করোনাক্রান্তিতে মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। করোনার ভয়াবহতাকে প্রকৃতি ধ্বংসের ফল হিসাবে মনে করছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে বলছেন, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমাদের কৃতকর্মের ফল আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতি। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই বিচার করা হচ্ছে বিশ্বধরিত্রিকে। প্রকৃতি সবাইকে নিয়ে বাঁচার শিক্ষা দেয়, এখানে প্রতিশাধ নেয়ার প্রশ্নটাই অবান্তর।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর তারিখটি মনে আছে নিশ্চয়ই। প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় সিডরের ধাক্কায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। ওই সময় নিজের বুক পেতে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে সুন্দরবন। কত হাজার কোটি টাকা সুন্দরবন বাঁচিয়েছে সে হিসাব না হয় বাদই দেয়া গেল, কত হাজার মানুষকে সুন্দরবন বাঁচিয়েছে সে হিসাব কি কখনো আমরা কষেছি?
সিডরের পর উপদ্রুত অঞ্চলে পৌঁছানো প্রথম কয়েকজন সাংবাদিকের একজন ছিলেন সজল জাহিদ (বর্তমানে একটি ইংরেজি দৈনিকে কর্মরত)। সম্ভবত সিডরের দুদিন পর আমার কথা হয়েছিল সজলের সঙ্গে। খুব ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে সজল যা বলেছিল তার সারকথা- ‘দাদা, মনে হচ্ছে সব সমান, ধুঁ-ধুঁ মাঠ।’ শঙ্কিত সজলের প্রশ্ন ছিল, ‘সুন্দরবন কি আবার আগের মত দাঁড়াবে? আর একটা সিডর আসলে আমাদের কি হবে?’ সুন্দরবন দাঁড়াতে কতদিন সময় নিয়েছে?
ঘেড়ের চিংড়ি চাষ বন্ধ নাই। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাতে বিরামহীন গতিতে চলছে শিল্প কল-কারখানা নির্মাণ। আমরা মানে মানুষেরা সুন্দরবনের অবদান ভুলে গেছি কিন্তু সুন্দরবন ঠিকই দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রতিশোধ মানুষের তৈরি শব্দ। যুগ যুগ ধরে পাল্লা দিয়ে অযৌক্তিকভাবে জীব-প্রাণ বিনাশ করে চলেছি আমরা। আমাদের সেই কৃতকর্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতি। কিন্তু আমরা শিক্ষা নিতে পারি না। প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব খাটাতে হয়ে উঠি মরিয়া।
প্রকৃতি আমাদের পথ দেখায়, শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমরা নিজের অহংবোধে তাড়িত হই। থোড়াই কেয়ার করি সবকিছু। নিজেদের তৈরি করা ফাঁদে আটকে যাই নিজেরাই। কৃতকর্মের ফল মানুষ কীভাবে ভোগ করে- তার দু’একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যাক।
মশা আমাদের দেশের প্রধানতম সমস্যাগুলোর একটি। প্রাণঘাতি ডেঙ্গু জীবাণুবাহক ছাড়াও অনেক ভয়াবহ জীবানুর বাহক মশা। বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের ক্যারিয়ার পর্যন্ত শেষ করে দিয়েছে মশা (!)। মশার সঙ্গে যুদ্ধে কামান দাগার আগে আমরা ভুলে যাই যে আমরা ব্যাঙ প্রজাতিকে একরকম শেষ করে দিয়েছি। স্কুল পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম, ব্যাঙ ‘প্রাকৃতিক কিটনাশক’। ফসলের জমি, ডোবা-নালা , ঝোপ-জঙ্গলে পর্যাপ্ত ব্যাঙ থাকা মানে ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ, পোকামাকড় আপনাতেই দমন হয়ে যাওয়া। শস্যক্ষেতের পামরি পোকা, মাজরা পোকা কিংবা ক্ষতিকর পাতা ফড়িং খেয়ে ব্যাঙ সাবাড় করে দেয়। আমাদের কল্যাণে (!) ব্যাঙ হারিয়ে যেতে বসেছে। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে অতিমাত্রায় কিটনাশকের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠোছ আমরা। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে ‘প্রাকৃতিক লাঙ্গল’ বিবেচিত কেঁচোও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। মানুষ তার নিজের উদ্ভাবনে এতই উন্নাসিক যে প্রকৃতির বাকি সবকিছুকে অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা করে।
বিশ্বপ্রকৃতি যে সবাইকে নিয়ে চলতে চায় সেটা অনুধাবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাকানো যাক স্তন্যপায়ী প্রাণী বাদুড়ের দিকে। দেড় থেকে দুশ প্রজাতির ভাইরাস বহন করে এই বাদুড়। বলা বাহুল্য মানুষের শরীরের জন্য বেশিরভাগ বিপজ্জনক ভাইরাস আছে বাদুড়ের দেহে। আমাদের মানুষের বিনাশ নীতি অনুযায়ী, বাদুড় প্রজাতিকে শেষ করে দাও! প্রকৃতির হিসাবটা কিন্তু আলাদা। মনে রাখতে হবে, একটা বাদুড় কিন্তু প্রতিরাতে তার দেহের প্রায় সমান ওজনের কীট পতঙ্গ খায়। এর মধ্যে আছে ডেঙ্গু, জিকা, ম্যালেরিয়ার ভাইরাসবাহিত মশাও। প্রায় পাঁচশ প্রজাতির উদ্ভিদের পরাগায়ণ ঘটায় এই বাদুড়।
ক্রমউষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর ফুঁসফুঁস বিবেচিত আমাজান পুড়ে ছাই হচ্ছে। মানুষ কীভাবে নিজেই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে- তার একটা দৃষ্টান্ত এই আমাজান। বলা হয়ে থাকে প্রতি মিনিটে একটি ফুটবল মাঠের সমান জঙ্গল কাটা হয় আমাজানে। বিপজ্জনকভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে মানুষ, ওজোনস্তর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে মানুষের জন্য, বন উজাড় করছে মানুষ, মানুষের লোভের বলি হয়ে প্রতিদিনই বিলুপ্ত হচ্ছে প্রকৃতির কোন কোন না প্রাণ। প্রকৃতির সাজানো বাগান প্রতিনিয়ত তছনছ করছি আমরা। আর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া মাত্রই ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ বলে আবারও প্রকৃতিকেই কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছি।
বন্যা আমাদের নিয়মিত দুর্যোগ। বন্যায় প্রতিবছর ঘরবাড়ি ভেসে যায়, জীবন-শস্যহানিও ঘটে, ভোগান্তি ওঠে চরমে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বন্যা শুধু দুকূল ভাসিয়ে ভোগান্তিই আনে না। সঙ্গে কিন্তু নিয়ে আসে পলিমাটিও। ঊর্বরা পলিতে ক্ষেত উপচে পড়া ফসল ঘরে তোলে মানুষ।
ধ্বংসের মধ্যেই সৃষ্টির আগমনী বার্তা নিশ্চিত করে প্রকৃতি। বিশ্বপ্রকৃতির এই সাজানো সংসারে ত্রুটি - বিচ্যুতি ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পৃথিবী’ কবিতায় লিখেছেন,
তোমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম
ফলে শষ্যে তার জয়মাল্য হয় সার্থক।
জলে স্থলে তোমার ক্ষমাহীন রণরঙ্গভুমি
সেখানে মৃত্যুর মুখে ঘোষিত হয় বিজয়ী প্রাণের জয়বার্তা।
তোমার নির্দয়তার উঠেছে সভ্যতার জয়তোরণ
ত্রুটি ঘটলে তার পূর্ণ মূল্য শোধ হয় বিনাশে।
লেখক: সাংবাদিক