প্রায় দেড় দশক আগে গঠন করা হয় গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ)। ভোক্তাদের দেয়া অর্থে এ তহবিল গড়ে উঠেছে। কেননা ভোক্তা পর্যায়ে যে দামে গ্যাস বেচা হয় সেই দামের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে জমা দেয়া হয়। এ তহবিল গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধিতে নতুন কূপ অনুসন্ধান, পুরনো কূপ সংস্কার, সর্বোপরি গ্যাস খাতের সার্বিক উন্নয়নে অর্থায়ন করা। কিন্তু এসব উদ্দেশ্যের কিছুই পূরণ হয়নি। বিশেষ করে এ তহবিল ব্যয়ে গ্রাহকের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। গ্যাসের মজুদ বাড়েনি, উল্টো তহবিলের টাকা এক প্রকার তলানিতে চলে এসেছে। বর্তমানে জিডিএফে জমা আছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ পেট্রোবাংলার হিসাবে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে জিডিএফ প্রতিষ্ঠার পর ওই বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ৭০৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা জমা হয় তহবিলে। বিগত ১৬ বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও এর প্রায় ৫১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ প্রদান ও এলএনজি কিনতে। অন্যদিকে গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন ও সংস্কারে মোট ৪৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ব্যয় করা হয়েছে কেবল ৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের মজুদ বাড়ানো জরুরি ছিল। কিন্তু এ কাজে তহবিলের টাকা ব্যয় করা হলেও তার কোনো ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তহবিলের টাকা ঋণ হিসেবে বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ভিন্ন কোনো প্রয়োজনে দেয়া হয়েছে। গ্যাস খাতের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ থাকা অর্থ দিয়ে এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। অথচ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন থেকেই গ্যাস আমদানি নিরুৎসাহিত করে আসছিলেন। তাই এতে কেবল তহবিলে অর্থের অপব্যবহার হয়েছে তা নয়, দেশের জ্বালানি খাতের ঝুঁকিও বেড়েছে। অথচ জিডিএফের টাকা গ্যাস খাতের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ ব্যতীত অন্য কাজে ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। যদি ব্যবহার করতেও হয় সেক্ষেত্রে গ্রাহকের মতামত নেয়া আবশ্যক। কেননা গ্রাহকের ব্যবহার করা গ্যাসের বিপরীতে (প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ পয়সা) টাকা এ তহবিলে জমা হয়। এক্ষেত্রে যেমন জিডিএফের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়নি, তেমনি সরকারও নিয়ম পাশ কাটিয়ে এ তহবিলের অর্থ ব্যবহার করেছে।
বর্তমানে এমন ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন যাতে জিডিএফের টাকা ফেরত আনা যায়। নয়তো চলমান গ্যাস সংকটের মতো ভবিষ্যতে গ্যাসের মজুদ বাড়ানোর প্রকল্পে অর্থায়ন সংকট তৈরি হবে। এরই মধ্যে স্থানীয় গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধিতে পেট্রোবাংলা ৫০টি কূপ খননের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যার মাধ্যমে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চলতি বছরের মধ্যে গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া আরো ১০০ কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ২০২৮ সালের মধ্যে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন পড়বে। আর প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেয়ার কথা জিডিএফের। কিন্তু জিডিএফ যদি পেট্রোবাংলা বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া অর্থ ফেরত না পায় তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে বলেই প্রতীয়মান হয়। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো গ্যাসের মজুদ না বাড়ানো গেলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে জ্বালানি খাত। যার বিরূপ প্রভাব পড়বে শিল্প ও আবাসন খাতে। উল্লেখ্য, বিগত চার বছরে গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট স্থানীয় গ্যাসের মজুদ কমে গেছে। দেশে গ্যাস খাতে বর্তমানে সাড়ে আট টিসিএফের কিছু বেশি মজুদ রয়েছে।
জিডিএফের অর্থ যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে এর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা প্রকাশ পায়। তহবিল ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষভাবে হওয়া উচিত ছিল। জনগণের থেকে উত্তোলন করা অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহি বা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকলেও এলএনজি আমদানি বা কোষাগারে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এসব নিয়মকে পাশ কাটানো হয়েছে। জিডিএফ গঠনের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমানো। কিন্তু ঋণের নামে এ তহবিল থেকে টাকা নেয়া হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে উচ্চমূল্যের গ্যাস আমদানি করেছে পেট্রোবাংলা, যা ভোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ঋণের অর্থ তহবিলে ফেরত আসা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, এক প্রকার দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলা যায়। তহবিলে টাকা ফেরত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বণিক বার্তাকে জানানো হয়েছে যে এলএনজি আমদানির জন্য জিডিএফ থেকে যে অর্থ পেট্রোবাংলা ঋণ হিসেবে নিয়েছে, ভবিষ্যতে এলএনজি চার্জ বাবদ আদায়কৃত অর্থ সন্তোষজনক অবস্থায় এলে জিডিএফ থেকে নেয়া অর্থ পর্যায়ক্রমে ফিরিয়ে দেয়া হবে। প্রশ্ন থেকে সন্তোষজনক অবস্থানে না এলে কি সেটা কখনই ফিরিয়ে দেয়া হবে না? অথচ পেট্রোবাংলা যখন বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেয় নিশ্চয় সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্ত থাকে না। নিশ্চিয় চুক্তি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করা হয়। তাহলে গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেন ভিন্ন, সেই জবাবদিহির আওতায় পেট্রোবাংলাকে আনা প্রয়োজন।
২০২২ সালে দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট কাটাতে তীব্র অর্থ সংকটে থাকা পেট্রোবাংলাকে ২ হাজার কোটি টাকা জিডিএফ থেকে ঋণ হিসেবে দেয়ার জন্য অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানায় জ্বালানি বিভাগ। পরে অর্থ বিভাগ এ তহবিল ব্যবহারে সম্মতি দেয়। এ পর্যন্ত এ তহবিল থেকে পেট্রোবাংলা মোট ৬ হাজার কোটি টাকা এলএনজি কিনতে ঋণ নিয়েছে। এর আগে দেশে করোনা মহামারীকালে তীব্র অর্থ সংকটে পড়লে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থার উদ্বৃত্ত তহবিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার আইন করে। এ আইনের আওতায় ২০২১ সালে পেট্রোবাংলা জিডিএফকে নিজের উদ্বৃত্ত তহবিল দেখিয়ে অর্থ বিভাগকে ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়ে দেয়। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দেয়া ৩ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অর্থ বিভাগে দুই দফায় চিঠি দেয়া হলেও কোনো লাভ হয়নি। আইন করে এ টাকা অর্থ বিভাগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে তারা এ অর্থ ফেরত দেবে না। অথচ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা চিন্তা হলেও তহবিল থেকে নেয়া টাকা সরকারের ফেরত দেয়া প্রয়োজন ছিল। মূলত তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা না থাকায় এরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। তাই বর্তমানে কেবল টাকা ফেরত পাওয়াই জরুরি নয়, ভবিষ্যতে তহবিলে টাকার ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও আবশ্যক।