প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এ সফরের কূটনৈতিক তাৎপর্য কতটা?
আমার কাছে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর। ভারসাম্যপূর্ণ এ অর্থে কোন দেশে প্রথম কূটনৈতিক সফর করা হবে তা বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। সফরসূচি নির্ধারণটায় অনেক পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেকোনো দেশে কেউ সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি কোন দেশে প্রথম সফর করবেন তা নিয়ে সবার আগ্রহ থাকে। প্রতিবেশী দেশগুলোও এদিকে নজর রাখে। বিশেষত এ ধরনের সফরের ক্ষেত্রে যদি কারো সঙ্গে টানাপড়েন থাকে আবার কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে তাহলে সফরের সবকিছুর প্রতি তাদের মনোযোগ বাড়ে এবং সে অনুযায়ী তারা আলোচনাও করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তার প্রথম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর নিয়ে অনেকের কৌতূহল ছিল। এক্ষেত্রে ভারত, মালয়েশিয়া ও চীনের প্রসঙ্গই বারবার আলোচনায় এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি মালয়েশিয়া সফর করে চীনে যাবেন। এটা বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। কারণ সফরকে ঘিরে যেসব প্যারাডক্সের জায়গা তৈরি হতে পারত সেটা এড়ানো গেছে। চীনের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক দূরত্ব আর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের মতো বিষয়গুলোর সুরাহা কিছুটা হলেও এ সফরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সঙ্গেও আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। অনেকদিন বন্ধ থাকা এ শ্রমবাজার কবে নাগাদ খুলবে তা প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই এজন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা বাড়ানোর সুযোগ রয়ে গেছে।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব অনেক পুরনো। যদিও অনেকে বলেন চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে আমাদের কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে, তার পরও বাস্তবতা অন্যরকম। গত ১৫ বছরে চীন আমাদের অনেক উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে। এজন্য ভূরাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে চিন্তা করলে, আমাদের এমন দেশগুলোতেই যাওয়া দরকার যেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা ওই দেশগুলোতে করা যাবে। এজন্য মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কূটনৈতিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে এক ধরনের ভারসাম্য ও প্রায়োগিক দিক পাওয়া যাচ্ছে। চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকের মাধ্যমে ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বাণিজ্য বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ অনেক বিষয় রয়েছে। অবশ্য এ সফরের তাৎপর্য বা প্রভাব কী হতে পারে তা বোঝার জন্য আরো কিছুদিন সময় প্রয়োজন।
চীন সফরে কর্মসংস্থান তৈরি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সহযোগিতা আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপ কী হতে পারে?
একটা বিষয় লক্ষ করা দরকার। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের অর্থায়নে একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেখানে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে। এর মানে হলো, চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করলে আমাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যখন এ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হবে তখন সেখানে আরো বিনিয়োগ হবে। সরাসরি এ বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান গড়বে এবং একটা সময়ে আমরা আরো বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারব। ফলে এগুলো আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি ইতিবাচকভাবে সংযুক্ত।
আরেকটি বিষয় বলা দরকার, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০ বা তার কিছু বেশি চীনা কোম্পানি কিন্তু তালিকাভুক্ত রয়েছে। প্রযুক্তিগত খাতে এগুলোর অবদান আছে। এখন যারা এখানে বিনিয়োগ করেছেন তাদের বিনিয়োগকে আরো সুবিধা দেয়ার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। এভাবেও কিন্তু বিনিয়োগে আস্থা তৈরি হয়। কূটনৈতিক চ্যানেল তখন সেগুলোকে দরকষাকষির জন্য ব্যবহার করতে পারে। যেমন দেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বরাবরই ঘাটতি দেখা যায়। সরকারের পরিকল্পনা আছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের। চীনের কাছ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আনা যায় কিনা সে চেষ্টা করা যেতে পারে। দেশে এক চীনা কোম্পানি এরই মধ্যে বর্জ্য থেকে কীভাবে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করছে। এ ধরনের উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোকে আমাদের দেশে কীভাবে নিয়ে আসা যায় তা ভাবতে হবে। জ্বালানি খাতে ভারসাম্য আনার জন্য আমাদের ভাবতে হবে। চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর দুই দেশের সফরের মধ্যে চীন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এ সফর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে কেমন ভূমিকা রাখবে বলে পর্যবেক্ষণ করছেন?
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এখন বাণিজ্য ঘাটতি বেশ বড়। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি আছে। চীন সরকার আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত বোধহয় তা থাকবে। এখন চীনের ক্ষেত্রে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর। আমদানিনির্ভরতার জায়গাটুকু কমিয়ে আনা যায় কিনা সেটি দেখা জরুরি। আবার চীনে আমরা কিছু পণ্য রফতানি করি, যার মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় না। শ্রমবাজার বাদে আয়ের বড় উৎসও নেই। এখন চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ায় কিছু খাত নিয়ে কাজ করতে পারি। তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য এবং সামুদ্রিক পণ্য রফতানি বাড়ানো যেতে পারে। দেশের চামড়া খাত এখন খুবই জীর্ণদশায়। কোরবানির সময় অসংখ্য চামড়া নষ্ট হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজর দিতে পারলে এ খাতকে আবার চাঙ্গা করা যেতে পারে।
চীনের মতো দেশে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান, পরিচ্ছন্নতা, আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয় করতে হবে। চীনের বাজার অনেক বড়। কোনোভাবে যদি আমাদের একটা বা দুইটা পণ্য নিয়ে বড় পরিসরে ওখানকার বাজারে যেতে পারি তাহলে অনেক বড় একটা বাজার কিন্তু আমাদের ধরা হবে। তার সক্ষমতাও বাংলাদেশের আছে। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ নিয়ে আলোচনা হলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও সুফল আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে জোর দিয়ে আলাপের বিষয়ে বাংলাদেশের কিছুটা উদাসীনতা আছে।
চীন সফরে জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দেশে জলবায়ু ব্যবস্থাপনা নাজুক অবস্থায় আছে। এক্ষেত্রে চীন থেকে আমরা কী সহায়তা পেতে পারি?
প্রধানমন্ত্রী সফরে তার পরিকল্পনায় খাল খনন ও বৃক্ষরোপণে জোর দিয়েছেন। এখন এ সম্মেলনগুলো থেকে মূলত বৈদেশিক সাহায্য, সহযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করাটাই মূল। এক্ষেত্রে একটা বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। বর্তমান বিশ্বে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমাদের দেশেও এখন চীন থেকে অনেক গাড়ি আসে। ইভির কথা ধরলে বাংলাদেশকে এখন প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্যে যেতে হবে। এখানে ইভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট করা যায় কিনা সেটি ভেবে দেখা যায়। শোনা যাচ্ছে, অনেক চীনা ইভি উৎপাদনকারী বাংলাদেশে আসতে চায়। এখানে শ্রমের মজুরি কম। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলও তৈরি হচ্ছে। এখন সরকার যদি বাড়তি কিছু সুবিধা দেয় তাহলে অন্য দেশের ম্যানুফেকচারিং কোম্পটানিগুলোও আকৃষ্ট হবে। এবারের বাজেটে বিদ্যুচ্চালিত যানের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়া আছে। এটা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার মতো। আমরা যখন এ ধরনের প্রযুক্তির দিকে যাব তখন পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এড়ানোর পথেও অনেকটা এগিয়ে যেতে পারব।
এসব বাদেও সরকারের খাল খনন কর্মসূচি আছে। পানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখন আলাপ হচ্ছে। তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে কী হবে তা এখনো জানা নেই। এদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়ে বিএনপির ইশতাহারে কথা আছে। চীন জানিয়েছে তারা অন্যান্য কারিগরি সহায়তা দেবে, যা আশাব্যঞ্জক। এরই মধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের অনুমোদন এসেছে। তবে এগুলো করতে তো বড় বিনিয়োগ লাগবে। এক্ষেত্রে আমি ঋণের চেয়ে বিনিয়োগের কথা বেশি বলব। ঋণ হলে আমাদের এক ধরনের দায় চলে আসে এবং লম্বা সময় এটি টেনে নিয়ে যেতে হয়। বিগত সময়ে মেগা প্রজেক্টের নামে আমরা এত ঋণ নিয়েছি এবং সেই ঋণের দায়ভার আমাদের এখনো মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। তাই আমাদের একটা উইন উইন সিচুয়েশনের দিকে যেতে হবে। তা না হলে যেকোনো বিষয়েই একটা ঋণের ফাঁদে পড়তে হতে পারে।
জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের ক্ষেত্রে শিল্প সংযুক্ত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি। চীনের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বা কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে কি শিক্ষা খাতে পরিবর্তন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর যায়?
শিক্ষা বিনিয়োগের একটি বড় জায়গা। শিক্ষা ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে আছে। এখন তারা কাটিং এজ টেকনোলজির কথা বলে। দেশটি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথম্যাটিকস—এ চারটিকে স্টেম বলা হয়। এ ধরনের আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষা পদ্ধতি চীন যেহেতু অনুসরণ করছে সেহেতু তাদের সঙ্গে সমন্বয় করার স্বার্থেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন করতে হবে। এ জায়গা থেকে আমরা যৌথ একটি কাঠামো আনতে পারি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা প্রায়ই এমন কিছু উদ্যোগ নিই। সমস্যা হলো, রাষ্ট্রীয় পরিসর বিবেচনায় এগুলোর ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা কাজ করতে পারে। যেমন দুই দেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে (বাংলাদেশ ও চীন হতে পারে) যৌথ ডিগ্রি দেয়ার অনুমতি দিতে হবে। ইউজিসিকে এ ব্যাপারে নমনীয় হতে হবে যদিও বর্তমান বাস্তবতায় এমনটা কঠিন। তাই এ জায়গাগুলোতে ক্ষুদ্র পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও কাজ করা যেতে পারে। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করতে পারি। প্রকৌশল বিভাগগুলো নিয়ে যৌথভাবে কাজ করা যায়। এসব প্রযুক্তিগত উপাদান আনতে পারলে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পরিসর বাড়বে।
সরকার এরই মধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের দেশে অবশ্য এ ধরনের শিক্ষাকে দ্বিতীয় শ্রেণীমানের বিবেচনা করা হয়। কিন্তু চীন এক্ষেত্রে চমৎকার উদাহরণ। ওরা এটিকে লুবান ওয়ার্কশপ বলে। এ ওয়ার্কশপের উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া। এ প্রশিক্ষণ বাস্তব জীবনে যেন তাদের কাজে আসে। পরবর্তী সময়ে স্নাতক পর্যায়ে এ প্রশিক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চীন থেকে শিক্ষা বিনিময় প্রোগ্রামের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি দেশে চালু করা গেলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হবে। বাস্তবিক কাজগুলো শেখায় ও শিল্প সংযুক্ত হওয়ায় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ দক্ষতা নিয়েই শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবেন।
সরকারের একটি বড় অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান বাড়ানো। এক্ষেত্রে চীনের বিশাল বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সম্ভাবনা কেমন?
কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সফরে সরাসরি অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কর্মসংস্থান গড়ার বিষয়টি নির্ভর করছে কূটনৈতিকভাবে আমরা চীনকে কতটা আশ্বস্ত করতে পারব। বাস্তবতা হলো, চীনের কর্মবাজারে প্রবেশ করা আমাদের জন্য কঠিনই হবে। ভবিষ্যতে চীনের শ্রমবাজার চালু হবে কিনা সেটা জানা নেই। যদি হয় তাহলে তারা কাটিং এজ টেকনোলজির যে দক্ষতা চায় আমাদের জনসম্পদকে তেমন দক্ষ করে তুলতে হবে। এখন অবশ্য অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে যায়। দেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে চীন তৃতীয় জনপ্রিয় দেশ বলা যায়। ওখানে স্কলারশিপ মেলে, আবার শিক্ষার খরচ তুলনামূলক কম। যারা ওখানে পড়তে যায় তারা মূলত প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। অনেকে পাঠ শেষে নানা কাজেও যুক্ত হচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের শ্রমবাজারও খুলবে। এজন্য মান্দারিনকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে চালুর আলাপ হয়েছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) বাংলাদেশের সংযুক্তি ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের কিছুটা আপত্তি আছে। এবারের সফরেও এগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে তা কী কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে?
চীনের বিআরআইয়ের অবকাঠামোগত জায়গা থেকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যুক্ত। পদ্মা ব্যারাজে চীনা বিনিয়োগ এলে তারা হয়তো এটিকেও বিআরআইয়ের একটি প্রকল্প বিবেচনা করবে। তাছাড়া পদ্মা ব্যারাজ হয়তো একধরনের রাজনৈতিক মতবিরোধ তৈরি করবে। বিষয়টা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে। এখন এ রকম কিছু টানাপড়েনের বিষয় থাকবে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে চীনের এ বিআরআইয়ের সঙ্গে আমরা কতটুকু সম্পৃক্ততা রাখব। অতীতের সরকারের তরফেও কয়েকবার বলা হয়েছে, আমরা এ উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তাই এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কিছু আছে বলে মনে হয় না।
এখানে যেটা লক্ষণীয়, চীন এখানে বিনিয়োগ কিংবা সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে। তারা অবকাঠামো পরিকল্পনার অংশ হলে নিজেদের মতো করে করার চেষ্টা করবে। তবে আমাদের সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দিকে কূটনীতিকে পরিচালনা করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের স্লোগান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এ স্লোগানের জন্যই বাংলাদেশের স্বার্থকে আগে প্রাধান্য দেয়া দরকার। এটি করতে পারলে সরকার ভালো একটি অবস্থানে থাকবে।
বাংলাদেশকে অবশ্য অর্থনৈতিক স্বার্থ দেখলেই হবে না। ভূরাজনৈতিক বা অন্য স্বার্থও দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বড় সীমান্ত। এজন্য ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই কোনো না কোনো বিষয়ে দরকষাকষি করতে হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক থাকে তা তো বাদ দিতে পারব না। ভারতের সঙ্গেও যেন আমাদের কাজের সম্পর্ক থাকে সেদিকে নজর রাখা দরকার। এজন্য ভারতের সঙ্গেও আমাদের কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে হবে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে এ ভারসাম্য ধরে রাখতে হবে।