গত ডিসেম্বরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার একটি বক্তৃতা ছিল। সেমিনার শেষে নানা আলাপচারিতায় একজন অধ্যাপক প্রশ্ন করলেন, আপনাদের দেশে প্রভাতফেরি কি মুক্তি পেয়েছে? আমার মুখের ভাষা পড়ে বুঝলেন, একুশের বন্দিত্ব মুক্তি এখনো হয়নি। আমি প্রায় এক যুগ ধরে আহাজারি করে আসছি। আমাদের জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের অসীম কৃপা যে তারা আমাকে প্রশ্রয় দেন। অন্তত ফেব্রুয়ারি এলে এ বিষয়ে আহাজারি করে লেখা আমার কলাম তারা প্রকাশ করেন। ‘কৃপা’ শব্দটি অনেকে এ প্রসঙ্গে অনেকটা সংকীর্ণ শব্দ মনে করতে পারেন। সম্পাদকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ খুব প্রাণখোলা মনে নাও হতে পারে। আসলে প্রাণ খুলতে পারলাম না। কারণ এতগুলো বছরেও রাজনীতি অঞ্চলের মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতো একুশের চেতনার এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সংবাদপত্রেরও একধরনের শীতঘুম আছে। তারা আমাকে কৃপা করলেও বিষয়টি অনুভব করে দায়িত্ব হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়েননি। সচেতন করার পদক্ষেপ নেননি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে।
অধ্যাপকের কথায় ফিরে আসি। এ প্রভাতফেরি হারিয়ে যাওয়ার আক্ষেপ ও ফিরে পাওয়ার আর্তি নিয়ে আমার কয়েকটি লেখা তিনি আগে পড়েছিলেন। এজন্যই আমাকে প্রশ্ন করা। হিন্দি ভাষার গ্রাসে পিষ্ট পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতি কর্মীরা বহুকাল থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করেন প্রত্যূষে প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে, যা বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে বাঙালি করে আসছিল। হিন্দি ভাষার আধিপত্য থেকে ভারতের বাঙালিরা বেরোতে পারেনি এখনো। তাই তারা প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে যাওয়া ও অনুষ্ঠান করা অব্যাহত রেখেছেন। এটিই তাদের প্রতিবাদের ভাষা।
সম্পূর্ণ আবেগ দিয়েই বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করতে চেয়েছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। বাঙালির দিনের হিসাবকে পাশ্চাত্যের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে মিশিয়ে ফেলেননি। তাদের স্মরণে ছিল বাঙালির দিন শুরু হয় প্রত্যূষে আর শেষ হয় সন্ধ্যায়। সেই মতে একুশের প্রথম প্রহর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রত্যূষে অর্থাৎ কাকডাকা ভোরে। অন্য কোনো জাতীয় দিবস উদযাপন রীতির সঙ্গে একুশকে মেলানো যাবে না। তাই একুশ অনন্য। উদযাপন রীতিটাও আলাদা। পাকিস্তান আমল থেকে দেখে আসছি একুশ নিয়ে আলাদা প্রস্তুতি থাকত কিশোর-যুবা সবার। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রস্তুতি থাকত এলাকার স্কুল-কলেজের শহীদ মিনার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করায়। পাড়ামহল্লায় শহীদ মিনার না থাকলে মহা উৎসাহে কলাগাছ কেটে বানিয়ে ফেলত প্রতীকী মিনার। এর-ওর বাগান থেকে সন্ধ্যার আগেই ফুল জোগাড় করা হতো। প্রায় নির্ঘুম রাত কাটত। প্রভাতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...’ গানের সুর-মূর্ছনা নিয়ে নগ্ন পায়ে মিছিল বেরোত। শহীদ দিবসের ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল এগোত শহীদ মিনারের দিকে। কোনো রাজনৈতিক স্লোগান থাকত না এদিন। একটি ভাবগাম্ভীর্য শান্ত সমাহিত পরিবেশ স্বর্গীয় আভা যেন ছড়িয়ে দিত। একুশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এ অনন্য ধারা স্বাধীনতা-উত্তরকালেও অনেকদিন সচল ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রত্যূষেই পরিচালিত হতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কার্যক্রম। রাজধানীর নানা পথ ধরে প্রভাতফেরির মিছিল এসে পৌঁছত শহীদ মিনারে। ভাষার গানের সুর-মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। ঠিক অভিন্ন রূপ ছিল দেশের সর্বত্র।
এরপর নষ্ট রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ঐতিহ্য হত্যা করতে থাকলাম আমরা। সম্ভবত আশির দশকের শেষ দিকে সামরিক শাসনের কাঠামোয় জেনারেল এরশাদ নিজের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে নিরাপদে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের জন্য সমস্ত রীতি ভেঙে মধ্যরাতকে একুশের প্রথম প্রহর বানালেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে শুরু করলেন একুশে তর্পণ। আশ্চর্যের বিষয়, একুশে তর্পণের ঐতিহ্য ও মাহাত্ম্য ক্ষুণ্ন হলেও কোনো পক্ষ থেকেই প্রতিবাদ এল না। নির্বিবাদে মেনে নিল সবাই। সারা দেশে সরকারিভাবে মধ্যরাতে পালন শুরু হলো একুশে। একুশের অনন্য ঐহিত্য ‘প্রভাতফেরি’ যেন পরিকল্পনা করেই বিসর্জন দেয়া হলো। অথবা মধ্যরাতেই যেন ‘প্রভাতফেরি’র আয়োজন করা হলো।
তাহলে কি দেশ স্বাধীন হওয়ার কারণে একুশের ঐতিহ্য আর প্রণোদনা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেল? বাংলাদেশে পালন করা জাতীয় দিবসগুলোর মধ্যে একমাত্র ২১ ফেব্রুয়ারিই হচ্ছে ব্যতিক্রম, যে দিবস তর্পণের সঙ্গে ‘প্রভাতফেরি’ নামের বিষয়টি আছে। দিবসটির তাৎপর্য তো ক্ষুণ্ন হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। একুশের সাংস্কৃতিক শক্তির কারণেই দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। খুব সংগত কারণেই পৃথিবীর দেশগুলো মাতৃভাষা দিবস পালন করতে গিয়ে ভাষা আন্দোলনের উৎসভূমির খোঁজ করবে। অনুসরণ করার চেষ্টা করবে আমাদের ঐতিহ্যকে। অথচ আমরা প্রভাতফেরির ঐতিহ্য আড়াল করে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছি। মধ্যরাতে টেনে এনেছি একুশেকে। অথচ পাশ্চাত্য ২৪ ঘণ্টার হিসাবে আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, যা পালন রাত ১২টা ১ মিনিটই সংগত ছিল। অথচ এদিন সাভার স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ হয় ভোর থেকে!
