বাংলাদেশকে আমরা সাধারণত একটি তরুণ ও প্রাণবন্ত দেশ হিসেবেই দেখি। কয়েক দশক ধরে আমাদের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে যথার্থভাবেই মা ও শিশু, কিশোর-কিশোরী ও যুবসমাজ, কর্মসংস্থান এবং জনমিতিক লভ্যাংশ গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু নীরবে আমাদের সমাজকে বদলে দিচ্ছে আরেকটি গভীর জনমিতিক পরিবর্তন—বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমেই বয়স্ক হচ্ছে। প্রশ্নটি এখন আর এই নয় যে জনসংখ্যার বার্ধক্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বিষয় হয়ে উঠবে কিনা। এটি এরই মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এখন মূল প্রশ্ন হলো: আমরা কি এর জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছতে পারে—অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশীর একজন হবেন প্রবীণ। এটি শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়; পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে।
এ জনমিতিক পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গল্পও রয়েছে। বাংলাদেশীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচছেন। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যেখানে গড় আয়ু ছিল ৫০ বছরেরও কম, সেখানে তা এখন প্রায় ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে প্রজনন হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—সত্তর দশকের শুরুতে একজন নারীর গড়ে প্রায় সাতটি সন্তান থেকে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তা প্রায় দুটিতে নেমে এসেছে। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং সামগ্রিক উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতিরই প্রতিফলন এ পরিবর্তন। দীর্ঘায়ু নিঃসন্দেহে উন্নয়নের একটি বড় অর্জন। কিন্তু দীর্ঘ জীবন যেন মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়—সেটি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি অর্জন, নতুন দায়বদ্ধতা: প্রবীণ মানুষকে কেবল সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি ও নানা-নানি; তারা কর্মজীবী, পেশাজীবী, কৃষক, শিক্ষক, সমাজনেতা এবং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির ধারক। জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও তাদের অনেকেই পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ, শারীরিক অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন বাড়তে পারে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে মা ও শিশুস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে বেশি মনোযোগী ছিল; প্রবীণদের জন্য সমন্বিত জেরিয়াট্রিক বা বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। বিশেষায়িত সেবা সব এলাকায় সমানভাবে পাওয়া যায় না। প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সীমিত প্রাপ্যতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে অনেক প্রবীণের জন্য অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বড় সমস্যা—চিকিৎসার আর্থিক বোঝা।
পরিবর্তিত পরিবার, পরিবর্তিত বাস্তবতা: বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারই প্রবীণদের যত্ন ও সহায়তার প্রধান ভিত্তি। বাবা-মা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত। সন্তানরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বার্ধক্যে আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।
কিন্তু বাংলাদেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। নগরায়ণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে ঐতিহ্যগত সহায়তা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই শহরে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে; অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম বা ছোট শহরে প্রবীণ বাবা-মা থেকে যাচ্ছেন সীমিত সহায়তা নিয়ে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে পারিবারিক যত্নের সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এবং আধুনিক জীবনের বাস্তবতার মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।
অনেক প্রবীণ এখনো পরিবারের ভালোবাসা ও সহায়তা পান। কিন্তু দরিদ্র, বিধবা, একাকী বা নিয়মিত পারিবারিক সহায়তাবঞ্চিত প্রবীণদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অনিরাপত্তার ঝুঁকি বেশি। প্রবীণ নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারেন। নারীরা সাধারণত পুরুষের তুলনায় বেশি দিন বাঁচেন; ফলে তাদের অনেককে জীবনের শেষ পর্যায়ে বিধবা, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল বা সামাজিকভাবে একাকী অবস্থায় থাকতে হয়।
গ্রামীণ প্রবীণ নারীরা দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও সীমিত সেবাপ্রাপ্তির মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবীণ পরিচর্যা শুধু পরিবারের ওপর নির্ভর করতে পারে না। পরিবারকে অবশ্যই যত্নের কেন্দ্রে রাখতে হবে, তবে সেই পরিবারকে কার্যকর সরকারি ব্যবস্থা ও কমিউনিটিভিত্তিক সেবার মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে।
নীতি আছে—বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা: প্রবীণদের অধিকার ও কল্যাণে বাংলাদেশ এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় বার্ধক্যজনিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছে। এতে সামাজিক অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, আইনি নিরাপত্তা, আবাসন, গবেষণা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রবীণ নারী, প্রতিবন্ধী প্রবীণ এবং দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে প্রবীণদের বিশেষ প্রয়োজনের বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল ২০১৫ প্রবীণদের একটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে আয়নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
নব্বই দশকের শেষভাগে চালু হওয়া বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রবীণদের কল্যাণে জাতীয় অঙ্গীকারের ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। কিন্তু শুধু নীতি প্রণয়ন করলেই মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে না। সীমিত আর্থিক বরাদ্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়, কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামোর অভাব এবং পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। বয়স্ক ভাতার আওতা সম্প্রসারিত হলেও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সহায়তার পরিমাণ অনেকের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে প্রধান শহরগুলোর বাইরে প্রবীণবান্ধব ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হলে বা আর্থিক সংকট দেখা দিলে আইনি সুরক্ষাও অনেক সময় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়। বাংলাদেশ ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব ও কার্যকর কর্মে রূপ দেয়া।
কল্যাণ থেকে সুস্থ ও সক্রিয় বার্ধক্যের পথে: বার্ধক্যকে শুধু একটি সামাজিক কল্যাণের বিষয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি স্বাস্থ্যসমতা, লিঙ্গসমতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবাধিকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি দান বা সহায়তানির্ভর চিন্তার বাইরে গিয়ে সুস্থ, সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হতে হবে। প্রবীণদের শুধু তাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, তাদের সক্ষমতা ও অবদানের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করতে হবে।
একটি বার্ধক্যবান্ধব বাংলাদেশের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রবীণদের বিশেষ চাহিদার প্রতি আরো সংবেদনশীল করতে হবে। জেরিয়াট্রিক সেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি ও গৃহভিত্তিক পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দরিদ্র ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণরা পিছিয়ে না পড়েন। একই সঙ্গে প্রবীণদের নিয়ে শক্তিশালী জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ও ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা পরিকল্পনা, সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
একটি জাতীয় সংলাপের সময় এখনই: বাংলাদেশের জনসংখ্যার বার্ধক্য কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি এখনই ঘটছে। আমরা প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হলে লাখো মানুষ বার্ধক্যে অপর্যাপ্ত আয়, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর ওপরও পরিচর্যার চাপ বাড়বে।
কিন্তু বাংলাদেশ যদি সময়মতো ও সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে, তাহলে ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ সম্ভব—যেখানে মানুষ শুধু দীর্ঘদিন বাঁচবেন না, ভালোভাবেও বাঁচবেন; যেখানে প্রবীণরা পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন; যেখানে প্রবীণ নারীরা দারিদ্র্য ও বৈষম্য থেকে অধিক সুরক্ষা পাবেন এবং যেখানে প্রবীণ নাগরিকরা জাতীয় ও সামাজিক জীবনে অর্থবহ ভূমিকা পালন করে যাবেন।
আজকের প্রবীণরাই তাদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ দিয়ে আজকের বাংলাদেশ গড়েছেন। আমরা তাদের কীভাবে সম্মান ও যত্ন দিই, তা আমাদের সমাজের মানবিকতার পরিচয় বহন করে।
দীর্ঘ জীবন উন্নয়নের অন্যতম বড় অর্জন। এখন প্রতিটি মানুষ যেন মর্যাদার সঙ্গে বার্ধক্যে পৌঁছতে এবং জীবনযাপন করতে পারেন—তা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন-দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত।
ড. নূর মোহাম্মদ: নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)