বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সহিংসতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। এসব একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসছে, মানুষ কি আগের তুলনায় বেশি অস্থির, অধৈর্য ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে? অবশ্যই এর পেছনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত নানা কারণ রয়েছে। তবে গত দুই দশকের অনেক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উপরোক্ত কারণগুলোর পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন, আবেগ এবং সামাজিক আচরণের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশ দূষণ বলতে শুধু ধোঁয়া বা ধুলাবালিকে বোঝায় না। বাস্তবে এটি একটি বহু স্তরবিশিষ্ট সংকট এবং এটি এমন একটি অবস্থা, যখন মানুষের কর্মকাণ্ড বা প্রাকৃতিক কারণে বায়ু, পানি, মাটি, শব্দ, আলো, তাপমাত্রা বা পরিবেশের অন্যান্য উপাদানে ক্ষতিকর পদার্থ বা জীবাণু এমন মাত্রায় যুক্ত হয় যে তা জীবজগৎ, বাস্তুতন্ত্র এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এসব দূষকের মধ্যে রয়েছে ভারী ধাতু, যেমন—সিসা, ক্যাডমিয়াম, মার্কারি, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, সূক্ষ্ম বায়ুবাহিত কণা, মাইক্রোপ্লাস্টিক, পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্টেন্স, পেস্টিসাইড রেসিডিউ, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ ইত্যাদি।
আধুনিক গবেষণা বলছে, এ দূষকগুলোর অনেকেই মানবদেহে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া, ঘুম, আবেগ, সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
বায়ুদূষণ: মস্তিষ্কের নীরব শত্রু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বায়ুদূষণকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বায়ুদূষণের কারণে লাখ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে এবং অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয়।
আইকিউ এয়ারের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। বায়ুদূষণের সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাতাসে থাকা অতি ক্ষুদ্র ধূলিকণা (পিএম ২.৫ ও পিএম ১০) নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং শিল্প ও যানবাহন থেকে নির্গত সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু। এসব সূক্ষ্ম কণা ফুসফুস অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখান থেকে মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে কোষের প্রদাহ ও ক্ষতি করে।
ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পিএম ২.৫ এবং নাইট্রাস অক্সাইডের সংস্পর্শ হতাশা, উদ্বেগ এবং মানসিক সুস্থতার অবনতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের সংস্পর্শ বুদ্ধিবিকাশ, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫-এর উচ্চ মাত্রা বুদ্ধিমত্তা কমিয়ে দেয়, শেখার সক্ষমতা কমায় এবং সিজোফ্রেনিয়া, হতাশা, আতঙ্কজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
পানি ও মাটি দূষণ: বিষাক্ত জীবনের ছাপ
অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু, কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী, ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, আর্সেনিক এবং ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পরিবেশে সহজে ভাঙে না। ফলে এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে মাটি ও পানিতে থেকে মানবদেহে জমা হতে পারে।
সিসা শরীরে প্রবেশ করলে এটি ক্যালসিয়ামের জৈব রাসায়নিক পথকে ব্যাহত করে এবং স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইএআরসির মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে সিসার সংস্পর্শ আইকিউ কমে, মনোযোগের ঘাটতি, শেখার সমস্যা এবং আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সিসা প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এবং স্নায়বিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রথম শ্রেণীর ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান ক্যাডমিয়াম কিডনি, হাড় ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির পাশাপাশি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে। হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামও একটি পরিচিত বিষাক্ত ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান, যা দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম আলোচিত পরিবেশগত দূষক। পানীয় জল, সামুদ্রিক খাদ্য, লবণ, ফলমূল এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও মানুষের দেহে প্রতিনিয়ত মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ বিপাকীয় সমস্যা, স্নায়বিক পরিবর্তন, হরমোনাল গ্রন্থির কার্যকারিতা, হৃদরোগ এবং কিডনির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও মানবদেহে এর কারণগত সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
পার অ্যান্ড পলিফ্লুরোলকিল সাবস্টেন্স (পিএফএএস) বা তথাকথিত ‘ফরেভার কেমিক্যালস’ পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। এগুলো খাদ্য মোড়ক, প্রসাধনী, অগ্নিনির্বাপক ফোম, প্লাস্টিক, জলরোধী কাপড় এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। একইভাবে আধুনিক কৃষিতে ব্যবহৃত কিছু কীটনাশক হরমোনাল গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি কীটনাশক সংস্পর্শ উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যদিও রাসায়নিকভেদে ঝুঁকির মাত্রা ভিন্ন।
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ বৃদ্ধি করছে, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের পাশাপাশি পরিবেশগত অনুজীবের ভারসাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া পরিবেশগত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মানবদেহের অন্ত্রের উপকারী অনুজীবকে পরিবর্তন করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং মেজাজকে প্রভাবিত করে।
