শিক্ষার প্রসার ছিল বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানদের রেনেসাঁর উৎস। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মুসলমান পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার শুরু হলেও নারী শিক্ষার বিস্তারে একটি বড় বাধা ছিল কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস। সেসব প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে নবাব ফয়জুন্নেসা ও বেগম রোকেয়ার নেতৃত্বে মুসলমান মেয়েরা লেখাপড়ায় অংশগ্রহণ শুরু করেন। পাশাপাশি অংশ নেন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। পরের প্রজন্মের শামসুন্নাহার মাহমুদ ও খোদেজা খাতুনের মতো শিক্ষাবিদরা বাংলার মুসলমান নারীদের জাগরণের পথটিকে আরেকটি ধাপ এগিয়ে দেন। তৃতীয় প্রজন্মের নারীদের কেউ কেউ সে পথটাকে আরো বেশি মসৃণ করতে অগ্রগামী হন। তারা কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি বাঙালি মুসলমান নারীদের শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে যেমন কাজ শুরু করেন, তেমনি ব্রতী হন সমাজসেবায়ও। তবে বেশির ভাগ সমাজসেবীই পরবর্তীকালে রাজনীতিতে যোগ দেন ও সমাজসেবাকে তারা রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তরিত করেন। এ প্রজন্মের যে ক’জন মুষ্টিমেয় নারী রাজনীতির প্রলোভন সত্ত্বেও তা থেকে অনেক দূরে থেকে শুধু সমাজসেবা করে গিয়েছেন তাদের মধ্যে অনন্য হয়ে আছেন জাহান আরা রাহমান। তিনি নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে কাজ করেছেন, অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন ঢাকার ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের প্রতিষ্ঠালগ্নে। গুণী এ মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন আজকের দিনে, ১৯২২ সালে কুমিল্লা শহরে নানার বাড়িতে। আজ ২৭ আগস্ট তার জন্মের শতবর্ষপূর্তিতে তাকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
আজ থেকে প্রায় শতবছর আগে হাতে গোনা যে ক’টি বাঙালি মুসলিম পরিবার জ্ঞান ও শিক্ষার উৎকর্ষ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল জাহান আরা রাহমানের পরিবারটি তাদের মধ্যে অন্যতম। বাবা মফিজউদ্দিন আহমদ ছিলেন বাংলা প্রদেশের সিভিল সার্ভিসের সদস্য। ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রিলিফ কমিশনারের পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মা ছালেহা খাতুন গৃহিণী, যিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুলের গণ্ডিতে পা না রাখলেও ঘরে বসেই বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করেন। মায়ের মনের কোণে সুপ্ত ইচ্ছা নিজের জীবনে যা সম্ভব হয়নি তা সন্তানকে দিয়েই পূরণ করবেন। তাই নিজের প্রথম সন্তান মেয়ে বলে তাকে ঘরে বসিয়ে না রেখে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। সরকারি আমলার কন্যা হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে জাহান আরা রাহমানকে। এক জায়গায় থিতু হয়ে পড়ার সুযোগ তিনি পাননি, এমনকি অনেক জেলা শহরে মেয়েদের হাইস্কুল ছিল না। তখন স্কুলের বদলে প্রাইভেট পড়েছেন তিনি। তবে কোনো কিছুই তার উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারেনি।
যেমন ১৯৩৮ সালে তার বাবা দার্জিলিং থেকে বদলি হয়ে এমন এক স্থানে পোস্টিং পেলেন যেখানে মেয়েদের কোনো স্কুল ছিল না। তিনি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। সামনে প্রবেশিকা পরীক্ষা। এজন্য কোনো স্কুলের ছাত্রী হওয়া জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে বাবা-মা তাকে জলপাইগুড়ি মেয়েদের স্কুলে আবাসিক ছাত্রী হিসেবে হোস্টেলে ভর্তি করেন। সাধারণত দশম শ্রেণীতে এ স্কুলে নতুন ছাত্রী ভর্তি করা হতো না। সরকারি কর্মচারীর মেয়ে হিসেবে বিশেষ সুযোগ দিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর দেখা দেয় আরেকটি সমস্যা। তখনকার দিনে প্রত্যক ছাত্রীকে আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত বা পালি এসব ভাষা হতে একটি ভাষায় পরীক্ষা দিতে হতো। জলপাইগুড়ি স্কুলে আরবি বা ফার্সি পড়ানোর কোনো শিক্ষক ছিলেন না বলে তাকে সংস্কৃত ভাষায় পরীক্ষা দিতে হয়। ‘লেডি ব্রেবোর্নে কেন পড়তে গেলাম’ শীর্ষক তার লেখা নিবন্ধে এ অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহান আরা রাহমান লিখেছেন, ‘আমাকে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে আরবি, ফারসির বদলে সংস্কৃত নিতে হলো। ওইসব সাবজেক্টের জন্য তাদের কোনো শিক্ষক ছিলেন না। এ চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করলাম। ভাবতে আজও অবাক লাগে কী করে এই কম সময়ে নতুন সাবজেক্ট নিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য তৈরি হলাম।’ ব্রেবোর্ন বিচিত্রায় তিনি আরো লিখেছেন, অসুবিধা সত্তেও প্রধান শিক্ষিকা সুনীতিবালা চন্দ্রের বিশেষ তত্ত্বাবধানে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯৩৯ সালে প্রথম বিভাগে পাস করেন এবং প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি পান।
