আলোকপাত

সরকার, সেনাবাহিনী বিএনপি ও জামায়াত: দ্বন্দ্বমুখর রাজনীতির সংকট

বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি পদক্ষেপ—নির্বাচন দীর্ঘা‌য়িত করা, মান‌বিক ক‌রি‌ডো‌রের প‌ক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং সমুদ্রবন্দর বিদেশী ব্যবস্থাপনায় দেয়ার উদ্যোগ এ সংকটকে সৃষ্টি ও ঘনীভূত করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি পদক্ষেপ—নির্বাচন দীর্ঘা‌য়িত করা, মান‌বিক ক‌রি‌ডো‌রের প‌ক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং সমুদ্রবন্দর বিদেশী ব্যবস্থাপনায় দেয়ার উদ্যোগ এ সংকটকে সৃষ্টি ও ঘনীভূত করেছে। প্রথমত, এ সরকার কোনো বিপ্লবী সরকার নয়। এ সরকার গঠনের উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের অবসানের পর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সাধন করে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য সরকারপ্রধান ড. ইউনূস ২০২৬-এর জুনকে সময়সীমা নির্ধারণ করেন। কিন্তু যেসব পুরনো ও নবগঠিত রাজনৈতিক দল আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক তাদের মধ্যে প্রধান দল বিএনপি দাবি করেছে দ্রুত নির্বাচন। জামায়াত ও নবগঠিত এনসিপির দাবি হচ্ছে, এতটা তাড়াতাড়ি না হলেও চলবে। সেনাপ্রধান সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে তারা প্রস্তুত। ড. ইউনূস এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেননি। এসব পরস্পরবিরোধী মতামত থেকে এক ধরনের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করেন যে সংস্কারের অজুহাতে সরকার তার ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে চাচ্ছে অথবা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরকার এ মুহূর্তে গদি ছাড়তে নারাজ। সবচেয়ে গোলমেলে অবস্থান হচ্ছে এনসিপির। তাদের মধ্যে নানা পরস্পরবিরোধী শক্তি সমবেত হয়েছে। তবে সাধারণভাবে তারা এবং জামায়াত সরকারকে নির্বাচনের আগে আরো সময় দিতে চায় অথবা জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন করতে চায়। এর একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে একটু সময় নিয়ে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু সম্ভবত বিএনপি সেই সময়টা এদের দিতে চাইছে না। জামায়াত আমির কিছুদিন আগে লন্ডন সফরে গিয়ে বিএনপির মূল নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে একটি বৈঠক করে এসে বলেছিলেন যে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটা ভালোই হবে। সুতরাং দ্রুত নির্বাচন প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট নয়। বামপন্থীরা অবশ্য মনে করেন, দেশে অনির্বাচিত সরকার দিয়ে না হবে কোনো মৌলিক সংস্কার, না আসবে কোনো স্থিতিশীলতা। তাদের প্রিয় স্লোগান হচ্ছে—‘এ মুহূর্তে দরকার নির্বাচিত সরকার’। তাদের মতে, দিন যত যাবে অনির্বাচিত সরকার আধাখেঁচড়া সংস্কারের জালে ততই আটকা পড়ে যাবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি ছাড়া শুধু স্বতঃস্ফূর্ত তরুণদের আন্দোলনের ওপর নির্ভর করে সংস্কারসিদ্ধ রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে তারা যা প্রথম থেকেই ছিল একটি অলীক স্বপ্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এ কারণে যে তাদের মধ্যে মতাদর্শগত প্রচুর ভিন্নতা যেমন শুরু থেকেই ছিল তেমনই ছিল নানা উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার অভাব। রাজনীতিবিদদের মতে, তাদের কোনো ভোটের অভিজ্ঞতাও নেই। কথায় বলে—বাঘের পিঠে ওঠা, সহজ নামা কঠিন। বাঘকে বধ করে নামতে না পারলে বাঘের খাদ্য হওয়াটা তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ড. ইউনূস এখন সেই আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যেই সরকার বিদেশ থেকে সব পরামর্শক ডেকে এনে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ক্ষমতা তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাদের নানা ধরনের উল্টাপাল্টা বাণী নানা সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এ রকম একটি মুখ ফসকে বাণী হচ্ছে ‘মানবিক করিডোর’। আমরা সবাই জানি, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে একাধিক খেলোয়াড় এ অঞ্চলে খেলছেন। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। মিয়ানমার, ভারত, চীন সবাই চায় রাখাইন রাষ্ট্র যেন মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ইচ্ছা কিছুটা মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে, কিছুটা আরাকানের সাধারণ জনগণের মানবিক সংকট সমাধানের জন্য তারা তৎপর, আবার আমে‌রিকা চায় চীন‌কে হ‌টি‌য়ে দি‌তে এবং সেই অর্থে এদের ভূ‌মিকা কিছুটা মিয়ানমা‌রের বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির অনুকূলে। যদিও ক‌রি‌ডোর নি‌য়ে এক্ষেত্রে জাতিসংঘের অফিশিয়াল কোনো ঘোষণা আজ পর্যন্ত আমরা পাইনি। এ রকম একটি জটিল অবস্থায় হঠাৎ কার স্বার্থে নিরাপত্তা উপদেষ্টা মানবিক করিডোরের প‌ক্ষে কথা বললেন, কার স্বার্থে আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের কথা বললেন, তা নিয়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক মহলে এ মুহূর্তে এক ধরনের তোলপাড় শুরু হয়েছে। এর ফলে সরকার, সেনাবাহিনী, বিভিন্ন উপদেষ্টা, সরকারবিরোধী ও সরকারপক্ষীয় রাজনৈতিক শক্তি সবার মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বচসা। তবে এখানে সংকটের মূল কারণ হচ্ছে, অনির্বাচিত ইউনূস সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে যুদ্ধের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়ার মতো একটি বড় সিদ্ধান্ত অবলীলাক্রমে নিয়ে ফেলার হঠকারিতা। এখন সরকারকে হয়তো এ ফেলে দেয়া থুতু পুনরায় চেটে খেতে হবে। 