ই-ওয়েস্ট ডিজিটাল যুগের মারাত্মক অভিশাপ। প্রতি বছর বিশ্বে কোটি কোটি টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এতে থাকে ভারী ধাতু, ডক্সিন, পিসিবি ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে, অনিরাপদ ই-ওয়েস্ট পুনর্ব্যবহারকারী এলাকার মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে হরমোনের পরিবর্তন, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বিকাশগত ঝুঁকির সম্ভাবনা বেশি।
শব্দদূষণ: নীরব বিষাদ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শব্দদূষণকে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে যানজট, অবাধ হর্ন, নির্মাণকাজ এবং শিল্প-কারখানার শব্দ অনেক মানুষের জন্য প্রতিদিনের বাস্তবতা। দিনের পর দিন এ শব্দের মধ্যে বসবাস করলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন (বিশেষ করে কর্টিসল) বেড়ে যায় যা মানুষকে আরো অস্থির, ক্লান্ত ও খিটখিটে করে তুলতে পারে এবং ঘুমের ব্যাঘাত, বিরক্তি, মনোযোগের ঘাটতি, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইউনিসেফের মতে, অতিরিক্ত শব্দ শিশুদের ঘুম, শেখার ক্ষমতা, আবেগীয় বিকাশ এবং সামাজিক আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তত ২০ শতাংশ নগরবাসী যানবাহনের শব্দের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পশ্চিম ইউরোপে শব্দদূষণের কারণে প্রতি বছর ১৬ লাখের বেশি সুস্থ জীবন নষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ইউরোপে শব্দ দূষণের ফলে বছরে ৬০ হাজারের বেশি বাচ্চার পড়ার সমস্যা, ৬৩ হাজার জনের আচরণগত সমস্যা এবং ২ লাখ ৭২ হাজার জনের স্থুলতার ঘটনা ঘটে।
আলো দূষণ: হারিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকার
আধুনিক নগর সভ্যতার আরেকটি বর্ধনশীল সমস্যা হলো আলো দূষণ বা রাতের কৃত্রিম আলো। বাংলাদেশের শহরগুলোতে রাতভর অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো, যেমন—আলোকিত সড়ক, বাণিজ্যিক বিলবোর্ড, আবাসিক এলাকার অতিরিক্ত আলোকসজ্জা এবং মোবাইল, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো চোখের রেটিনা হয়ে মস্তিষ্কের জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণকারী অংশে সংকেত পাঠায়, যা ঘুমের জন্য অপরিহার্য মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বিলম্বিত বা কমিয়ে দেয়। এর ফলে ঘুমাতে দেরি হওয়া, ঘুমের মান কমে যাওয়া, পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগে ঘাটতি, স্মৃতিশক্তির সাময়িক দুর্বলতা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্থুলতা, হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইউনিসেফের মতে, পর্যাপ্ত ঘুম শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক আচরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুলগেরিয়ায় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাতের কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শে ঘুমের গুণমান হ্রাস পায়, যা উদ্বেগ ও হতাশার লক্ষণ বাড়ায়।
তাপীয় দূষণ: নগর তাপদ্বীপ
জলবায়ু পরিবর্তন, কংক্রিটনির্ভর নগরায়ণ এবং সবুজের অভাবে শহরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রা শুধু হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি নয়; এটি ঘুমের মান কমায়, শারীরিক ক্লান্তি বাড়ায় এবং মানসিক চাপও বাড়াতে পারে। তাপীয় দূষণ নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সামাজিক চাপ বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে গবেষণা চলমান। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ এলাকায় বসবাসকারীদের তুলনায় কম সবুজ এলাকার বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও হতাশার হার ২০ শতাংশ বেশি; আর সবুজ স্থান থেকে প্রতি ৩৬০ মিটার দূরে সরে গেলে মানসিক স্বাস্থ্য রোগের ঝুঁকি ৫-৭ শতাংশ বেড়ে যায়।
বর্তমানে আধুনিক গবেষণায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সামাজিক আচরণের ওপর পরিবেশ দূষণের জিনগত প্রভাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, দূষক এপিজেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে, জিনের অভিব্যক্তিকে বদলে দিতে পারে। এমনকি অন্ত্রের অনুজীবের পরিবর্তন ঘটিয়ে স্নায়বিক প্রদাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর অনেক প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ গবেষণার ওপর নির্ভর করছে।
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত দেশগুলোর সফল উদ্যোগ ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ পরিবেশ দূষণকে শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। তাই তারা আইন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে সমন্বিত করে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন করেছে। উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ হলো, যুক্তরাজ্য আল্ট্রা লো এমিশন জোন (ইউএলইজি) চালুর মাধ্যমে শব্দ ও বায়ুদূষণকারী যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ করে নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন কমিয়েছে।
বায়ুদুষণ প্রতিরোধে চীন সরকার ২০১৩ সালে কঠোরভাবে ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন প্ল্যান’ চালু করে, যার আওতায় ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে মাত্র ১০ বছরে চীনে ক্ষতিকর পিএম ২.৫ কণার উপস্থিতি গড়ে ৬০ শতাংশ কমে যায় যা সে দেশের নাগরিকদের গড় আয়ু প্রায় ২ দশমিক ২ বছর বেড়েছে।