গত শতকের আশির দশকের পর জন্ম নেয়া প্রজন্মের কাছে ফিকে হয়ে গেছে প্রভাতফেরির তাৎপর্য। খাটো করে ফেলা হয়েছে একুশের গৌরবকে। এখন মধ্যরাতে মাঝে মাঝে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে কার আগে কে বেদিতে ফুল দেবে তা নিয়ে সংঘাতের ঘটনাও ঘটে। দলীয় স্লোগানের দাপটে একুশের ভাবগাম্ভীর্য আর সৌন্দর্য উধাও হয়ে যায়। এমন বিভ্রান্তি এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাইরেও। ২০১৬-তে আমি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলাম। লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে চমৎকার দুটো শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রবাসী বাঙালিরা জানালেন, আগে তারাও প্রভাতফেরি করে প্রত্যূষে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতেন। এখন ঢাকাকে অনুসরণ করতে গিয়ে রাতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন।
কলকাতার অধ্যাপক মহোদয় এসব শুনে বিস্মিত হলেন। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলেন, এমনটি যে হচ্ছে তাহলে আপনাদের বাংলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের মানুষেরা কী করছেন? এ সংস্কৃতি বিকৃতির হাত থেকে ঐতিহ্যকে বাঁচাতে তাদেরই তো এগিয়ে আসার কথা। আমি সবসময় নিজ দেশের দুর্বলতা বিদেশীদের কাছে আড়াল করতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমার সঙ্গে ছিলেন একজন সরল অধ্যাপক। তিনি ক্ষোভ ধরে রাখতে পারলেন না। বললেন, বাংলা একাডেমি তো সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকানি ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা এ প্রতিষ্ঠানের কাজ। এসব জরুরি বিষয় ভাবার দায় এ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের আছে কিনা তাও বোঝা যায় না। আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও দলীয় রাজনৈতিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে অনেক আগে থেকেই। তাই এসব জায়গা থেকেও মুক্তচিন্তা আশা করা যায় না।
প্রায় দেড় দশক আগে থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এ নিয়ে জনসচেতনতা শুরু করেছিলাম। আমার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিক্ষার্থীরা ও কোনো কোনো সহকর্মীও একতাবদ্ধ হয়েছেন। এখানেও সরকারি পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিভিন্ন হল ও প্রশাসন থেকে মধ্যরাতের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্প অর্পণ করে। আমরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছেলেমেয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রভাতেই শহীদ মিনারে যাই। বেশ কয়েক বছর হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যদিও মধ্যরাতের অনুষ্ঠান করে আবার ভোরে উঠতে হয় তাই লোকসংখ্যা খুব বেশি হয় না।
মধ্যরাতের এ তর্পণ যে আরোপিত-স্বতঃস্ফূর্ত নয় এটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতি ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করি। এদিন সকালে প্রায় ১০টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে সাভার অঞ্চলের বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে শহীদ মিনারে আসেন। আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। একইভাবে এরা স্কুল পোশাক পরে নগ্ন পায়ে একুশের গান কণ্ঠে নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। এসব দেখে সাহস জাগে। মনে হয় আমরা দায়িত্ববান বড়রা ভুল ও বিকৃত করলেও এ প্রজন্ম ঠিক একুশের চেতনা ফিরিয়ে আনবে। যদি এভাবে আমরা ওদের বিভ্রান্তিতে ফেলে না দিই।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, একসময় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বোধোদয় ঘটবে। তারা আত্মচৈতন্যে ফিরে আসবে। একুশের গৌরবকে এর স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার পথ করে দেবেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিশ্ববাসী জানুক প্রভাতফেরির গৌরবকে। প্রভাতফেরি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাক বিশ্বসংস্কৃতিতে। আমাদের প্রজন্ম ঘুরে দাঁড়ানোর দীক্ষা পাক। প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে এ প্রেরণা ছড়িয়ে পড়ুক।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়