পর্যালোচনা

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন শিক্ষায় সতর্কতা

সারা বিশ্বের মতো করোনার ভয়াল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত এ দেশ। দেড় লাখেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত। চারদিকে কেবল মৃত্যুসংবাদ। মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। নষ্ট হয়ে গেছে সামাজিক বন্ধন। মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। এমন ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা শুরু করেছে মানুষ। স্বাভাবিক কার্যক্রম সীমিত পরিসরে হলেও শুরু হচ্ছে। অন্য সব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম

সারা বিশ্বের মতো করোনার ভয়াল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত এ দেশ। দেড় লাখেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত। চারদিকে কেবল মৃত্যুসংবাদ। মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। বাড়ছে বেকারত্ব, বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। নষ্ট হয়ে গেছে সামাজিক বন্ধন। মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। এমন ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা শুরু করেছে মানুষ। স্বাভাবিক কার্যক্রম সীমিত পরিসরে হলেও শুরু হচ্ছে। অন্য সব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম শুরু করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করেনি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনার শুরু থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এরই মধ্যে কিছু দেশ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে দূরশিখন ও অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে। আমাদের দেশেও এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম কিছু ক্ষেত্রে চালু হয়েছে। সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের চেষ্টা করা হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনলাইনে ক্লাস নেয়া বা না-নেয়া নিয়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনার কারণে।

প্রথম দূরশিখনের কোর্সের সূত্রপাত হয় ইংল্যান্ডে স্যার আইজ্যাক পিটম্যানের হাত ধরে, ১৮৪০-এর দশকে। তিনি পোস্টকার্ডের মাধ্যমে শর্টহ্যান্ড শিক্ষা দিতেন, আবার শিক্ষার্থীরা যেসব শর্টহ্যান্ড করে পাঠাত, তিনি সেটার ফিডব্যাক দিতেন; যা পরবর্তীতে স্যার আইজ্যাক পিটম্যান কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কোর্স হিসেবে সারা ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর ক্রমান্বয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অল্পবিস্তর দূরশিখন প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। রেডিও, টেলিভিশনের আবিষ্কারের পর দূরশিখন পদ্ধতি প্রসার লাভ করে। আর ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর এই শিখন খুবই জনপ্রিয় হয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের বিশেষ চাহিদার কথা বিবেচনা করে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন কোর্স এমনকি ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্বল্প খরচে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে ডিগ্রি লাভ করা যায় বিধায় এ শিখন পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমেও অনলাইন শিক্ষার ধারণা থেকে ব্লেন্ডেড লার্নিং তথা শ্রেণীকক্ষ ও অনলাইন দুটোর মিশ্রণে শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে কেবল অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা বিদ্যমান। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাঙ্গন ও শ্রেণীকক্ষের মানবীয় ও ভৌত উপাদানগুলোর উপস্থিতি যেভাবে শিখনকে আকর্ষণীয় ও স্থায়ীকরণে ভূমিকা রাখে, তা অনলাইনে অনুপস্থিত। আবার শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় অংশীদারিমূলক পদ্ধতিসহ বেশির ভাগ পদ্ধতিই এক্ষেত্রে অকার্যকর। তবে করোনার কারণে এখন বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে হবে। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো—এ প্রবাদ মেনে নিতেই হবে। ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কবে খুলবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেশনজট এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, যদি তা আরো দীর্ঘায়িত হয় তবে কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। তাই বিকল্প শিখন হিসেবে অনলাইনের প্রতি ইউজিসি জোর দিচ্ছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও অনলাইনে ক্লাস নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে বেশকিছু সমস্যার কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো তা তেমনভাবে শুরু করতে পারছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৭৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী নন। এটি কিন্তু অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক বড় রকমের মনস্তাত্ত্বিক বাধা। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন শিখন পদ্ধতির সঙ্গে তেমনভাবে পরিচিত নয়। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার প্রধানতম শর্ত হলো, স্মার্টফোন অথবা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্লাস করার উপযোগী উপকরণ নেই এবং ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৩৮ শতংশের স্মার্টফোন নেই। এগুলো হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৯-এর তথ্যানুযায়ী, মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িতে কম্পিউটার রয়েছে। ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। বিভাগীয় ও জেলা সদরগুলোয় প্রয়োজনীয় ওয়াই-ফাই বা ব্রডব্যান্ড সুবিধা থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ডাটা ছাড়া ইন্টারনেটের সুবিধা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। গ্রামের দিকে ইন্টারনেটের গতি খুবই ধীর, ফলে অনেক সময়ই ভয়েস এলেও ভিডিও আসে না। নেটওয়ার্কের জন্য গাছে ওঠার মতো বহু ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা তো নিত্যনৈমিত্তিক। অনলাইন ক্লাস শুরু করার পর এ রকম সমস্যায় পড়লে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বেড়ে যাবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট প্রবেশগম্যতা থাকলেও ইন্টারনেট প্যাকেজের উচ্চমূল্য তাদের অনলাইন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সাধারণত মধ্যবিত্ত বা তার ওপরের শ্রেণীর বিধায় তারা এই ব্যয় যেভাবেই হোক চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। এমনিতেই করোনার কারণে দরিদ্রতার হার বেড়ে গিয়েছে। এ অবস্থায় অনলাইন শিক্ষার জন্য ইন্টারনেট ব্যয় গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো হবে তাদের জন্য। আশার কথা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সঙ্গে ইউজিসির মিটিংয়ে উপাচার্যরা বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ইন্টারনেটসেবা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ইউজিসি জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ নিয়ে তাদের কথাবার্তা চলছে। ইন্টারনেট সরবরাহ করলেই হবে না, নেটওয়ার্কেরও নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী আছেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছেন, যারা পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করছেন। এসব অঞ্চলে নেটওয়ার্কের অবস্থা আমরা সবাই জানি। তাই গতিশীল নেটওয়ার্কের নিশ্চয়তাও দিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিভাইস। ইউজিসির গবেষণা অনুযায়ী যে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশের স্মার্টফোন নেই, তাদের তা সরবরাহ করা যেতে পারে। অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার জন্য বিশ্বের অনেক দেশে ফেরত দেয়ার শর্তে ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে। আমরা ল্যাপটপ, কম্পিউটার সরবরাহ করতে না পারি, ফেরত দেয়ার শর্তে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে স্মার্টফোনের ব্যবস্থা করতে পারি।

ইন্টারনেট ডাটা, নেটওয়ার্কের নিশ্চয়তা, ডিভাইস সরবরাহ করার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের রূপরেখাও প্রণয়ন করতে হবে। প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, বিজ্ঞানসহ যেসব বিষয়ে ল্যাব ও ব্যবহারিক ক্লাসের দরকার, সেগুলো কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, সেটা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। আবার যেসব শিক্ষার্থী ইন্টার্ন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ছয় মাস স্কুলটিচিং করতে হয়। এখন যেসব ব্যাচ স্কুলটিচিংয়ে ছিল, তাদের যদি কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়, তবে তারা কিন্তু বঞ্চিত হবেন। তাই এ বিষয়টিও ভেবে দেখা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভার্চুয়াল পেডাগজির প্রশিক্ষণ অনেক শিক্ষকেরই নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে শিক্ষকদের ভার্চুয়াল পেডাগজির প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া এ-সংক্রান্ত উপকরণাদিও সরবরাহ করতে হবে। একটা কথা সত্যি, করোনা যদি আরো বেশি সময় ধরে অবস্থান করে, তবে আমরা শুধু শুধু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। জীবনের জন্য সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময়ের অপচয় যেন না হয়, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যেন সময় ঝরে না যায়, সেজন্য অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোই এখন পর্যন্ত প্রধান বিকল্প। তবে অবশ্যই সব শিক্ষার্থীকে অনলাইন শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং এজন্য যাবতীয় উপকরণ ও সুযোগের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করলে শিক্ষাবৈষম্য সৃষ্টি হবে। ইউনেস্কোর একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় যেখানে শিক্ষাবৈষম্য বেশি, সেসব দেশে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিমাণও বেশি। আমরা যদি সবার জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত না করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করি, তবে আগামীতে দেশে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও বৈষম্য কেমন রূপ ধারণ করবে তা সহজেই অনুমেয়। 

 

ড. মাহবুব লিটু: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরিফুর রহমান: শিক্ষক, আইইআর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও