গবেষণা

গবেষণাপত্র প্রত্যাহার: তুলনার আগে যা জানা জরুরি

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহারের তথ্য সামনে এসেছে।

সংখ্যাটি অস্বস্তিকর এবং গুরুত্ব দিয়ে দেখার মতো। তবে কোনো সংখ্যাকে একা দাঁড় করিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে একটি প্রশ্ন জরুরি, এ সংখ্যা আসলে কীসের সঙ্গে তুলনা করে পড়তে হবে।

প্রথমেই মনে রাখা দরকার, গবেষণাপত্র প্রত্যাহার কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়। ২০২৩ সালেই বিশ্বজুড়ে ১০ হাজারের বেশি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে, আর ২০২২ সালে প্রত্যাহারের বৈশ্বিক হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মোট সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে ওপরে আছে বড় গবেষণাশক্তিগুলোই। রিট্র্যাকশন ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে প্রত্যাহার হয়েছে ১ হাজার ৭০১টি এবং ভারতে ৮৮৭টি গবেষণাপত্র, যা চীনের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ওই বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রত্যাহারের তালিকায় শীর্ষ ১০টির মধ্যে ছয়টিই ছিল ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়। যুক্তরাষ্ট্রও গবেষণা প্রকাশনায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ, ফলে তাদের প্রত্যাহারের মোট সংখ্যাও যথেষ্ট বেশি। অর্থাৎ প্রত্যাহার শক্তিশালী গবেষণা ব্যবস্থারও বাস্তবতা, কেবল বাংলাদেশের ব্যর্থতা নয়।

সংখ্যা বাড়ার পেছনে আরেকটি কারণও কাজ করছে। আগে যেসব দুর্বল বা অসৎ গবেষণা অলক্ষ্যে থেকে যেত, এখন রিট্র্যাকশন ওয়াচের মতো ডেটাবেজ, স্বাধীন অনুসন্ধানকারী এবং ছবি ও তথ্য যাচাইয়ের নতুন প্রযুক্তির কারণে তা অনেক বেশি ধরা পড়ছে। ফলে প্রত্যাহারের সংখ্যা বাড়া সবসময় নৈতিকতার অবনতির প্রমাণ নয়, অনেক সময় তা ব্যবস্থার নিজেকে সংশোধনের সক্ষমতা বাড়ারও লক্ষণ। এ কঠোর নজরদারির ফলেই ধরা পড়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে; রিট্র্যাকশন ওয়াচের তথ্যভাণ্ডারে এখন প্রায় ৬৩ হাজার প্রত্যাহারের রেকর্ড জমা হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের শুরুতে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৫৫ হাজার।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। মোট সংখ্যা পাশাপাশি রেখে কোনো দেশকে সবচেয়ে ভালো বা সবচেয়ে খারাপ বলা যায় না। বাংলাদেশের ৩২৫টি সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছরের, আর চীন ও ভারতের ওই সংখ্যা কেবল ২০২৫ সালের এক বছরের। তাছাড়া দেশভেদে মোট প্রকাশনার পরিমাণও বিশালভাবে ভিন্ন। তাই আসল প্রশ্ন মোট সংখ্যা নয়, বরং মোট প্রকাশনার তুলনায় প্রত্যাহারের হার এবং প্রত্যাহারের কারণ।

হারের হিসাব ছবিটা বদলে দেয়। প্রতি ১০ হাজার প্রকাশনায় প্রত্যাহারের হার সবচেয়ে বেশি সৌদি আরব (প্রায় ৩০), পাকিস্তান (প্রায় ২৮), রাশিয়া (প্রায় ২৫) ও চীনে (প্রায় ২৩); ভারতে এ হার প্রায় ১৫। মোট সংখ্যার তালিকা আর হারের তালিকা তাই এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র এর স্পষ্ট উদাহরণ; বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গবেষণা-উৎপাদক হওয়ায় তাদের মোট প্রত্যাহারের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি হলেও প্রকাশনার তুলনায় সেই হার অনেক কম, সর্বোচ্চ হারের তালিকায় তাদের নাম নেই এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের প্রত্যাহারের প্রবণতা বরং কমেছে। চীনের ক্ষেত্রে আবার দেখা গেছে, বিশ্বের মোট প্রকাশনায় তাদের যে অংশ, প্রত্যাহারে তাদের অংশ তার প্রায় চার গুণ। এ হার আবার সময়ের সঙ্গেও বাড়ছে; বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ হাজার প্রকাশনায় প্রত্যাহার ২০১৪ সালের প্রায় সাড়ে তিন থেকে বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে এগারোতে। তাই মোট সংখ্যায় যারা ওপরে, হারের বিচারে তারাই সবচেয়ে খারাপ, বিষয়টি এত সরল নয়; আবার হারও এক বিন্দুতে না দেখে সময়ের ধারায় দেখা জরুরি।

সংখ্যার মতোই জরুরি এর কারণ, কারণ প্রতিটি প্রত্যাহার একই ধরনের অপরাধ নির্দেশ করে না। আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাহারের বড় কারণগুলোর মধ্যে আছে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কারচুপি, পেপার মিল বা অর্থের বিনিময়ে গবেষণা তৈরির চক্র, চৌর্যবৃত্তি ও তথ্যের অসংগতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, অর্থাৎ সাজানো রিভিউর মাধ্যমে দুর্বল গবেষণা প্রকাশ করিয়ে নেয়া; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছবি ও তথ্যে কারসাজি। ভারতের সরকারি অর্থে করা গবেষণার প্রত্যাহার নিয়ে এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেখানে প্রায় অর্ধেক প্রত্যাহারের কারণই ছিল ছবির অপব্যবহার বা বিকৃতি। কিন্তু সব প্রত্যাহারই জালিয়াতি নয়। ২০২৫ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর এডুকেশনাল ইন্টিগ্রিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জীববিজ্ঞান-গবেষণার প্রত্যাহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রত্যাহৃত গবেষণার সবচেয়ে বড় অংশ ছিল চীনের (৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ), এরপর যুক্তরাষ্ট্র (১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ) ও ভারত (৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ)। ভারতের প্রত্যাহারের প্রায় এক-চতুর্থাংশের কারণ ছিল নৈতিক অনুমোদন বা নিয়ন্ত্রক বিধির ঘাটতি, তথ্য জালিয়াতি নয়। জীববিজ্ঞানে নৈতিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক, অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা কমিটি কেবল কাগজে-কলমে থাকে বা তাদের মান একেক জায়গায় একেক রকম। অর্থাৎ এখানে সমস্যা কেবল ব্যক্তির অসততা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাও।

গবেষণায় সৎ ভুল, পদ্ধতিগত ত্রুটি কিংবা নতুন তথ্যের আলোকে পুনর্ব্যাখ্যার কারণেও প্রত্যাহার হতে পারে। ভুল বা অবিশ্বস্ত গবেষণা শনাক্ত হলে তা প্রত্যাহার করার সক্ষমতা আসলে একটি সুস্থ ব্যবস্থার লক্ষণ। সমস্যা তখনই গুরুতর, যখন একই অনিয়ম বারবার ঘটে এবং প্রতিষ্ঠান তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়।

সংখ্যা কেন এভাবে বাড়ে, তার একটি বড় কারণ প্রকাশনা ও র‍্যাংকিংকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা। কোথাও কোথাও দেখা গেছে, র‍্যাংকিংয়ে ওঠার তাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন সব জার্নালে প্রকাশ বাড়িয়েছে, যেগুলো পরে নিম্নমানের বিবেচনায় তালিকাচ্যুত হয়েছে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাহারের সংখ্যা মাত্র কয়েক বছরে হাতে গোনা থেকে শতাধিকে পৌঁছেছে, আর নামি গবেষণা ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। এতে বোঝা যায়, প্রত্যাহারের ঢেউ প্রায়ই সেই জায়গাগুলোতেই বড় হয়, যেখানে গবেষণার মানের চেয়ে সংখ্যা আর অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশও যেহেতু আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং ও প্রকাশনার সংখ্যায় ক্রমে গুরুত্ব দিচ্ছে, এ ঝুঁকি এখানেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। তাই সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদের পাশাপাশি মূল্যায়নের ভেতরে মান ও জবাবদিহি রাখা জরুরি।

বিশ্ব এ সমস্যাকে যেভাবে দেখছে, সেখানেও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা আছে। ভারত প্রত্যাহারকে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক র‍্যাংকিং কাঠামোয় (এনআইআরএফ) যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বারবার প্রত্যাহার হয়, সেগুলোকে নেতিবাচক মূল্যায়নের মুখে পড়তে হবে। বার্তাটি স্পষ্ট, সংখ্যা লুকিয়ে ফেলা নয়, সেই সংখ্যাকে ব্যবস্থার উন্নতির কাজে লাগানোই লক্ষ্য।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে। আমাদের মোট প্রকাশনার নির্ভরযোগ্য হিসাব সহজলভ্য না হওয়ায় ৩২৫টি প্রত্যাহারকে মোট প্রকাশনার অনুপাতে বসিয়ে হার বের করা এখনো কঠিন। অথচ এ অনুপাত ছাড়া সংখ্যাটিকে না যায় লঘু করে দেখা, না যায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা বলা। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা, তারপর হার ও কারণ বিশ্লেষণ করা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ৩২৫টি প্রত্যাহার উপেক্ষা করার মতো নয়, আবার একে গবেষণা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার প্রমাণ ভাবাও ঠিক নয়। সঠিক পথ হলো, অন্য দেশের মোট সংখ্যার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে নিজেকে সবচেয়ে ভালো বা খারাপ ঘোষণা না করা, বরং নিজেদের প্রত্যাহারের হার হিসাব করা, কারণগুলো খতিয়ে দেখা এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে সাড়া দিচ্ছে তা যাচাই করা।

এ কারণে সংখ্যাগুলো যেভাবে সামনে আসে, সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। কোনো একটি মোট সংখ্যা শিরোনামে তুলে আতঙ্ক ছড়ানো সহজ, কিন্তু তা প্রায়ই বিভ্রান্তিকর। দায়িত্বশীল আলোচনা হলো সংখ্যার পাশে হার, সময়কাল ও কারণ রাখা, যাতে পাঠক প্রকৃত চিত্রটি বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকে মনোযোগ যায়।

শেষ পর্যন্ত একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা যায়, একটি ভুল সংশোধন করা যায়, একটি প্রকাশনা তালিকা নতুন করে সাজানো যায়। কিন্তু গবেষণার প্রতি মানুষের আস্থা একবার নষ্ট হলে তা ফেরানো কঠিন। বাংলাদেশের গবেষণার ভবিষ্যৎ তাই ঠিক করবে না আমরা কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ বা প্রত্যাহার করছি, বরং অনিয়ম ধরা পড়লে আমরা কতটা সৎভাবে তা খতিয়ে দেখছি। সেজন্য দরকার বাংলাদেশের নিজস্ব একটি গবেষণা-সততা কাঠামো, যেখানে কেবল প্রকাশনার সংখ্যা নয়, প্রত্যাহারের ইতিহাস, কারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় আসবে।

এটিএম মহিবুল্লাহ: সহকারী অধ্যাপক, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

আরও