এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও ব্যাপক লোডশেডিং। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবাসিক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূল সামুদ্রিক আবহাওয়ার কারণে এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং গ্যাস ও জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও সংকটকে তীব্র করছে। এ সরবরাহ ঘাটতি এখন অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংকট উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ায়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এবং সরকারের প্রতি আস্থাও ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই এটি শুধু একটি সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি নয়; অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করা এবং সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলো মোকাবেলা করা। জনগণের কাছে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে একটি বিশ্বাসযোগ্য কর্মপরিকল্পনাও প্রকাশ করা প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে এ ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি রোধ করবে?
সংকট মোকাবেলায় করতে হবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানির ঝুঁকি কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ।
তাৎক্ষণিক করণীয়
অবশ্যকরণীয় পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জাতীয় জ্বালানি মজুদ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা, ডিজিটাল নজরদারি এবং সঠিকভাবে জ্বালানি বণ্টন।
সরকারের উচিত স্বচ্ছ জাতীয় জ্বালানি মজুদ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। জ্বালানি মজুদ, আমদানি, দৈনিক ব্যবহার এবং বর্তমান মজুদ দিয়ে আর কত দিন চলবে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা। এতে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক কমবে এবং সরকারের প্রতি আস্থা বাড়বে।
আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটলে কয়েক সপ্তাহ সামাল দেয়ার জন্য ডিজেল, পেট্রল, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য জরুরি পেট্রোলিয়াম পণ্যের কৌশলগত মজুদ রাখতে হবে। অর্থনৈতিক ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও প্রতিবেশী দেশগুলোর নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্র বাড়াতে হবে।
জ্বালানি ডিপো ও ফিলিং স্টেশনে ডিজিটাল নজরদারি চালু করলে কতটুকু জ্বালানি আসছে, বিক্রি হচ্ছে এবং মজুদে রয়েছে—এ তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে কালোবাজারি, পাচার ও কৃত্রিম সংকট রোধ করা সম্ভব।
তীব্র সংকটে অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় গ্যাস ও জ্বালানি বরাদ্দতে কৃষি, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, জরুরি সেবা, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন এবং রফতানিমুখী শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। গ্যাসের সরবরাহ কম থাকলে শিল্প ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হঠাৎ গ্যাস বন্ধ না করে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী সরবরাহ করা যেতে পারে।
শক্তি সাশ্রয়কে জাতীয় অগ্রাধিকার
প্রকৃত চাহিদা নিশ্চিত করতে অবৈধ সংযোগ ও অপচয় রোধ, জ্বালানি সাশ্রয়, শিল্পে দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিতে হবে।
ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবসায়িক ক্ষতি কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। সংকটকালে অতিরিক্ত সাজসজ্জার আলো ও বিলবোর্ডের মতো অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখা যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি হলো সেটিই, যা উৎপাদন বা আমদানি করার প্রয়োজন পড়ে না। বড় শিল্প-কারখানায় নিয়মিত এনার্জি অডিট করতে হবে এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের নিয়ম কার্যকর করতে হবে।
পোশাক ও বস্ত্র শিল্পে এটি বিশেষভাবে জরুরি। দক্ষ মোটর, পরিবর্তনশীল গতির ড্রাইভ, বয়লার, পাম্প, কম্প্রেসার, রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ও আধুনিক নিয়ন্ত্রণযন্ত্র ব্যবহার করে জ্বালানি খরচ অনেক কমানো সম্ভব। সরকার প্রণোদনা দিলে ব্যবসায়ীরা এসব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।
যানজটের কারণে গাড়িগুলো দীর্ঘ সময় ধীরে চলা বা থেমে থাকার ফলে প্রচুর জ্বালানি অপচয় হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভালো গণপরিবহন এবং কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি খরচ ও যানজট—দুটিই কমানো সম্ভব।
সরকার এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে; এখন সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই বড় বিষয়।
একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তাই তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার পরস্পর সংযুক্ত অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
এলএনজি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কমে যায় এবং তা দ্রুত পরিবার ও শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি করে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের এ দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত দেশীয় গ্যাসের সন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেয়া—স্থলভাগে যেমন, তেমনি সমুদ্রেও। বাপেক্সের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় কাজের সুযোগ দিতে হবে। তবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে আমদানি কমানোর উপায় হিসেবে দেখতে হবে, জ্বালানি বৈচিত্র্যের বিকল্প হিসেবে নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না। তাই জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ দ্রুত বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সৌরশক্তিই সবচেয়ে বড় সুযোগ।
জমির স্বল্পতার কারণে ছাদে সোলার প্যানেল, সৌরচালিত সেচ, ভাসমান সোলার প্রকল্প এবং অকৃষি জমিতে বাছাইকৃত প্রকল্পে জোর দেয়া উচিত।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। আমাদের মোট জ্বালানির মাত্র ১-২ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যেখানে ভারত ও ভিয়েতনাম অনেক এগিয়ে গেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি বৈচিত্র্য ও শক্তি সাশ্রয়ের সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে।
আধুনিক বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালন ব্যবস্থা
আধুনিক বিদ্যুৎ গ্রিড ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত প্রসার সম্ভব নয়। এজন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা, ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট-গ্রিড প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় চাহিদা ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিড শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়; শিল্পের প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।
সংকট মোকাবেলা থেকে স্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা
বাংলাদেশের এখন একটি স্থায়ী জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো দরকার। এর মধ্যে থাকবে জ্বালানি মজুদ, এলএনজি আমদানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং জরুরি সংকট মোকাবেলার পরিকল্পনা। এতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে এবং সংকট তৈরি হওয়ার পর নয়, নিয়মিতভাবে পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করতে হবে।
জ্বালানি সংগ্রহেও স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বৈচিত্র্য প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাহায্য করে, তবে কোনো একটি সরবরাহকারী বা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।
এখনই সময় সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার
বাংলাদেশকে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে এমন জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা হবে নিরাপদ, বহুমুখী, সাশ্রয়ী এবং ক্রমেই দেশীয় ও নবায়নযোগ্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখা নয়; এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। আজকের সংকট তাই শুধু তাৎক্ষণিক সমাধান চায় না—এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন জ্বালানি নীতিনির্ধারণের সুযোগও তৈরি করেছে।
এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব.), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়