করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচাতে , কৃষি উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে, বাজার ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করতে এবং ভেঙ্গেপড়া যোগান শৃঙ্খল পুনর্গঠিত করতে কৃষি ঋণের কোনো বিকল্প নেই। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবেনা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, করোনার কারণে পৃথিবীতে বাইবেলে বর্ণিত দুর্ভিক্ষের মতো বড় দুর্ভিক্ষ হতে পারে।মারা যেতে পারে বহু লোক। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাত্র দেড় মাসে দেশের কৃষদের ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক পরিচালিত ‘ কৃষি খাত ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর করোনার প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণায় আর্থিক ক্ষতির এই তথ্য উদঘাটিত হয়েছে।
কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তাই সরকার ৪ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষীসহ অন্যান্য কৃষকদের এবং ফুল, ফল, মৎস্য চাষি, ডেইরি ও পোল্ট্রি খামারিদের ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ প্রদানের এক যুগপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই এবং এর সময় মতো সঠিক ও পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি।
সরকার ঘোষিত কৃষি ঋণ প্রণোদনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে। নীতিমালা অনুযায়ী, কৃষকের প্রণোদনা দিতে ঋণ গ্রহিতার যোগ্যতা ও সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।কৃষিকাজে সরাসরি নিয়োজিত প্রকৃত কৃষক; ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষীসহ অন্য কৃষকদের সহজ পদ্ধতিতে একক বা দলবদ্ধভাবে এবং পল্লী অঞ্চলে আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের এই ঋণ প্রদান করা হবে। ফসল উৎপাদনের জন্য একজন কৃষকে সর্বোচ্চ ১৫ বিঘা জমিতে জামানতবিহীন ফসল দায়বন্ধনের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রচলিত শর্তে ঋণ দেয়া হবে। ধান, গম, ডাল, তেলবীজ, শাক-সবজি, মশলা, ফল, ফুল, কন্দাল ও অর্থকরী ফসল ,কৃষিযন্ত্রপাতি, সেচযন্ত্র, বীজ উৎপাদন, শস্যগুদাম ও বাজারজাতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও উৎপাদমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত কৃষকদের এই ঋণ দেয়া হবে। কৃষকদের ঋণ প্রাপ্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কৃষি অফিস প্রাঙ্গনে ঋণের তথ্য সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শনের জন্য কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠিতে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সরকার অতীতে আমদানি নির্ভর ভুট্টা, ডাল , তেল ও মশলা জাতীয় ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে কৃষি ঋণ প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এক শ্রেণীর ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের অসহযোগিতা এবং অনীহার কারণে সেই কর্মসূচি আলোর মুখ দেখেনি। ৪ শতাংশ সুদে দেশের ৪ শতাংশ কৃষক ও ঋণ পেয়েছে কি না - এ ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমি দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ ও নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের কৃষি বিভাগে কর্মরত ছিলাম। বাংলাদেশে দিনাজপুর জেলায়ই সবচেয়ে বেশি ভুট্টার চাষ হয়। আমি সেখানে বহু ভুট্টা চাষির কাছ থেকে শুনেছি, তারা ৪ শতাংশ সুদে ভুট্টা চাষের জন্য কোনো কৃষি ঋণ পাননি। নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে প্রতিবছর ২৫ থেকে ২৬ হাজার একর জমিতে আখের চাষ হয়। আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে ৫ থেকে ৬ হাজার একর জমিতে চাষ করা হয় মসুর। আমি সেখানেও বহু কৃষককে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি, তারা মসুর চাষের জন্য ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ পাননি।তা হলে আমরা কীভাবে বিশ্বাস করবো- এ বছর কৃষক সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে ৪ শতাংশ সুদে ফসল চাষের জন্য কৃষি ঋণ পাবেন?
সামনে আমন মৌসুম। উৎপাদিত চালের ৩৮ শতাংশ আসে আমন থেকে। আমন ধানের উৎপাদন খরচ কম। সেচের তেমন প্রয়োজন হয়না। ২০১৮-১৯ আমন মৌসুমে ৫৬ দশমিক ২২ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ২ দশমিক ৫ টন। এবার আমন মৌসুমে ৫৯ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধাার্য্য করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০১৮-১৯ বছরের চেয়ে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর বেশি জমিতে আমনের চাষ করে ১৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বেশি চাল উৎপাদন করতে হবে।
এজন্য আমনের ফলন বেশ বাড়াতে হবে। আমনের ফলন বাড়াতে হলে সঠিক জাত, সঠিক বয়সের চারা সঠিক সময়ে রোপণ, সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে সেচ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে জানা যায়, বোরো ধান কাটার পর পল্লী বিদ্যুত কর্তৃপক্ষ সেচ যন্ত্রের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় । ফলে আমন মৌসুমে কৃষক ধানের জমিতে সম্পূরক সেচ দিতে পারেন না। এ কারণে আমনের কাঙ্খিত ফলন পাওয়া যায় না। তাই বোরো ধান কাটার পর বিদ্যুৎ সংযোগ যাতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিচ্ছেদ না করে- এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশে বড় কৃষকের সংখ্যা মোট কৃষকের শতকরা ২ভাগ, মাঝারি ১৮ ভাগ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগ। এই ৮০ ভাগ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকই কৃষির মূল চালিকা শক্তি।করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেহলে তাদেরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট( ইফপ্রি) বলছে, এনজিও , আত্মীয়স্বজন, বেসরকারি ব্যাংক ও দাদন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে কৃষক ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ গ্রহণ করেন। এই সব ঋণের সুদ ১৯ থেকে ৬৩ শতাংশ। আর সরকারের কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে যে কৃষি ঋণ দেয়’ তারপরিমাণ মাত্র ৬ শতাংশ। এ থেকেই বুঝা যায়- সিংহভাগ কৃষক সরকারি বিশেষায়িত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি থেকে ফসল চাষের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ পান না। অন্যদিকে বর্গচাষি, ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষিদের সরকারি ব্যাংকের কৃষি ঋণে কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান রোপণের জন্য একরে ৬ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। প্রতিকেজি বীজের দাম ৩০০ থেকে ৪০০টাকা। বীজ ছাড়াও ধান চাষের জন্য জমি তৈরি, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ , আগাছা দমন, পোকামাকড় রোগবালই দমন, কাটা ও মাড়াই প্রভৃতি কাজে একর প্রতি ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকার প্রয়োজন পড়ে। তাই আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ৫৯ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করতে হলে চাষির হাতে বীজতলায় বীজ বপনের আগেই অর্থাৎ ৩০ জুনের ( ১৫ আষাঢ়) মধ্যেই কৃষি ঋণের অর্থ পৌঁছে দিতে হবে। এ কাজে যত বিলম্ব হবে আমনের আবাদ ততই পিছিয়ে যাবে এবং ফলনও কম হবে।কারণ আগষ্টের ১৫ তারিখের পর আমনের চারা রোপণ করলে প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায় না।
সরকার ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে ৪ শতাংশ সুদে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে যে ঋণ বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা সফল করতে হলে এই ঋণ ফসল ভিত্তিক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ভিত্তিক বিভাজন করে দিতে হবে। এছাড়া কোন ইউনিয়নে, কোন ওয়ার্ডে কোন ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিবে তাও নির্ধারণ করতে হবে । ফসল ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ ঋণ গ্রহণকারী প্রকৃত কৃষকদের তালিকা করে উপজেলা কৃষি কর্মকতা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলিতে প্রদান পূর্বক সহায়তা করতে পারেন। ব্যাংক কৃষিঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রেরিত নীতিমালা অনুসরণ পূর্বক সময় মতো কৃষকদের মধ্যে ফসল ভিত্তিক কৃষি ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করবে। পাক্ষিক উপজেলা কৃষি উন্নয়ন সভায় কৃষিঋণ বিতরণ অগ্রগতি মূল্যায়ণ পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ওই সভায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে হবে। এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয় অর্থমন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাতে পারে। শুধু উপজেলা নয়, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষি ঋণ বিতরণ অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ণ করতে হবে।
বীজের অভাবে এবার পাটের চাষও করতে পারেনি অনেক কৃষক । যেটুকু জমিতে আবাদ হয়েছে , সেটুকুর পরিচর্যার করার জন্য অর্থ নেই তাঁদের হাতে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ২৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ও ২৭ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ২ হাজার কোটি । করোনার কারণে সবজি চাষিরা এবার বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হন। বর্তমানে খরিপ মৌসুমের প্রায় সব সবজিই মাঠে রয়েছে । এসব সবজি চাষ করে করোনার কারণে কৃষক উপযুক্ত মূল্য পাননি। তাদের অনেকে টাকার অভাবে সবজি ক্ষেতের পরিচচর্যা করতে পারছেন না। তাই সবজি উৎপাদনের অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে তাদেরকেও এমুহুর্তে ৪ শতাংশ সুদে কৃষি ঋণ দিতে হবে।ঋণ দিতে হবে কৃষি পণ্যের ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ীদেরকেও।এছাড়া যারা বিদেশ থেকে কর্ম হারিয়ে গ্রামের বাড়ি ফিরবেন তাদেরও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি ঋণের প্রযোজন রয়েছে।
মনে রাখতে হবে-এটা স্বাভাবিক সময় নয়। দেশে করোনার মতো মহামারি চলছে। কৃষকের হাতে নগদ অর্থ নেই। সে সময় মতো ঋণ না পেলে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক কিনবেন কি দিয়ে? আর কোথা থেকেই দেবেন কৃষি শ্রমিকের মজুরি? তা ছাড়া জমি থেকে সবজি তোলা, পরিস্কার করে বাজারে নিয়ে আসার খরচই যোগাবেন কোথা থেকে? এ সময়ে সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীগণও বাকিতে কৃষকদের উপকরণ সরবরাহ করবেন না। আত্মীয়স্বজনরাও ধার-কর্জ দেবেন না। এ বিষয়গুলো কৃষি ঋণ বিতরণের সাথে সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখা উচিত, কৃষকেরা শরীরের রক্ত পানি করে খাদ্য উৎপাদন করে আমাদের অন্ন যোগায়। ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ নিয়ে তারা বিদেশে পাড়ি জামাবেন না। বহুতল ভবন বানাবেন না। গাড়ি কিনবেন না।তারা এই ঋণের টাকা কৃষি কাজে বিনিয়োগ করবেন। উৎপাদন বাড়াবেন। তাই কৃষি ঋণ কারো করুণা নয়, এটা কৃষকের বেঁচে থাকার অধিকার।
লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
ইমেইল: [email protected]