জাতীয় দুর্যোগের সময়, বিবেকের অভিভাবকত্ব জরুরি। সংকট থেকে উত্তরণ আমাদের সবার প্রত্যাশা। দ্বিধাহীনতা, উসকানি, বল প্রয়োগ কোনো সমাধান নয়। হত্যা, জাতির ক্ষয়, রাষ্ট্রের ক্ষতি। পাশবিকতা মানুষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। ভবিষ্যতের ও সামনের দিকে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি হত্যায় মানবিকতার পরাজয় ঘটে। বিভাজন জাতীয় অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দেয়। আজ আমাদের সবক্ষেত্রেই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভাজনের এ বিচ্ছিন্নতা আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রাপথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এ বিপদসংকুল পথ কারো কাম্য হতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন আমাদের খর্ব করছে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। অস্তিত্ব বিলীন হচ্ছে। পারস্পরিক সমঝোতাবোধ লোপ পাচ্ছে। শক্তির উন্মত্ত প্রকাশ নিজেকে ছোটই করছে। স্বল্পমেয়াদে নিজেকে জয়ী ভাবার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে পরাজয়ের শামিল। রাজনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতার একটি কলা (আর্ট অব নেগোশিয়েশন)। রাজনীতির মাহাত্ম্য হচ্ছে বিবাদমান বিভিন্ন গোষ্ঠি নিজেদের মধ্যে কীভাবে নেগোশিয়েশন করে। কিন্তু সেই ধরণের রাজনীতির যদি অপমৃত্যু ঘটে তাহলে রিরাজনীতিকরণের সৃষ্টি হয়।
যুবসমাজ ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সর্বশেষ পাঁচ বছরের হিসাবে স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব দ্বিগুণ হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এ দেখা যাচ্ছে, ২০১৬-১৭ পরবর্তী পাঁচ বছরে স্নাতক পর্যায়ের (টারশিয়ারি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্ব হার দ্বিগুণ বেড়ে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ। প্রতি পাঁচ যুবতীর মধ্যে তিনজনই কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে নেই। অর্থাৎ ৬০ শতাংশ নারীই আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাইরে। বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০ অনুযায়ী, ১৫-২৪ নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ কর্মে, শিক্ষায় ও প্রশিক্ষণে নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এ বয়সী যুবক-যুবতীদের ২১ দশমিক ৭ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষায় ছিল না। ১৫-২৪ বছরের যুবক-যুবতী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাংলাদেশে ৩ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ এ বয়সী যুবক-যুবতী কোন ধরনের কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গন্তব্য তারা জানে না। তাদের কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। এ শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়, জাতির জন্যও এক বড় অপচয়। এ শ্রমশক্তি বাংলাদেশকে জনমিতিক লভ্যাংশ দিতে পারত। কিন্তু আমরা দেখছি সামাজিক অসন্তোষ, অস্থিরতা এবং সহিংসতার এ দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নড়বড়ে। এ অবস্থায় স্থিতিশীলতার বড়ই প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে ঘর-গৃহস্থালি, ব্যবসা এবং রাষ্ট্রের আয় কমছে, দায় বাড়ছে। দেশীয় ও বৈদেশিক সঞ্চিতিতে বড় টান পড়েছে। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নে বৈদেশিক লেনদেন ক্রমাগত কমছে।
কাঁচামাল ও ইউটিলিটি সার্ভিস বা পরিষেবা যেমন জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম অর্থনীতিকে সংকুচিত করছে। রাষ্ট্রের আয় কমে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দেয়ার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। এ প্রলম্বিত দাম বৃদ্ধির কাঁধে সরবরাহ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলায় অধিকাংশ মানুষের ওপর আরো চাপ নেমে আসছে। অর্থনীতি, বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ অনেক দিন ধরেই স্থবির। অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ কর্মনিয়োজনই অনানুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের দিক থেকে বিশ্বের নিচের দিকের ১০ দেশের তালিকায় অবস্থান বাংলাদেশের। বিবিএসের জরিপে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ৬০ দশমিক ৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মে নিয়োজিত। এমনিতেই তাদের অধিকার নেই, দুর্যোগকালে তাদের ওপর বড় ধরনের অভিঘাত পড়ে। কভিডকাল থেকেই প্রান্তিক চাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কঠিন জীবনযাপন করছেন। তাদের ঋণ বেড়ে যাচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফও) হিসাব অনুযায়ী, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২-৩ শতাংশ বেড়েছে। বৈষম্য বেড়ে গেছে। জবাবদিহিতার অভাবে পিয়নও ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করছে। এ ধরনের অনেক দুর্নীতির চিত্র দৃশ্যমান হচ্ছে। জবাবদিহিতাহীনতার এ সংস্কৃতি সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। রাহুর গ্রাস ভর করেছে।
এ সময় বিভাজনের নয়। এ সময় বিবেককে জাগ্রত করার সময়। আপামর জনতা যৌক্তিক দাবিতে সব সময়ই নিজেকে যুক্ত করেছে। এবারো তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বল প্রয়োগ বিভাজিত করে, নিজের পরাজয় ঘটায়। একগুঁয়েমি স্বাভাবিকতা নয়। চলমান সংকটের সমাধান সম্ভব। সংহতি সামনের বাংলাদেশের রূপান্তরের পথ। মৃত্যুর মিছিলের অমাবশ্যা কবে থামবে?
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়