পর্যালোচনা

বিশ্বমানের স্টার্টআপের জন্য চাই সর্বাত্মক সহায়তা

স্টার্টআপ ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পেশাদারি জীবনে। এমনকি প্রাত্যহিকতায়। ভোরে অফিসে যাওয়ার সময় পাঠাও রাইড নিই, কুক এন্টসের মাধ্যমে দুপুরে বাসার খাবার আনিয়ে খাই, সহজে কক্সবাজারে যাওয়ার টিকিট কিনে বিকাশে টাকা পরিশোধ করি, চালডালের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি, এসো শিখি থেকে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ কিনি, রাতে বঙ্গ-তে পছন্দের নাটক দেখি।

স্টার্টআপ ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পেশাদারি জীবনে। এমনকি প্রাত্যহিকতায়। ভোরে অফিসে যাওয়ার সময় পাঠাও রাইড নিই, কুক এন্টসের মাধ্যমে দুপুরে বাসার খাবার আনিয়ে খাই, সহজে কক্সবাজারে যাওয়ার টিকিট কিনে বিকাশে টাকা পরিশোধ করি, চালডালের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি, এসো শিখি থেকে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ কিনি, রাতে বঙ্গ-তে পছন্দের নাটক দেখি।

২০১৯ সাল ছিল আরেকটি ঘটনাবহুল বছর। আবিষ্কারের ফ্রন্টিয়ার ফান্ড থেকে সিন্দাবাদ ৪২ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। সিন্দাবাদ বিটুবি অনলাইন ই-কমার্স প্লাটফর্ম। চালডাল আইএফসিও আইডিএলসির কাছ থেকে প্রায় ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। চালডাল ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রোসারি ই-কমার্স প্লাটফর্ম। স্টার্টআপরা এর আগে এর থেকে বেশি টাকা পেয়েছে। কিন্তু আইএফসির মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বা আইডিএলসির মতো সংবিধিবদ্ধ সংস্থার স্টার্টআপে বিনিয়োগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেকোয়া ক্যাপিটাল ও অন্য একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) ফার্ম থেকে শপআপ প্রায় ৩০ লাখ ডলার পেয়েছে। বিডি ভেঞ্চার বিটলস, হ্যান্ডি মামা, সি ওয়ার্ক ওগেইজে ৫ কোটির বেশি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বিটলস একটা ইথিক্যাল হ্যাকার, সি ওয়ার্ক মাইক্রোজবের প্লাটফর্ম, হান্ডিমামা বাসা বা অফিসের কাজের জন্য পেশাদার কর্মীদের প্লাটফর্ম ও গেইজ ভিডিও অ্যানালিটিকস বিডি ভেঞ্চার ২০১৬ সালে এসো শিখিতে বিনিয়োগ করেছিল। এসো শিখি একটি অনলাইন পড়াশোনার প্লাটফর্ম। ২০১৯ সালে কয়েকজন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরের সঙ্গে বিডি ভেঞ্চার পুনরায় এসো শিখিতে বিনিয়োগ করেছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রায় ৪০টি স্টার্টআপে অনুদান দিয়েছে। সব মিলিয়ে ২০১৯ সালে স্টার্টআপে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরে ছিল ২৭ মিলিয়ন ডলার।

আবিষ্কার ও নেদারল্যান্ডস এম্বাসির সহায়তায় বাংলাদেশ অ্যাঞ্জেল নেটওয়ার্ক (বান) গঠিত হয়েছে। গত মার্চে তারা তাদের প্রথম পিচিং (যেখানে স্টার্টআপ ও আইডিয়াবাজরা বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীদের সামনে তাদের প্রস্তাব পেশ করে) সেশন করে, যেখানে ছয়টি স্টার্টআপ তাদের প্রস্তাব পেশ করে। প্রায় ২৫ জন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর উপস্থিত ছিলেন। সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় পিচিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নতুন আরো ছয়টি স্টার্টআপ তাদের প্রস্তাব পেশ করে। এ সেশনে আগেরবারের দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫০ জন অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর উপস্থিত হলেন। দুবারের ১২টি স্টার্টআপ থেকে ৩টি ও ১৩ জনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ পেয়েছে। সোনিয়া বশীর কবীরের নেতৃত্বে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের আরেকটি ফোরাম দি অ্যাঞ্জেল নেটওয়ার্ক বা টান গঠিত হয়েছে। টান থেকে রবি আর-ভেঞ্চারে চারটি স্টার্টআপে ১ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বেশকিছু করপোরেট হাউজ স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে। সরকার বাজেটে স্টার্টআপের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠন করার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আইডিয়া প্রকল্প থেকে এখন স্টার্টআপদের অনুদান দেয়া হয় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠিত হলে ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করা যাবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিসেক) আরো দুটি বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল কোম্পানিকে নিবন্ধনভুক্ত করেছে, যথা সিএমেল ও কস্টেলশন। বিসেক দুটি বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল, যথা বিডি ভেঞ্চারের ৫০ কোটি টাকা ও আইডিএলসির ৪৫ কোটি টাকাকে অনুমোদন দিয়েছে। আইডিএলসি দেশে ও বিদেশে যেমন সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে রোড শো করেছে।

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধন করতে হয়। সম্পদ ব্যবস্থাপক থেকে তহবিল আলাদা, তাই এভাবে নিবন্ধনের ব্যবস্থা। এ নিবন্ধনের সময় তহবিলের মোট পরিমাণের ওপর ২ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি প্রদান করতে হতো। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের ওপর ওই স্ট্যাম্প ডিউটি রেয়াত দিয়েছে। কিন্তু ইমপ্যাক্ট তহবিল ও প্রাইভেট ইকুইটি তহবিলের এখনো ২ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হয়, যা খুবই ব্যয়বহুল।