সিঙ্গাপুর এআই, আইওটি, বিগ ডেটা, স্যাটেলাইট ও স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করে বায়ু, পানি, শব্দ ও জলবায়ুর তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করছে। নেদারল্যান্ডস পরিবেশবান্ধব পরিবহন, স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর সবুজায়নের মাধ্যমে টেকসই নগর উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সুইডেন সার্কুলার ইকোনমি ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন মডেলের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশের বেশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করছে। জার্মানিতে এক্সটেনডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি (ইপিআর) নীতির আওতায় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়ায় প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বেড়েছে। জাপান কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম (সিইএমএস), এআই-ভিত্তিক নির্গমন বিশ্লেষণ ও ভূমিকম্পের পর রাসায়নিক লিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পদূষণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করছে। দক্ষিণ কোরিয়া স্মার্ট রিভার ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নদীর পানি ও ভারী ধাতুর মান রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করছে। ফিনল্যান্ড এআই ভিত্তিক নয়েজ ম্যাপিং করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফ্রান্স আলো দূষণ আইন প্রয়োগ করে রাতের অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা সীমিত করেছে। ২০০২ সালে চেক প্রজাতন্ত্র প্রথম জাতীয় পর্যাযয়ে ‘আলো দূষণ প্রতিরোধ আইন পাস করে। ২০১৩ সালে ইতালি আলোক আইন চালু করে, যা দেশকে পাঁচটি অন্ধকার রাতের সংরক্ষণ অঞ্চলে বিভক্ত করে। ২০২৩ সালের গ্রানাডা ম্যানিফেস্টো, আলোকে দূষণ হিসেবে ইউরোপীয় পরিবেশ আইনের অধীনে আনার পক্ষে একটি মাইলফলক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল এয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে এবং কানাডা হিউম্যান বায়োমনিটরিং প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভারী ধাতু ও পিএফএএসের মতো দূষকের মাত্রা নির্ণয় করে স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বর্তমান সরকার প্রধান অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকার বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে এআইভিত্তিক মনিটরিং, অপ্রয়োজনীয় হর্ন শনাক্তকরণ, দূষণের উৎস নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগের প্রস্তাব দেয়া হয়। এছাড়া ন্যাশনাল এআই পলিসি ২০২৬-৩০-এ (খসড়া) পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। শিল্প-কারখানায় এআই-সমর্থিত সেন্সর ব্যবহার করে বায়ু, শব্দ ও নির্গমন রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করলে পরিবেশ অধিদপ্তর দ্রুত দূষণ শনাক্ত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক অস্থিরতা মোকাবেলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রস্তাবনা
দূষণ প্রতিরোধ নিঃসন্দেহে দূষণের ফলে সৃষ্ট রোগ চিকিৎসার চেয়ে অনেক সস্তা, কার্যকর এবং টেকসই। কেননা, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশগত ঝুঁকি আরো জটিল হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের সমাধান হতে হবে ডেটাচালিত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এবং রিয়েল-টাইম।
পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক অস্থিরতা মোকাবেলায় বর্তমান নীতি, অভ্যন্তরীন সম্পদ ব্যবহার, উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত নীতির আলোকে যেসব পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে তা হলো এআইভিত্তিক জাতীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, রিয়েল-টাইম এয়ার কোয়ালিটি ও নয়েজ মনিটরিং নেটওয়ার্ক, কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম (সিইএমএস), ইটিপি পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট রিভার মনিটরিং, স্যাটেলাইট ও ড্রোনভিত্তিক দূষণ শনাক্তকরণ, ডার্ক স্কাই পলিসি, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের জন্য দূষণ সতর্কতা মোবাইল অ্যাপ চালু করা প্রয়োজন।
দেশের মানুষের ওপর দূষকের প্রকৃত প্রভাব ও ক্ষতি নিরূপণের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে জাতীয় হিউম্যান বায়োমনিটরিং প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশ সরকারের আইনগত রেস্পন্সিবল রাসায়নিক পরিমাপে রেফারেন্স গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআরআইসিএম) মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠা সমন্বয়ে কেমিক্যাল টক্সিসিটি অ্যান্ড রিস্ক এসেসমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন। এটি পরিবেশগত এক্সপোজার মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণ, নীতিনির্ধারণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী করবে।
একবিংশ শতাব্দীর পরিবেশ দূষণ কেবল প্রকৃতির সংকট নয়; এটি মানুষের মস্তিষ্ক, হরমোন, আচরণ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। যদিও বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পরিবেশ দূষণকে সামাজিক অস্থিরতার একমাত্র কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না, তবে ক্রমবর্ধমান গবেষণা ইঙ্গিত করছে যে বায়ু, পানি, মাটি, শব্দ, আলো ও রাসায়নিক দূষণ মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণের সঙ্গে মিলিত হয়ে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সময় এসেছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট নগর পরিকল্পনা, জাতীয় বায়োমনিটরিং এবং প্ল্যানেটারি হেলথ-ভিত্তিক নীতিমালা গ্রহণের। আজ যে বিনিয়োগ পরিবেশ সুরক্ষায় করা হবে, তা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ব্যয় কমাবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও টেকসই সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
মাহমুদুল হাসান রাজু: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস’ (বিআরআইসিএম) এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান: অনুজীববিজ্ঞানী ও জৈব-রসায়নবিদ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনে স্টাফ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত