খাদ্য

ব্যাপক ক্ষুধার মাঝেও বিপুল খাদ্য অপচয়

জীবনের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর মধ্যে প্রথমেই খাদ্যের অবস্থান। সে কারণে বিগত অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জীবনের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর মধ্যে প্রথমেই খাদ্যের অবস্থান। সে কারণে বিগত অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উদ্ভাবন করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। বাস্তবায়ন করা হয়েছে সবুজ বিপ্লব। ১৯৭১ সালে বিশ্বের মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ সালে তা ২ দশমিক ৮৪১ বিলিয়ন টনে বৃদ্ধি পায়। ৫৫ বছরের ব্যবধানে মোট উৎপাদন বেড়েছে ১৪০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বছরে গড়ে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে। বর্তমানে পৃথিবীতে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় তা দিয়ে বৈশ্বিক জনসংখ্যার দেড় গুণেরও বেশি মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য হারে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি বিরাজ করছে। প্রায় ৭৮৩ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে অভুক্ত থাকছে। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর জন্য দায়ী অসম বণ্টন, খাদ্যে প্রবেশাধিকারের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো। তাছাড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো খাদ্য অপচয়। বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নষ্ট বা অপচয় হয়। এর পরিমাণ দৈনিক এক বিলিয়ন মিল বা খাবার। বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার লোকসান হয় খাদ্য নষ্ট বা অপচয়ের জন্য। তার সঙ্গে অপচয় হয় উৎপাদনকাজে নিয়োজিত জমি, পানি ও তেজ বা শক্তি। তাছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী খাদ্য পচন। দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য ও ক্ষুধার অন্যতম কারণ খাদ্য নষ্ট ও অপচয়। ধনী ও উন্নয়নশীল সব দেশেই বিপুল পরিমাণ খাদ্যের অপচয় দৃশ্যমান। অপেক্ষাকৃত উষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোয় খাদ্য অপচয় বেশি। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে খাদ্য অপচয় বেশি হয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র। এখানে খাদ্যের পচনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি। খাদ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি অনেকটা সেকেলে। পরিবহন ব্যবস্থায় শীতল শৃঙ্খল প্রায় অনুপস্থিত। মাঠের ফসলে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিত্যনৈমিত্তিক। ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই, প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটজাতের ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। সে কারণে খাদ্যপণ্যের অপচয় বেশি। জাতিসংঘের নাইরোবিভিত্তিক ইউএনএফপি পরিবেশিত খাদ্যবর্জ্য সূচক প্রতিবেদন ২০২৪ অনুসারে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন টন খাদ্যপণ্য অপচয় হয়। এটি ২০২১ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ১০ দশমিক ৬২ মিলিয়ন টন অপেক্ষা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে জনপ্রতি ৬৫ কেজি খাদ্যপণ্যের অপচয় হতো। ২০২৪ সালে তা বৃদ্ধি পায় জনপ্রতি ৮২ কেজিতে। খাদ্য অপচয়ের এ পরিমাণ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, রাশিয়া ও ভারতের চেয়ে বেশি। একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে যুক্তরাজ্যে ৭৬ কেজি, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৩ কেজি, জাপানে ৩৮ কেজি, চীনে ৭৫ কেজি, রাশিয়ায় ৩৩ কেজি ও ভারতে ৫৫ কেজি খাদ্য অপচয় করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত কৃষিপণ্য নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ। এটি দেশের কৃষক ও অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। এ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হলে দেশে খাদ্য আমদানির তেমন প্রয়োজন হতো না। অপচয়কৃত খাদ্যশস্য দিয়ে দেশের মানুষকে অনায়াসে প্রায় চার মাস খাওয়ানো যেত। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় রোধকল্পে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের দাবি রাখে। এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। এ সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষের তেমন ধারণা আছে বলে মনে হয় না। কিছুদিন আগে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এ সম্পর্কে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। এর সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ছিল ‘‌খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি শূন্যের পথে’। এটি আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা। কিন্তু এর বাস্তবতা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে।

বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এর ৫২ বছর পর ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ১১ লাখ টনে। তাতে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে উৎপাদন বেড়েছে। তারপরও আমাদের আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমাদের আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে আছে চাল, গম ও ভুট্টা। তাছাড়া তেল, ডাল, মসলা ও গুঁড়া দুধসহ অনেক কৃষিপণ্য আমরা আমদানি করে থাকি। ২০২১-২২ অর্থবছরে এর মূল্য ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ৬৩ শতাংশ মানুষ পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাবার পায় না। তাতে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। এসবের অন্যতম কারণ খাদ্যপণ্যের বিশাল অপচয়। এর বেশির ভাগ হয় উৎপাদন, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণনের সময়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, আমাদের উৎপাদিত খাদ্যের ২৭ শতাংশই খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে না। মাঠে ফসল নষ্ট হওয়া ও পরবর্তী অপচয়ের কারণে এমনটি ঘটে। দানাদার ফসলের ক্ষেত্রে অপচয় কিছুটা কম। ফলমূল, শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজ, দুধ ও মাছের ক্ষেত্রে অপচয়ের মাত্রা অনেক বেশি। প্রতি বছর প্রায় ২৩ শতাংশ ধান/চাল, ১৭ শতাংশ গম, ২৭ শতাংশ মসুর ডাল, ২০ শতাংশ কলা, ২৯ শতাংশ আম, ২২ শতাংশ আলু, ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ, ২৭ শতাংশ গাজর, ১০ শতাংশ টমেটো, ২৪ শতাংশ শাকসবজি ও ৩৬ শতাংশ মাছ নষ্ট বা অপচয় হয়। বাড়িতে খাবার টেবিলে, নগরীর রেস্টুরেন্টে ও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যে পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয় তা উদ্বেগজনক। গ্রামাঞ্চলে কিছু উচ্ছিষ্ট খাবার হাঁস-মুরগি ও পশুকে খাওয়ানো হয়। শহরের উচ্ছিষ্ট সরাসরি চলে যায় ময়লার ভাগাড়ে। নদীতে ও সমুদ্রের মাছ ধরার সময় জেলেরা অনেক ছোট মাছ পানিতে ছুড়ে ফেলে দেয়। এগুলো পরে মারা যায়। তাতে পরিবেশ দূষণ হয়। আগে অগ্রহায়ণ মাসে জমিতে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কিংবা ইঁদুরের গর্তে থাকা ধান কৃষকদের সন্তানরা জমিয়ে বাড়ি নিয়ে যেত। এখন তেমনটি চোখে পড়ে না। ফলমূলের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে বাজারজাত করতে শোনা যায়। এগুলোয় তেমন স্বাদ থাকে না। অনেক সময় তা ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়। তাছাড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে অসাবধানতা হেতু কিছু শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল গুণগত মান হারায়। তাতে উৎপাদনকারী কৃষক ও দোকানিরা পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না। ফলে তাদের লোকসান গুনতে হয়। বাজার থেকে অতিরিক্ত খাদ্য ক্রয়, দুর্বল খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজের অভাব, বাজারজাতে অকার্যকর অবকাঠামো, অদক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা ও জনসচেতনতার অভাবে আমাদের খাদ্য অপচয় বেশি হয়। অনেক সময় নিজেদের বড়ত্ব দেখানোর জন্যও অনেকে বেশি অপচয় করে থাকেন। সেটা তাদের বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে যখন কোটি কোটি মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগাড় করতে পারে না তখন বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয়ের কথা বিলাসিতা বলে মনে হয়। এর লাগাম টানা দরকার। নতুবা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এমতাবস্থায় খাদ্য অপচয় ও ক্ষতিরোধে সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উপযুক্ত কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে আধুনিক কলাকৌশল গ্রহণের সঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তাদেরকে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।

ইসলাম ধর্মে খাদ্য অপচয় নিষেধ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সূরা আরাফ, আয়াত-৩১)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘‌তোমরা এগুলোর ফল খাও যখন তা ফলবন্ত এবং এগুলোর হক আদায় কর ফসল কাটার দিন। আর তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না’ (আনআম ৬/১৪১)। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদ্য অপচয়কে বর্জনীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। খাবার শেষে তিনি প্লেট ও আঙুল পর্যন্ত চেটে খেয়ে উম্মতের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই যখন আমরা খাবার নষ্ট করি, তখন আমরা ঐশ্বরিক আশীর্বাদকেও অবহেলা করি। মহান আল্লাহর উদারভাবে প্রদত্ত অনুগ্রহের প্রতিও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। বর্তমানে খাদ্য অপচয় আমাদের একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ গরিব-মিসকিনরা দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে গলদঘর্ম হচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় তারা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তাতে তারা সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছে। তাদের দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে সমাজে। কাজেই ধর্মীয়, মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও খাদ্য অপচয় রোধ করতে হবে। এ বিষয়ে উপযুক্ত নীতিকৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)

আরও