১৯৩৯ সালে কলকাতায় মুসলমান ছাত্রীদের জন্য লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত কলেজটি উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দেয় মুসলমান মেয়েদের জন্য। কলেজে মুসলমান ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল স্থাপন করা হয়। জাহান আরা রাহমানের বাবা-মায়ের ইচ্ছা তাদের মেয়েও এ কলেজে পড়বে।
কেননা একই ক্যাম্পাসে হোস্টেল ও কলেজ অবস্থিত হওয়ায় মুসলমান ছাত্রীদের পক্ষে পর্দা মেনে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে এখানে। তাই কলেজটি ‘পর্দা কলেজ’ নামেও পরিচিতি পায়। কলেজের মান উন্নত করার জন্য বিলাত থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে মিস গ্রোস এবং কয়েকজন শিক্ষিকা নিয়ে আসা হয়েছিল। যেসব ভারতীয় নারীকে অধ্যাপিকা হিসেবে নিয়োগ করা হয় তারাও ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের। এখানে তিনি চার বছর পড়েছেন। আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তবে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতার ট্রপিক্যাল মেডিকেল স্কুলের ডাক্তার সন্দ্বীপের বাসিন্দা ড. মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দেশ বিভাগের পর রহমান পরিবার ঢাকায় চলে আসে।
পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় ফিরে বেগম জাহান আরা রাহমান বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত হন। পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী ভিকারুন নিসা নূনের নেতৃত্বে তিনি ঢাকায় ভিকারুন নিসা নূন স্কুল স্থাপনে বিশেষ অবদান রাখেন। বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের স্কুলে পাঠাতে রাজি করানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সম্মতি আদায় করা ও তাদের শিক্ষা গ্রহণে উত্সাহ দেয়া। পাশাপাশি পঞ্চাশের দশকে খুলনায় বড় ধরনের বন্যা হলে জাহান আরা রাহমান ঢাকা থেকে ত্রাণের বড় একটি দল নিয়ে বন্যার্তদের সাহায্যে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন, যা তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের উজ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
এছাড়া ১৯৬০-এর দশকে তিনি অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের (এপিডব্লিউএ) পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তার মেয়াদকালে পশ্চিম পাকিস্তানের মারি শহরে এপিডব্লিউএর সাধারণ সভা হয় এবং তিনি সেখানে পাকিস্তান দলের নেতৃত্ব দেন। এপিডব্লিউএ ছাড়াও ষাটের দশকেই তিনি উইমেনস ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউভিএ) সঙ্গে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এর সভাপতি নির্বাচিত হন ও লালমাটিয়ায় মেয়েদের জন্য ডব্লিউভিএ কলেজ স্থাপনে নেতৃত্ব দেন। তার ছোট বোন নার্গিস খান এ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপিকা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন এ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে ডব্লিউভিএ ঢাকার উপকণ্ঠ বাসাবোয় মেয়েদের বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।
লেখালেখি ও সম্পাদনাও যুক্ত ছিলেন জাহান আরা রাহমান। ১৯৪৭ সালে নূরজাহান বেগমের সম্পাদনায় ‘বেগম’ পত্রিকা প্রকাশিত হলে শুরু থেকেই সেখানে তার লেখা কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধ প্রকাশ হয়। বেগম পত্রিকায় তার লেখা ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৪ সালে জাহান আরা রাহমান ঢাকা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের প্রাক্তন ছাত্রীদের সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ পদে থাকাকালে তিনি ব্রেবোর্ন কলেজের ছাত্রীদের বিভিন্ন অবদান সম্পর্কে তাদের স্মৃতিকথা রচনা করাতে উদ্যোগী হন। তার নেতৃত্বে ‘ব্রেবোর্ন বিচিত্রা’ নামে একটি বই প্রকাশ হয়। তাছাড়া মিসেস আকতার ইমামের সভাপতিত্বে বর্ষীয়ান মহিলাদের জন্য হৈমন্তিকা নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। জাহান আরা রাহমান প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই এখানে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর তার স্বামী ড. মুজিবুর রহমান ১৯৯১ সালে ইন্তেকাল করেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে হামীম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। প্রায় তিন দশক ঢাকার সানবিমস স্কুলে অংকের শিক্ষক হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, ২০১৬ সালে তিনি এবং তার এক বছর আগে তার একমাত্র সন্তান নেহরীন খান ইন্তেকাল করেন। তার জামাতা আকবর আলি খান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। ছেলে ড. এহসানুর রহমান একজন হূদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ৫০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন। জাহান আরা রাহমান বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি কলকাতা সফরে গেলে ব্রেবোর্ন কলেজের প্রথম ব্যাচের একমাত্র জীবিত ছাত্রী হিসেবে তাকে বিশেষ সংবর্ধনা দেয়া হয়।
লেখক : সাংবাদিক