছর পরিবর্তন।

মোহাম্মদ আইয়ুব খান পাকিস্তানের সর্বময় শাসক হলেন ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে। চলমান অর্থবছর শেষ হওয়ার কথা ১৯৫৯ সালের ৩১ মার্চ। উনার পরিবর্তনের প্রথম ধাক্কাটা লাগল অর্থবছরেরই ওপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারার যে ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে তখনো শেষ হয়নি। ‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা’ নীতিতে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার দায় চাপল নৈর্ব্যক্তিক অর্থবছরের ঘাড়ে। ১২ মাসের জায়গায় ১৫ মাসে শেষ হলো ১৯৫৮-৫৯ অর্থবছর। ১৯৫৯-৬০ অর্থবছর শুরু হলো পহেলা জুলাইয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশেও এরই ধারাবাহিকতায় অর্থবছর গণনা করা হচ্ছে।

অর্থবছর কোন মাস থেকে শুরু হলো না হলো তাতে কি কোনো উনিশ বিশ হতে পারে? উত্তর হচ্ছে অবশ্যই পারে। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে বর্ষপঞ্জি তাতে খুব চমৎকারভাবে জুলাইয়ে প্রকল্প বাছাই আর আগস্টে টেন্ডার—এমনি নানা ধাপ পেরিয়ে জুনে চূড়ান্ত বিল পরিশোধের ছক করা আছে। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষাকাল থাকে। বর্ষার পানি থাকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বছর মেয়াদি প্রকল্প বাছাইয়ের জন্য জুলাই মাসের থৈ থৈ পানিতে কোনো প্রকল্পপূর্ব বাস্তব মাপ নেয়া সম্ভব হয় না। কার্যত প্রকল্প চূড়ান্ত করতে করতে অক্টোবর চলে আসে। এরপর টেন্ডার, ঠিকাদার বাছাই, কার্যাদেশ দেয়া প্রভৃতি সারতে সারতে ডিসেম্বর চলে আসে। অথচ জুলাই বর্ষাবিদুর না হয়ে শুষ্ক হলে অনায়াসে পঞ্জিকা অনুসরণ করা যেত।

এখন কাজ বিলম্বে শুরু হওয়ায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয় না। কখনো কখনো অর্থছাড়ে অধিক বিলম্বের জন্য কাজ শুরুই হয় অর্থবছরের শেষ লগ্নে। যে কারণে আমরা প্রায়ই দেখি খোদ ঢাকা শহরে জুনের শেষদিকে, ঘোর বর্ষায় রাস্তা কাটাকাটির কাজ। জুনের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় তার জের চলে যায় পরের অর্থবছরে। তাতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে। কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ জুনে কাজ শেষ না হলেও দক্ষতা দেখানোর অভিপ্রায়ে জুনের মধ্যেই বিলের টাকা তুলে নিজ জিম্মায় রাখেন, যা স্পষ্টত দুর্নীতি।

অর্থবছর শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে পহেলা এপ্রিল বা পহেলা বৈশাখে শুরু হলে বর্ষা আসার আগেই বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বাছাই ও প্রকল্পপূর্ব বাস্তব মাপ নেয়া সহজসাধ্য হতে পারে। এরপর বর্ষায় এস্টিমেট, টেন্ডার, ঠিকাদার বাছাই শেষ করতে পারলে অনায়াসে অক্টোবরে কাজ শুরু করা সম্ভব। ফলে টানা শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে পারে। এতে বর্ষায় রাস্তা কাটা, রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতি অপচয়মূলক কাজ বন্ধ হবে। তাই দেশের আবহাওয়াকে বিবেচনায় এনে অর্থবছর পহেলা এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ কিংবা বৈশাখের প্রথম দিন থেকে ৩০ চৈত্রতে পুনর্নির্ধারিত হোক।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও