কিশোর গ্যাংকে কখনই শুধু পুলিশ দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কয়েকটি জায়গায় জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত ব্যবস্থা একটি বড় ক্ষেত্র। ফরেনসিক তদন্ত, ডিজিটাল এভিডেন্স এবং ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রশিক্ষিত তদন্তকারী প্রয়োজন।

খন্দকার ফারজানা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে তিনি শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে ক্রিমিনোলজি, ল অ্যান্ড জাস্টিস বিভাগে পিএইচডি করছেন। তার গবেষণায় প্রাধান্য পেয়েছে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা, আইন ও বিচার প্রক্রিয়া, দণ্ডবিজ্ঞান ও সংশোধন ব্যবস্থা, জেন্ডার ও অপরাধ ইত্যাদি। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সহিংস ঘটনা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আইনের প্রয়োগ, সামাজিকীকরণ, অপরাধপ্রবণতার কারণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এসব প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

সম্প্রতি দেশে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আলোচিত একটি ছিল অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। এক পক্ষ প্যারেন্টিংয়ের বিষয়টি তুলছে, আবার অপ্রতিমের সঙ্গে দামি ফোন থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তাহলে কি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমাজে কেউ দামি কোনো বস্তু সঙ্গে নিয়ে বের হতে পারবে না?

অপ্রতিমের ঘটনায় ভিকটিমের আচরণ এবং অপরাধীর দায়—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে। অপ্রতিমের কাছে দামি ফোন ছিল, যা হয়তো অপরাধের একটি সুযোগ বা লক্ষ্য তৈরি করেছে। কিন্তু কোনো শিশুর কাছে থাকা দামি সেই ফোনের জন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং কেন সন্তানের কাছে দামি ফোন ছিল—এ প্রশ্ন তুলে বাবা-মাকে দায়ী করা হচ্ছে, সেটিকে হত্যাকাণ্ডের নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

সর্বশেষ তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, বয়সে বড় ব্যক্তিদের সঙ্গে অসম বন্ধুত্ব এবং অপ্রতিমকে নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। ফলে শুধু দামি ফোনের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে—এমনটা বলা যায় না।

তবে কার্যকর প্যারেন্টিং বা সামাজিক অভিভাবকত্বের অভাবও অপরাধের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সন্তানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা প্যারেন্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল সচেতনতাও এখন প্যারেন্টিংয়ের বড় অংশ। একজন শিশু বা কিশোরকে শেখাতে হবে—ফোনে কী ধরনের ছবি বা ভিডিও তৈরি করা উচিত নয়, কী ধরনের কনটেন্ট শেয়ার করা নিরাপদ নয় এবং অনলাইনে কীভাবে আচরণ করতে হবে।

তবে প্যারেন্টিংকেই যদি অপরাধের মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তাহলে ভিকটিম ব্লেমিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। দামি ফোন হয়তো অপরাধের একটি সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু সেটিকে অপরাধের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজে কেউ দামি ফোন, গাড়ি বা অন্য কোনো মূল্যবান বস্তু নিয়ে বের হলে তার ওপর অপরাধ সংঘটিত হলে দায় তার নয়; মূল দায় অপরাধীর।

সমাজে নানা সহিংস ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে, বিশেষত ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা বাড়ছে। এসব সহিংস আচরণের পেছনে প্রধান কারণ কী মনে হয়?

এসব অপরাধের একক কোনো কারণ নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কমিউনিটি এবং সামগ্রিক সামাজিক কাঠামো—সব স্তর থেকেই বিষয়টিকে দেখতে হবে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নারীর চলাফেরা, পোশাক, সম্পর্ক এবং যৌনতা নিয়ে কে সিদ্ধান্ত নেবে—এমন নিয়ন্ত্রণমূলক মানসিকতা সমাজে এখনো রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সামাজিক সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরেকটি বড় বিষয় হলো সোশ্যাল ডিটারেন্স (সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা) দুর্বল। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে বিভিন্ন সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে; আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়। আবার কোনো কোনো মামলা দীর্ঘদিন চলতে থাকে এবং একপর্যায়ে ভুক্তভোগী মামলায় হাজিরা দেয়া বা মামলা চালিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক ট্যাবু ও স্টিগমার ভূমিকা রয়েছে। কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে অনেক সময় অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকেই সামাজিকভাবে কলঙ্কিত করা হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারীকে অপরাধীর সঙ্গে বিয়ে দেয়ার প্রবণতাও দেখা যায়, যা ভুক্তভোগীর জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর।

মানুষের সহিংস আচরণের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় কাজ করে। ক্রিমিনোলজির সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (সোশ্যাল লার্নিং থিওরি) অনুযায়ী, শিশু ও কিশোররা পরিবার, বন্ধু এবং সামাজিক পরিবেশ থেকে সহিংস আচরণ শিখতে পারে। পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে সহিংসতা বা সংঘাত থাকলে সন্তানও সেই আচরণ শিখতে পারে।

কিশোরদের ক্ষেত্রে সমবয়সীদের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কিশোর অনেক সময় বন্ধুদের কাছ থেকে ভালো বা খারাপ আচরণ শেখে। কোনো একটি গ্রুপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে তাকে ওই গ্রুপের আচরণ অনুসরণ করতে হবে—এমন চাপও কাজ করে। পাশাপাশি সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব এবং সমাজে অন্যায় ও বৈষম্য রয়েছে—এমন উপলব্ধিও মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে। যখন মানুষ দেখে সমাজে কোনো গোষ্ঠী ক্রমেই সম্পদশালী হচ্ছে এবং অন্যরা পিছিয়ে পড়ছে, তখন সেই বৈষম্য থেকেও সামাজিক হতাশা তৈরি হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপরাধের সুযোগ। অপরাধবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় ক্রাইম অপরচুনিটি থিওরি বলা হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, নির্জন জায়গা, দুর্বল নজরদারি, সিসিটিভির অভাব, অস্ত্র ও মাদকের সহজলভ্যতা, পুলিশের দুর্বল উপস্থিতি কিংবা পরিবার ও অভিভাবকের দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ—এসব অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সহিংস আচরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, পরিবার, বন্ধু, সামাজিক পরিবেশ, হতাশা এবং অপরাধের সুযোগ—সব বিষয়ই বিবেচনায় নিতে হবে।

কিশোর বা সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের কার্যক্রমও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন; এক্ষেত্রে আইন ও রিহ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা কোথায়?

কিশোর গ্যাংকে কখনই শুধু পুলিশ দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পুলিশ অপরাধে জড়িত কিশোরদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পারে এবং এর মাধ্যমে একটি ডিটারেন্স তৈরি করতে পারে। কিন্তু কিশোর গ্যাং নিজেই একটি সামাজিক ঘটনা ও সমস্যা। তাই শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

পরিবার, স্কুল, প্রতিবেশ ও কমিউনিটির সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ইতিবাচক সম্পর্ক যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন তারা বিকল্প পরিচয় ও নিরাপত্তা খুঁজতে পারে। অনেক বাবা-মা সময় দিতে পারেন না, সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। আবার আগে যেসব এলাকায় খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকাণ্ড ছিল, সেগুলোও অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাং অনেক সময় পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সুরক্ষার অনুভূতি তৈরি করার জায়গা হিসেবে কাজ করে। ফলে সমাজভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বাড়ছে; অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।

অন্যদিকে রিহ্যাবিলিটেশনের ক্ষেত্রেও আমাদের ধারণাগত সমস্যা রয়েছে। আমরা অনেক সময় মনে করি, কোনো শিশু অপরাধ করলে তাকে গ্রেফতার করে শিশু/কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলেই তার পুনর্বাসন হয়ে গেল। কিন্তু রিহ্যাবিলিটেশনের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকে পুনরায় সমাজে একীভূত করা, যাতে সে অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোয় পরিবারের সম্পৃক্ততা একটি বড় প্রশ্ন। একটি শিশুর পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় পরিবারকে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত করা হয় না। একইভাবে পর্যাপ্ত ও বিস্তৃত ভোকেশনাল ট্রেনিং, মেন্টরশিপ ও কাউন্সেলিংয়ের ঘাটতি রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর তাদের জন্য কার্যকর ‘আফটার কেয়ার’ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

ফলে আমাদের রিহ্যাবিলিটেশন পদ্ধতি অনেকাংশে ‘অপরাধী ধরো এবং শাস্তি দাও’ মডেলের মধ্যে আটকে আছে। অথচ রিহ্যাবিলিটেশনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশোধন, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃএকীভূত করা, যাতে অপরাধের সংস্পর্শে আসা শিশুরা পরবর্তী সময়ে সাধারণ শিশুর মতো বেড়ে উঠতে পারে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও তাদের মনোবল নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়েছে কি?

আমার মনে হয় কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে সেই উন্নতিকে এখনই বড় কোনো সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধারাবাহিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করে যেতে হবে।

২০২৫ সালে পুলিশ সংস্কার নিয়ে যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছে, সেখানে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, পুলিশের বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, মানবাধিকার মানদণ্ড, মনিটরিং এবং নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ। এমনকি ২০২৫ সালের পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে পুলিশের জবাবদিহি, মানবাধিকার মানদণ্ড, তদারকি এবং নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একইভাবে, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিএরপিসি) সংশোধনের উদ্যোগেও কিছু সুরক্ষামূলক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আইন তৈরি করা এবং সেই আইন বাস্তবে কার্যকর করা এক বিষয় নয়। তার পরও বাংলাদেশের জনগণ এখনো পুলিশের ওপর আস্থা রাখে বলে মনে করি। তবে এ আস্থা আরো শক্তিশালী হবে তখনই, যখন পুলিশ রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইন প্রয়োগ করবে, তদন্তে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে এবং পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনবে। সুতরাং পুলিশের জবাবদিহি ও আস্থা পুনর্গঠনকে এককালীন কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গ্যাপ দেখতে পাচ্ছেন, যা অপরাধপ্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারত?

আমাদের সন্তানদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের একটি গ্যাপ রয়েছে। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো ফলাফল বা ভালো সিজিপিএকে সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে দেখা হয়। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া সমীচীন নয়।

আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষাকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন ও মাদ্রাসা—বিভিন্ন ধারার মধ্যে বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক শিক্ষার কাঠামোও দুর্বল।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সৃজনশীল কাজ ও খেলাধুলাকেও অনেক সময় কম গুরুত্ব দেয়া হয়। অথচ একটি শিশু যখন কৈশোরে প্রবেশ করছে, তখন তাকে শেখানো দরকার কীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয়, কীভাবে অহিংসভাবে দ্বন্দ্ব সমাধান করতে হয় এবং কীভাবে অন্যের মতামতকে সম্মান করতে হয়।

জেন্ডার সমতা, সম্মতি, অনলাইন আচরণ, বুলিং প্রতিরোধ, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা—এসবও সামাজিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি শিশু যদি অনলাইনে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে, সেটি কেন ঝুঁকিপূর্ণ—তাও তাকে শেখাতে হবে। একইভাবে পরিবারের ভেতরের সংঘাত মোকাবেলা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও শিশুদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা। এদিকে আমাদের আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে জরুরি সংস্কারগুলো কী হতে পারে, যা অপরাধের মাত্রা কমাতে সহায়ক হতে পারে?

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কয়েকটি জায়গায় জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত ব্যবস্থা একটি বড় ক্ষেত্র। ফরেনসিক তদন্ত, ডিজিটাল এভিডেন্স এবং ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রশিক্ষিত তদন্তকারী প্রয়োজন।

পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও একটি সমস্যা। এছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও বিপুলসংখ্যক মামলা ঝুলে থাকার (কেস ব্যাকলগ) কারণে ভুক্তভোগী যথাযথ বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং অভিযুক্তের জবাবদিহিও দীর্ঘায়িত হয়। প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশনও কমাতে হবে। কারাগারে থাকা বিপুলসংখ্যক বন্দির একটি বড় অংশ এখনো দণ্ডিত নয়; তাদের মামলা বিচারাধীন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কারাগারের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। এক্ষেত্রে নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

জুভেনাইল জাস্টিসের ক্ষেত্রেও শাস্তির পরিবর্তে সংস্কার, পুনর্বাসন ও রূপান্তরের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে। ১৮ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিশুর সংজ্ঞা ও শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো শিশু অপরাধ করলে তার জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে; কিন্তু তার বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় নিয়ে বিচার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে শুধু আইন কঠোর করলেই অপরাধ কমবে না। আমাদের যথেষ্ট আইন রয়েছে। প্রয়োজন হলো অপরাধ শনাক্তকরণ, তদন্ত, প্রসিকিউশন, বিচার এবং পুনর্বাসন—পুরো ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমকে ধারাবাহিক সংস্কারের মধ্যে আনা।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে সার্বিকভাবে কী কী পরামর্শ দেবেন?

আমার প্রথম পরামর্শ হলো, শুধু পুলিশের সংখ্যা বাড়ালেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমনটা মনে করি না। অবশ্যই পর্যাপ্ত পুলিশ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি whole-of-society approach প্রয়োজন।

যেমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। কোথায় মাদক ব্যবহার বা অপরাধের প্রবণতা বেশি, কোথায় নির্জন এলাকা, কোথায় মানুষকে ফেলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে—এসব জায়গায় দৃশ্যমান পুলিশিং, নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে।

হটস্পট পুলিশিং বা তথ্যভিত্তিক পুলিশিংয়ের ওপর জোর দেয়া দরকার। কোন এলাকায় কী ধরনের অপরাধ বেশি হচ্ছে, কোথায় কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ সংগ্রহ থেকে তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আরো কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। নারী ও শিশুবান্ধব রিপোর্টিং ব্যবস্থা থাকলেও ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এক্ষেত্রে কার্যকর আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বাড়াতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিংকে আরো কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

সবশেষে জননিরাপত্তাকে শুধু অপরাধী ধরার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। অপরাধ সংঘটনের আগেই কীভাবে ঝুঁকি শনাক্ত ও কমানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি ও সরকার—চারটি স্তরকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শুধু ‘বাবা-মা কেন দেখলেন না’, ‘কেন সন্তানের হাতে দামি ফোন ছিল—এ ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমে কোনো একটি পক্ষকে দায়ী করলে সমস্যার কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়, বরং পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলে অপরাধ ও সামাজিক সহিংসতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আরও