ব্যাংক বিশ্লেষ

কভিড-১৯ ও বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাংকিং সেবা

সাম্প্রতিক সময়ের সব পূর্বাভাস অর্থনৈতিক ও বিশ্ববাণিজ্যের সমাগত মন্দার ইঙ্গিত করছে। চীন থেকে শুরু করে বিশ্ববাণিজ্যের সব মূল অংশীদার বর্তমানে করোনাযুদ্ধে অবতীর্ণ। বিশ্ব অর্থনীতির সব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে অথবা সংকুচিত হয়েছে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার প্রভাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে সারা বিশ্বে। আমদানিকারকরা সময়মতো বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে পারছেন না, আর রফতানিকারকরা যথাসময়ে জাহাজীকরণে ব্যর্থ হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ের সব পূর্বাভাস অর্থনৈতিক ও বিশ্ববাণিজ্যের সমাগত মন্দার ইঙ্গিত করছে। চীন থেকে শুরু করে বিশ্ববাণিজ্যের সব মূল অংশীদার বর্তমানে করোনাযুদ্ধে অবতীর্ণ। বিশ্ব অর্থনীতির সব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে অথবা সংকুচিত হয়েছে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার প্রভাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে সারা বিশ্বে। আমদানিকারকরা সময়মতো বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে পারছেন না, আর রফতানিকারকরা যথাসময়ে জাহাজীকরণে ব্যর্থ হচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এবং বিশ্বের সরবরাহ চেইন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এসব অর্থনৈতিক ও আর্থিক ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাংকিং সেবার ওপর। অর্থনৈতিক ও বিশ্ববাণিজ্য সংকোচনের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এ-সংক্রান্ত সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রমে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি বড় আয়ের উৎস হলো বিশ্ববাণিজ্যসংক্রান্ত আর্থিক সেবা। বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকের এ ধরনের আর্থিক সেবা দ্রুত হারে সংকুচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ের পূর্বাভাস বলছে, বিশ্ববাণিজ্যসংক্রান্ত আর্থিক সেবা থেকে আয় বহুলাংশে কমে যাবে সামনের মাসগুলোয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় বৈদেশিক বাণিজ্য সংকোচনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ঐতিহ্যগতভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত ব্যাংকঋণে মন্দ ঋণের পরিমাণ অনেক কম। কভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা এ ঐতিহ্যের অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত ছোট আকারের ব্যাংকগুলোর জন্য মন্দ ঋণের বোঝা বহন অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য আর্থিক সেবাসংক্রান্ত আয়ের মূল উৎস। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মূল ভোক্তা হলো ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র। বড় অংশের কাঁচামাল আমদানি করা হয় চীন থেকে। প্রকৃতপক্ষে চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার রাষ্ট্র। সুতরাং সব বড় অংশীদার রাষ্ট্র এরই মধ্যে করোনা আক্রমণে ভীষণভাবে পর্যুদস্ত। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা সরাসরি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে আঘাত করতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সর্বশেষ বিশ্ব আর্থিক মন্দার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশেষজ্ঞ সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সংকুচিত দেশীয় আয় চীন ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। গবেষণার প্রাক্কলনে বলা হয়েছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৫ থেকে ১০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন কমলে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রফতানি ৭ থেকে ১৭ শতাংশ কমবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ৪ থেকে ৯ শতাংশ শ্রমিক চাকরি হারাবেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তিন বিলিয়নের অধিক মূল্যের তৈরি পোশাক রফতানির চুক্তি বাতিল করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত আরো দুঃসংবাদ তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের জন্য অপেক্ষা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ছোট আকারের রফতানিকারীদের জন্য এ অবস্থার মোকাবেলা করা অত্যন্ত কঠিন।  বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ বিপর্যয়ের সময় সরকারের এমন প্রণোদনা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। তবে তৈরি পোশাক খাতের বিপর্যয় ব্যাংকিং খাতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতি ও তৈরি পোশাক খাতের মন্দা পরিস্থিতি এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তৈরি পোশাক খাতের রফতানি চুক্তি বাতিলের কারণে এ খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংকগুলোয় তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রসংক্রান্ত দায় পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু বাধ্যতামূলকভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিদেশী কাঁচামাল রফতানিকারকদের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে সামনের মাসগুলোয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের দায় বহন করা ব্যাংকগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবান অসাধু রফতানিকারকরা সুযোগ গ্রহণ করলে তা ব্যাংকগুলোর জন্য আরো ভয়ানক হবে। ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করে অনেক আমদানিকারক এ-সংক্রান্ত ডকুমেন্ট ব্যাংক থেকে গ্রহণ করছেন না বা  গ্রহণ করতে পারছেন না, যা ব্যাংকগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ঋণপত্রের রীতি অনুযায়ী এ-সংক্রান্ত দায় সামনের দিনগুলোয় ব্যাংকগুলোর ওপর বর্তাতে পারে। বিশ্ববাণিজ্যে ব্যবহূত  আমদানি-রফতানির চুক্তিগুলোর আইনি ভিত্তি না থাকা বা দুর্বল হওয়ার কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের দরকষাকষির সুযোগ কম, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য তথা এ-সংক্রান্ত আর্থিক সেবাকে প্রভাবিত করতে পারে মারাত্মকভাবে। সরকার কর্তৃক প্রদত্ত প্রণোদনা সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের জন্য স্বস্তির। তবে ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত দায় লম্বা সময়ের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশ্ব ঐতিহ্যের বিপরীতে বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্যে মন্দ ঋণ পরিস্থিতি অন্যান্য খাতের তুলনায় কম নয়, যদিও ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের রীতির আওতায় তা আলাদাভাবে বোঝার উপায় থাকে না। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোয় মন্দ ঋণের বোঝা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ঋণপত্র ও চুক্তির আওতায় মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে কিছু ব্যাংকে অনিয়ম বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিস্থিতির সুযোগে তারল্য সংকটে থাকা কিছু ব্যাংকের বিশ্বব্যাপী মূল্য পরিশোধে দেরি, ঋণপত্রে অযৌক্তিক ভুল খুঁজে বের করা ইত্যাদি অনিয়মে জড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর এ ধরনের প্রবণতা দেশের কিছু ব্যাংকেও বিস্তার লাভ করতে পারে, যা দীর্ঘকালীন সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্তরায়।

রফতানি বিপর্যয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংকট তৈরি হতে পারে। আমদানি পণ্যের মূল্য পরিশোধের জন্য রফতানি মূল্য সময়মতো পাওয়া জরুরি, যা সামনের কয়েক মাস সংকট তৈরি করতে পারে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য। এছাড়া কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসা সংকুচিত বা বন্ধ হলে তা বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকদের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বৈদেশিক বাণিজ্যে আর্থিক সেবা পরিচালনা করে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায়। আন্তর্জাতিক আইন, নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়নে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বা আইসিসির ভূমিকা সারা বিশ্বে স্বীকৃত। মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিশ্ববাণিজ্যে আর্থিক সেবার একটি বড় অংশ প্রদান করে এ সংস্থা প্রণীত আইন ও নির্দেশিকার আওতায়। করোনা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার মাঝে বেশকিছু ক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যার মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, যা নতুন সমস্যা তৈরি করছে।

এ পরিস্থিতিতে অতিসম্প্রতি আইসিসি এ-সংক্রান্ত আইনি অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এ সংস্থার আইনি অবস্থান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণপত্র ও চুক্তির আওতায় মূল্য পরিশোধে সহায়ক হতে পারে। তবে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে এটা স্পষ্ট। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের সেবা গ্রহণকারী ব্যবসায়ী এবং তাদের বিদেশী কাউন্টার পার্ট বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বেশকিছু সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। দেশীয়  ও বিদেশী ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা থাকলে তাদের সক্রিয় সহযোগিতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত আর্থিক সেবার জটিলতা থেকে বের হতে পারবে, নতুবা ব্যাংকগুলোকে বড় দায়ের মুখোমুখি হতে হবে।

করোনাসংক্রান্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের মূল্য পরিশোধের জন্য আইসিসি প্রদত্ত পরামর্শ বেশ কার্যকর হতে পারে যদি নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে কিছু সক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাপী বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনলাইনে বাণিজ্যসংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠানোর বিপরীতে মূল্য পরিশোধসংক্রান্ত বাধার অপসারণ একটি স্বল্পকালীন সমাধান হতে পারে। আর দীর্ঘকালীন সমাধান হিসেবে এ-সংক্রান্ত সহায়ক আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাংক অর্থায়নে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয়।

আইসিসি প্রদত্ত আইনের ব্যাখ্যা ও পরামর্শ দেশের ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকরা পড়বেন, আলোচনা করবেন ও বিবেচনায় নেবেন—এটাই কাম্য। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেক সমস্যার সমাধান হয়তো এ থেকে পাওয়া যাবে না, তবে আমাদের নিজস্ব সমাধানের পথ খুঁজতে সহায়ক হবে।

 

ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব: অধ্যাপক

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)

আরও