রবি তার কর্মীদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল আর-ভেঞ্চার ১-এ। রবি তার কর্মীদের কাছ থেকে উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছিল। অনেক আইডিয়ার মধ্য থেকে ১০টি বাছাই করা হয়েছিল। উদ্যোক্তারা রোজকার কাজের বদলে তাদের আইডিয়া বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন। বেতন ঠিকমতো পেতেন। রবি থেকে আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য কিছু আর্থিক সহায়তাও দেয়া হলো। ১০টি থেকে চার-পাঁচটি আইডিয়া সাফল্যের মুখ দেখেছে। আর ভেঞ্চার ২-তে রবি এ প্রতিযোগিতা সারা দেশে সবার জন্য উন্মুুক্ত করে দিল। ব্যাপক সাড়া পড়ল। ২ হাজার ২০০-এর অধিক আইডিয়া জমা পড়ল। তার থেকে বাছাই করে ৫৬টি আইডিয়া বা স্টার্টআপকে পিচিংয়ের সুযোগ দেয়া হলো। এ পিচিং প্রক্রিয়া একটি স্বনামধন্য টিভি চ্যানেলে সম্প্রচার করা হলো। দেশব্যাপী স্টার্টআপরা যেন দেখতে পারে অর্থ দেয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কী কী জিনিস দেখেন। বাছাইকৃত ২৮টি স্টার্টআপকে যাচাই-বাছাই করা হলো। তার মধ্য থেকে ১২টি স্টার্টআপ ফাইনালে উত্তীর্ণ হলো। যাদের থেকে লাইভ টিভি শোতে বিনিয়োগকারীরা বিচার করে আটটি স্টার্টআপকে নির্বাচন করেন। তারা বিভিন্ন অংকে মোট ৪ কোটি টাকা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পায়।

গ্রামীণফোন তাদের এক্সেলারেটর প্রোগ্রাম ‘জিপি এক্সেলারেটর ২’ নামে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছে।  এতে দুটি ভাগ—প্রাক-এক্সেলারেটর ও এক্সেলারেটর। সারা বাংলাদেশ থেকে আইডিয়া আহ্বান করা হয়। প্রাক- এক্সেলারেটর আট সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে আইডিয়া যাচাই-বাছাই করে বাজার উপযোগী করা হয়। এক্সেলারেটর প্রোগ্রামে যাদের মিনিমাম ভায়াবল প্রডাক্ট (এমভিপি) আছে, তাদের ৪ দশমিক ৫ মাসে প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। গ্রামীণফোন ৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান, অফিসের জন্য জায়গা বরাদ্দসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়। এছাড়া তরু, ওয়াই ওয়াই গোষ্ঠী, ওয়াই গ্যাপ ইত্যাদি ইনকিউবেটর ও এক্সেলারেটর প্রোগ্রাম চালু আছে। যান্ত্রিক গাড়ির ওয়ার্কশপের একটি প্লাটফর্ম। তারা এক্সেলারেটর এশিয়ায় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাছাইকৃত হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তারা চার মাসের এক্সেলারেটর প্রোগ্রামে যোগদানের সুযোগ ও ১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।

টাইগার আইটি ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি সলভের সহযোগিতায় উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা করেছে। বাছাইকৃত আবেদনকারী থেকে ১৪ জন ফাইনালিস্ট বিচারকদের সামনে তাদের প্রস্তাবনা পেশ করেন। তিনজন বিজয়ী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন, যেখানে ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইউএনসিডিএফ শিফট প্রকল্পে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিন্টেকের মাধ্যমে দরিদ্র মহিলাদের সুবিধা প্রদানকারী বিভিন্ন স্টার্টআপের প্রতিযোগিতা আহ্বান করে। নেপালে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের দুটি স্টার্টআপ আই ফার্মার ও রমনী আঞ্চলিকভাবে বিজয়ী হয়। গ্লোবাল অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ নেটওয়ার্ক জেন লাইট ক্যাশল পার্টনার ও ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় স্টার্টআপদের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিজয়ী সিংমাইন্ড রিয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ পায়।

অর্থায়ন এখনো স্টার্টআপদের জন্য বড় বাধা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলো তাদের ফান্ডের জন্য অর্থ পাচ্ছে না। স্বভাবতই তাদের পক্ষে স্টার্টআপদের অর্থায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুল অনুসারে পেনশন ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের টাকা বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে খাটানো যাবে। বিশ্বব্যাপী পেনশন ফান্ড ও প্রভিডেন্ট ফান্ড বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের অর্থের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা। কিন্তু ট্রাস্ট আইন, অর্থ আইনে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না আসায় এসব অর্থ বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে আসছে না। পাঠাও-এর ব্যবসা সংকোচন করতে হয়েছে, যার জন্য বেশকিছু কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। স্টার্টআপকে এ ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

২০১৯ সালে প্রথম ষাণ্মাসিকে ভারতে ২১২টি ডিলে ভেঞ্চার ক্যাপিটালে ৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম ষাণ্মাসিকে ২১৪টি ডিলে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োজিত হয়েছিল। গত পাঁচ বছরে ভারতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ২৪ শতাংশ (ভিসিসি এজ প্রতিবেদন এইচ ১, ২০১৯)। স্টার্টআপের ক্ষেত্রে ভারত এত ভালো করার কারণ, দেশের সর্বক্ষেত্রে স্টার্টআপদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বাত্মক নীতি ও আমলাতান্ত্রিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। আমরা আমাদের তরুণদের কাছ থেকে বিশ্বমানের স্টার্টআপ পেতে চাইলে শুধু অর্থ নয়, সর্বাত্মক সহায়তা দিতে হবে।

 

শওকত হোসেন: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিশেষজ্ঞ

আরও