তৃতীয় যে সংকট এ সরকার তৈরি করেছে তা হচ্ছে, বন্দরের মতো একটি স্ট্র্যাটেজিক খাতের ব্যবস্থাপনা এমন এক বৈশ্বিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চুক্তি করেছে যার কিনা রেকর্ড রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে বিশেষ সহযোগিতার। ফলে স্বভাবতই আমেরিকার ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বন্ধু (হিলারি ও বাইডেনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলা হচ্ছে) ড. ইউনূসের প্রতি নানা সন্দেহের তীর ছোড়া শুরু হয়েছে। এ ধরনের অস্বচ্ছ জবাবদিহিহীন চুক্তি করার ম্যান্ডেট স্বভাবতই এ সরকারের নেই। তাই এটি অবশ্যই একটি সন্দেহজনক ও অবিমৃষ্যকারী উদ্যোগ। এর জবাব ইউনূস সরকারকে অবশ্যই দিতে হবে। এ তিন ধরনের ভুল পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান ইউনূস সরকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে এক সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছে। এ থেকে মুক্তির সম্ভাব্য পথ হচ্ছে, নি‌জে‌দের নির‌পেক্ষতা‌কে নি‌শ্চিত করে দ্রুত একটি থ্রি এম (money, muscle and manupulation) মুক্ত প‌রি‌বেশ তৈরি করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। যেখানে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে এবং গণতান্ত্রিক স্পেস প্রকৃতই পুনরায় উন্মুক্ত হবে। অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন বিচা‌রে সাব‌্যস্ত স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী কোনো দল বা বি‌ভিন্ন আম‌লে গুরুতর মানবতাবি‌রোধী অপরাধে দ‌ণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচ‌নে প্রতিদ্ব‌ন্দ্বিতা ক‌রে ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে না আসে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তাদের সাধারণ সমর্থক ভোটার বা ত‌লের অসংখ‌্য সাধারণ রাজনৈতিক সমর্থকের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে বা তাদের বিনা অপরাধে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর রিপোর্টে এরই মধ্যে তা বলে দেয়া হয়েছে। তাই বর্তমানে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানই হওয়া উচিত বর্তমান সরকারের সব কাজের মূল মনোযোগবিন্দু। সেই পথেই তারা নিজেরাও মুক্ত হতে পারবেন, দেশকেও সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্রিদিং স্পেস (নিশ্বাস ফেলার জায়গা) দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের হাত থেকে আপাতত রক্ষা করতে পারবেন। এটুকু করাই হবে বর্তমানে দেশনায়কসুলভ কর্তব্য পালন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্লোগান হোক, ‘fewer but better’- বরং কম কিন্তু ভালো।

ড. এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

আরও