পর্যালোচনা

বাংলাদেশ-ভুটান বাণিজ্য চুক্তি: সীমিত প্রত্যাশা

গত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভুটান একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ৬ ডিসেম্বর এ চুক্তি স্বাক্ষরের একটি ঐতিহাসিক তাত্পর্য রয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে ভুটান প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দেয়। ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার অব্যবহিত পরেই ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে

গত ডিসেম্বর বাংলাদেশ ভুটান একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের একটি ঐতিহাসিক তাত্পর্য রয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে ভুটান প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি  দেয়। ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার অব্যবহিত পরেই ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার সূচনা হয়। আমাদের কিছু গণমাধ্যমে চুক্তিকে বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বলা হলেও কার্যত এটিকে শুধু বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বলা যায়। এর আগেও বাংলাদেশ বেশকিছু অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চুক্তির বিষয়ে কথা বলার সময় ভুটানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টির অবতারণা করেছেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশ হিসেবে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সবসময়ই আলাদা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্যের চেয়ে কৌশলগত দিককে গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্য চুক্তি করার ব্যাপারটি নতুন কিছু নয়, সাম্প্রতিক বিশ্বের ইতিহাসে রকম আরো বেশকিছু উদাহরণ পাওয়া যাবে। যেমন ১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছিল ইসরায়েলের মতো তুলনামূলকভাবে বাণিজ্যিক দিক থেকে একটি কম গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তির পেছনে বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক বিবেচনার চেয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল।

বর্তমান বিশ্বের অনেক বাণিজ্য চুক্তি শুধু পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে  শুল্ক ছাড় বিষয়ে হয় না। সেবা বাণিজ্য বর্তমানে অর্থনীতিতে এমনকি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে অনেক বাণিজ্য চুক্তিতেই পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এই চুক্তিতে শুধু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ের বিধান রাখা হয়, সেবা খাত এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সচিবালয়ের করা বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, সেবা খাতের অবদান জিডিপিতে প্রায় ৫৬ শতাংশ।  তাই সেবা খাতকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে কোনো বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হলে তার জাতীয় অর্থনীতিতে পূর্ণাঙ্গ অবদান রাখার অবকাশ নেই।

আমদানি বা রফতানি কোনো দিক বিবেচনাতেই ভুটান বাংলাদেশের  জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো বাজার নয়। তাই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বা ভুটানের অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা যায় না। এছাড়া ভুটান বাংলাদেশ উভয়ের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাসার্কের আওতায় স্বাক্ষরিত সাফটার চুক্তি পক্ষভুক্ত হওয়ায় সাফটা চুক্তি অনুযায়ী তাদের সংবেদনশীল পণ্য তালিকায় থাকা পণ্যগুলো ছাড়া অন্য পণ্যগুলোয় আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় পাওয়ার কথা। তাই যদি বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সাফটা তালিকায় সংবেদনশীল পণ্য তালিকায় রয়েছে এমন পণ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে বা চুক্তির রুলস অব অরিজিন সাফটা চুক্তি থেকে আরো উদার না হয়, তাহলে এর ফলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। রুলস অব অরিজিন একটি জটিল বিষয়। অল্প কথায় বলা যায়, আমদানি শুল্ক ধার্য করার লক্ষ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা কোনো পণ্য কোন দেশ থেকে এসেছে বলে বিবেচিত হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য বিস্তারিত নিয়মকানুনকে রুলস অব অরিজিন বলা হয়।

আধুনিক বিশ্বে অল্প কিছু প্রাথমিক পণ্য ছাড়া বেশির ভাগ পণ্যই যেহেতু বিভিন্ন দেশের কাঁচামালের সমন্বয়ে ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন দেশে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি হয়, তাই বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ করে কোনো অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি রুলস অব অরিজিন অনুযায়ী, কোনো তৈরি পোশাকে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ দেশীয় কাঁচামাল মূল্য সংযোজন ছাড়া পণ্যটি ওই দেশের পণ্য বলে বিবেচিত না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পোশাক রফতানিকারকদের অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তার তৈরি পোশাকের অন্তত ২৫ শতাংশ দেশীয় খাতের। রুলস অব অরিজিন শিথিল হলে রফতানিকারকদের জন্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা সুবিধাজনক হয়। জটিল রুলস অব অরিজিন রফতানিকারকদের কাজকে জটিল করে ফেলে। উদাহরণ রয়েছে যে রুলস অব অরিজিনের জটিলতার কারণে কোনো কোনো সময়ে কিছু দেশের রফতানিকারকরা কোনো অগ্রাধিকারমূলক বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা না নিয়ে সাধারণভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম মেনেই পণ্য রফতানি করেছে। তাই যদি বাংলাদেশ ভুটানের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির রুলস অব অরিজিন, সাফটা রুলস অব অরিজিনের চেয়ে শিথিল হয়, তাহলে তা বাংলাদেশ ভুটানের রফতানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

এখানে উল্লেখযোগ্য, ভুটান বাংলাদেশ উভয় দেশই সার্কের আওতায় স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সাফটার (যেটিকে পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘ সংবেদনশীল পণ্যের তালিকার কারণে আসলে কার্যত একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তিও বলা যায়, যা ২০০৬ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে) মাধ্যমে কিছু পণ্যের পারস্পরিক বাজারে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমদানি-রফতানি করতে পারত (যদি না পণ্যগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের সংবেদনশীল  পণ্যের তালিকায় থেকে থাকে) তাই এক অর্থে এই চুক্তি স্বাক্ষর দেশ দুটির সাফটার আওতায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে এক ধরনের অনাস্থারই প্রকাশ বলা যায়। অবশ্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সার্কের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এর আগেও শ্রীলংকা পাকিস্তান, শ্রীলংকা ভারত এবং ভারত নেপাল ধরনের কিছু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় বিষয়টি নতুন না হলেও ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকায় একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির পক্ষভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আবার অগ্রাধিকারমূলক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর খুবই বিরল ঘটনা। যেকোনো বিশেষজ্ঞই ব্যাপারে মোটামুটি একমত হবেন যে ধরনের দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি থেকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। তাই সার্বিক বিবেচনায় এই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভুটান বা বাংলাদেশের বাণিজ্য বা সার্বিক অর্থনীতিতে কার্যকরী কোনো পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায় না। কিন্তু সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবে শুধু সাফটার অগ্রগতি ব্যাহত হয়নি, এমনকি বিবিআইএন করিডোর বা মোটরযান চলাচল চুক্তি আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি; যা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।

কিছু গণমাধ্যমে খবর এসেছে, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এই দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তিকে একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিনির্ধারণী বৈঠকগুলোয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবস্থান নেয়ার বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, আমাদের বাণিজ্যবিষয়ক দরকষাকষির অভিজ্ঞতা ভুটানের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার কথা। বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পর্যবেক্ষক হলেও ভুটান এখনো সংস্থাটির সদস্যপদ অর্জন করেনি। তাদের জন্য এই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ক্ষেত্র হওয়া উচিত, আমাদের জন্য নয়।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরেও এর পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ নীতির সঙ্গে এটি কতটা সাযুজ্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে জনসাধারণকে আরো ওয়াকিবহাল হওয়ার সুযোগ দেয়া এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য অতিসংবেদনশীল কোনো ব্যাপার না থাকলে অবশ্যই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দ্রুত আপলোড করা উচিত।

 

মো. রিজওয়ানুল ইসলাম: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও