করোনাকালের শিক্ষা

নগরায়ণে টেকসই মডেল জরুরি

করোনার প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বের মানুষ গৃহবন্দি। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংকট পুরোপুরি সমাধান হতে আরো অনেক সময় লাগবে। মানুষকে তাই ব্যবহারিক ও সামাজিক কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবন ধারণের সঠিক পথটি বেছে নিতে হবে। যদিও এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বরং উন্নত বিশ্বেও এর ভয়াবহতা অত্যন্ত তীব্র এবং বিচিত্র। প্রতিদিন এই মহামারীসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের খবর সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বের মানুষ গৃহবন্দি। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংকট পুরোপুরি সমাধান হতে আরো অনেক সময় লাগবে। মানুষকে তাই ব্যবহারিক ও সামাজিক কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবন ধারণের সঠিক পথটি বেছে নিতে হবে। যদিও এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বরং উন্নত বিশ্বেও এর ভয়াবহতা অত্যন্ত তীব্র এবং বিচিত্র। প্রতিদিন এই মহামারীসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের খবর সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে।

যদিও বর্তমানে দেশে করোনা রোগীর সংক্রমণের হার ক্রমবর্ধমান এবং এ অবস্থায় আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে ভবিষ্যতের দিনগুলোর জন্য। কারণ আমরা কেউই বলতে পারছি না ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ভালো অথবা মন্দ—কী অপেক্ষা করছে? তবে বাস্তবতা হলো, যেকোনো সমস্যায় কিংবা প্রয়োজনে আমাদের প্রতিনিয়ত বেড়ে ওঠা শহরগুলো কি আদৌ আমাদের সামাজিক, স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক চাহিদা সেভাবে পূরণ করতে পারছে? প্রশ্ন থেকে যায়!

একটি দেশের শহর সেই দেশের মানুষদের জন্য ভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে। সেজন্য প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত নগরকেন্দ্রিক সামাজিক ব্যবস্থাপনা। যে শহরে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা মডেল রয়েছে, সেই শহর খুব সহজেই নাগরিকদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। স্বভাবতই খুব সাধারণ সময়গুলোয় একটি শহরের টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা আমরা খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারি না। যখন সেই শহর কোনো ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হয় তখন সেই শহরের সর্বস্তর সমস্যায় জর্জরিত হয়। আর তখনই বুঝতে হবে সেই শহরে নেই কোনো পরিকল্পিত সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা। কথাগুলো বলছি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। তাই বিশেষ সময়গুলো থেকে আমাদের শিখতে হবে। শহরগুলো নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে এ শহরগুলো কি নাগরিকদের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারছে?  আর এই করোনা এ সত্য আবার উপলব্ধি করতে শেখাল আমাদের শহরকেন্দ্রিক অবস্থান এবং বৈপরীত্য।

জনবহুল যেকোনো দেশের সবসময় সব ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা একদিকে যেমন কষ্টসাধ্য, ঠিক তেমনি বাস্তবায়নের উপায়গুলো ভিন্নতর হয়।  যেখানে চিন্তা-চেতনার এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ও সমন্বয় করার জন্য শুধু একদিকে চিন্তা করলে হয় না। চিন্তা করতে হয় বহুমাত্রিকতা নিয়ে এবং সেই বহুমাত্রিকতার জ্ঞানের ভিন্নতার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন নগরকেন্দ্রিক সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারি। তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া।

কারণ নগরকেন্দ্রিক সামগ্রিক উন্নয়ন হলো এমন একটি মিশ্র প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যের সঙ্গে নগরায়ণের সম্পর্ক এবং এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। ইতিবাচক নগরায়ণ এবং আধুনিকায়ন বলতে উন্নত চিকিৎসা. প্রযুক্তি. শিক্ষা, পেশাদারিত্ব প্রত্যেকটি বিষয়ের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক বোঝায়। আর এই প্রত্যেকটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়েই একটি নগরের সামগ্রিক সামাজিক মডেল হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, যার মাধ্যমে দেশ উপকৃত হবে। তদুপরি এ ধরনের প্রেক্ষাপটের অনুপস্থিতিতে আমাদের নগরগুলো বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে পারে বিশেষ মুহূর্তে এবং ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নতুন কোনো সমস্যা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নগরকেন্দ্রিক মানসিক সমস্যার কথা, যার সঙ্গে নগরায়ণের এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে!

এ অবস্থায় সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন বর্তমানের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং পর্যবেক্ষণ করে সামাজিকভাবে সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, সেসব বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান এবং নিজেদের ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যেকোনো মহামারীতে আমাদের শহরগুলো কী ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে, তার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা মডেল চিন্তা করা যেতে পারে। যেখানে নাগরিক স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপ থাকবে। একটি শহরের বিশেষ প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে সেই মডেলগুলো থেকে সুনির্দিষ্ট মডেল বিশেষ সময়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে নাগরিকদের মানসিক ও সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে। এ ধরনের মডেল এবং চিন্তাভাবনা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন এ মুহূর্তে। কারণ কোনো সমস্যা সামনে এলে শুধু তখনই সেটিকে নিয়ে চিন্তা করব—এ ধরনের মনমানসিকতা আমাদের পরিহার করতে হবে।

এক্ষেত্রে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু সেই গবেষণাগুলো হতে হবে প্রায়োগিক এবং বর্তমান প্রচলিত নগরকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। শহরকেন্দ্রিক এ মডেলে নাগরিক ব্যবস্থাপনা এমনভাবে রাখতে হবে যেন সমাজের প্রত্যেকটি নাগরিক তার চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট একটি পরিসীমার মধ্যে পায়। বর্তমানে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানের নভেল করোনাভাইরাসের কথা, যার জন্য আজ বিশ্ব আতঙ্কিত। অন্যদিকে আমাদের বসবাসের জায়গার সঙ্গে, আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে এ জীবাণুগুলোর সংক্রমিত হওয়ার অনেক উপায় রয়েছে। তাই স্থাপত্য নকশা বলি কিংবা যেকোনো ধরনের নগরায়ণ বলি কিংবা জীবনযাপনের ধারা বলি না কেন, সেখানে আমাদের সুস্পষ্টভাবে খেয়াল রাখতে হবে এ বিষয়গুলোর দিকে. যা আমাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাড়ির শিশু এবং বয়স্কদের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। সেক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের নগরকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার মডেল চিন্তা করা যেতে পারে। শহরে বসবাস করা প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হয়, এ মডেলগুলো সেসব বিষয় নিয়ে আলোকপাত করবে। সম্মিলিতভাবে কাজটি এখন আমাদের শুরু করতে হবে এবং সরকারের পক্ষ জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

সজল চৌধুরী: শিক্ষক ও স্থাপত্য-পরিবেশবিষয়ক গবেষক

আরও