বিশ্ব অর্থনীতি

উদীয়মান অর্থনীতির জন্য তিন সতর্ক সংকেত

বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস (জিইপি) প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় বছরে দুবার, যা উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির (ইএমডিই) বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাদের জুন সংস্করণ, যেখানে কিছু সতর্কবার্তা তুলে ধরা হয়েছে। আর এজন্যই সংস্করণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস (জিইপি) প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় বছরে দুবার, যা উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির (ইএমডিই) বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাদের জুন সংস্করণ, যেখানে কিছু সতর্কবার্তা তুলে ধরা হয়েছে। আর এজন্যই সংস্করণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই প্রতিবেদনটি যদি কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে পড়ে, তাহলে সেখানে থাকা দুঃসংবাদগুলো হয়তো তার চোখ এড়িয়ে যাবে, কারণ আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার প্রকাশনার মতোই এটির ওপরেও হালকা চিনির আস্তরণ ছড়ানো। বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব হলো, সতর্ক সংকেতের কারণগুলো কীভাবে এড়ানো যায়, তার দিকনির্দেশনা দান। তবে প্রতিবেদনটির মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের।  

প্রতিবেদনটি তিনটি বিষয় তুলে ধরে। প্রথমত, মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। তবে উন্নত অর্থনীতিগুলো এরই মধ্যে কভিড-১৯-এর টিকা কার্যক্রম দ্রুত ও সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে তাদের আগের প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হলেও উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির অগ্রগতির অবস্থা মূলত অনেকটাই তালগোল পাকানো। 

বর্তমানে এশিয়া আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী ও উদীয়মান বাজার হিসেবে আবির্ভূত। ২০২১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিলেও বিশ্বব্যাংক এ অঞ্চল ঘিরে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে। আকারে বড় এ অঞ্চলের মধ্যে চীন, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের আউটপুট এখন প্রাক-মহামারী স্তরকে ছাড়িয়ে গেছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।

সম্ভাবনাপূর্ণ দেশের কথা বলতে গেলে আমাদের ইন্দোনেশিয়ার দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। তবে তাদেরও মহামারীর অভিজ্ঞতা অনেকটাই মিশ্রিত। দেশটি শুরুতে জোরালো টিকা প্রদান কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে পেয়েছে তারা। তবে এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যেমন শ্রীলংকা (৩ দশমিক ৯ শতাংশ), ভারত (৩ দশমিক ৮ শতাংশ), থাইল্যান্ড (৩ শতাংশ) কিংবা ভিয়েতনাম (শূন্য দশমিক ১ শতাংশ) থেকে এগিয়ে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

তবে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তথাকথিত সর্বজনীন আইন প্রণয়ন করে ইন্দোনেশিয়ার সরকার সম্প্রতি শ্রমবাজার উদারীকরণের মতো কাঠামোগত কিছু সংস্কারের চেষ্টা করে। উদ্যোগটি যদিও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়েছে, তবে অন্য সংস্কারগুলোর সুফল তারা ভোগ করছে বলেই অনুমেয়। প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সরকার কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কমিটি তৈরির মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে মহামারী ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক নীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন; যা তাদের মহামারী নিয়ন্ত্রণের নামে অর্থনীতিকে পঙ্গু করার ভুল সিদ্ধান্তগুলো এড়াতে সক্ষম করেছে। যদিও বেশির ভাগ উদীয়মান অর্থনীতি এ-বিষয়ক কিছু ভুল পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বর্তমানে উভয় সংকটে পতিত।

প্রসপেরার ডেলা তেমেঙ্গা ও তার সহকর্মী সম্প্রতি তাদের এক গবেষণায় তুলে ধরেছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের কারণে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি সমপর্যায়ের অন্যান্য দেশের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক আশা করছে, ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে অগ্রসর হবে। চলতি বছরের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে পৌঁছবে ৫ শতাংশে। তবে তারা একই সঙ্গে অর্থনীতির উচ্চ মধ্যমেয়াদি সম্ভাবনার দিকেও জোর দিয়েছেন।

যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশির ভাগের জন্য মধ্যমেয়াদ শব্দটাই এখন বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। করোনার টিকা বণ্টন-বিষয়ক বৈশ্বিক বৈষম্যের কারণে গরিব দেশগুলোয় একের পর এক করোনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট, যা মোকাবেলার জন্য তাদের আংশিকভাবে হলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম থামাতে হবে।

এমনকি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে থেকেও তুলনামূলক অনগ্রসর দেশগুলো অন্যদের তুলনায় বেশি ভুগছে। কিছু দেশে করোনাপূর্ব সময়ের চেয়ে অতিধনীরা বর্তমানে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বব্যাংক অনুমান করছে, ২০২১ সালে দরিদ্রের সংখ্যা ১৪৩ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬৩ মিলিয়ন হবে। এর মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছিই হবে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতে। ভারতের সমস্যাটি অর্থনৈতিক নয়, তাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও সমস্যাটি হচ্ছে মহামারী মোকাবেলা ও অর্থনীতির দুর্বল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দেশটির ব্যালান্সশিট ক্ষতিগ্রস্ত আর আত্মবিশ্বাস হতাশায় নিমজ্জিত।’

দ্বিতীয় যে বিষয়টা নিয়ে বিশ্বব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। ‘উদীয়মান মূল্যস্ফীতির চাপ কি বিপদের কারণ?’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাসে দীর্ঘ একটি অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে আলোকপাত করা হয়েছে অনেক বিষয়ের ওপর। যারা অধ্যায়টি পড়েছেন তারা সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি ব্যবহার করা হয়েছে আঘাতের মাত্রা হালকা করার জন্য। এখানে ‘প্রশ্নবোধক’ চিহ্নের বদলে ‘বিস্ময়’ চিহ্নের ব্যবহারটা হতো অনেক বেশি উপযুক্ত।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে তারা খুব সামান্যই জানেন। মূল্যস্ফীতির ফলে যখন দাম বাড়তে শুরু করে, আমরা তখন অতিরিক্ত সতর্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো বেশি খারাপ করে তুলি। বর্তমান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মন্দা চলাকালীন মূল্যস্ফীতি সাধারণত হ্রাস পায়। কিন্তু গত অর্ধশতাব্দীর পাঁচটি বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে বর্তমান মহামারী-প্ররোচিত মন্দার সময় মূল্যস্ফীতির হ্রাস ঘটেছে সবচেয়ে নিঃশব্দে। উপরন্তু, পূর্ববর্তী মন্দার পর চলতি বছরের মে মাস থেকে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। 

বৃহৎ আর্থিক সংমিশ্রণের কারণে ঘটা মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক বৃদ্ধি হচ্ছে এককালীন সামঞ্জস্য—এমনটাই বলছে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও সত্যিটা হলো, কেউই আসলে তা জানে না। উন্নত অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি অব্যাহত থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠোর আর্থিক নীতি গ্রহণ করতে পারে। ফলে উন্নত অর্থনীতিতে উচ্চ মূলধনপ্রবাহ আর উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটতে পারে; যা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য বিধ্বংসী প্রভাবসহ এটি বড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

তৃতীয় যে বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংক তাদের ওই প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করেছে, তা হচ্ছে বাণিজ্য। আকর্ষণীয় আলোচনার এক পর্যায়ে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ এবং অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো বাণিজ্যের উচ্চব্যয় এবং যার মধ্যে কয়েকটি বেশ অপ্রয়োজনীয়ও। মোট বাণিজ্য খরচের মধ্যে শুল্ক ব্যয় মাত্র ১৪ ভাগের এক ভাগ। আর বাকি অর্থ যায় রসদ সরবরাহ, আমলাতন্ত্র, পরিবহন আর দুর্নীতির ঘরে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে যে দামে পণ্য বিক্রি হয়, অন্য দেশে ওই একই পণ্য দ্বিগুণ দামে বিক্রি করতে হয়।

উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি উপলব্ধি করে রফতানি সম্ভাবনা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের জিইপি প্রতিবেদনটি পরামর্শ দিচ্ছে, মহামারীর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যয়ের বিষয়টি যখন অপরিহার্য, সেক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য ব্যয়ের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধনপূর্বক অসম বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত দরিদ্র দেশগুলোকে ন্যূনতম সমর্থন সরবরাহ করা যেতে পারে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও