সিসাদূষণ আমাদের
পরিবেশের জন্য
কতটা ক্ষতিকর
তার অন্যতম
উদাহরণ টাঙ্গাইলের
মির্জাপুর উপজেলার
রাজাবাড়ী। এ
গ্রামে বসবাস
নয় বছরের
অনিকের। তাকে
নিয়ে মা-বাবার
উত্কণ্ঠার কারণ
সে অনেক
কিছুই মনে
রাখতে পারে
না। অনিককে
যদি জিজ্ঞেস
করা হয়,
তুমি কোন
ক্লাসে পড়ো?
ও বলে
ক্লাস ফোর।
কিছুক্ষণ পর
আবার জিজ্ঞেস
করলে বলে,
আমি ক্লাস
থ্রিতে পড়ি।
মির্জাপুরের রাজাবাড়ীতে
অনিকসহ অনেক
শিশু-কিশোরের
শরীরে সিসার
মাত্রা স্বাভাবিকের
তুলনায় বেশি
হওয়ার কারণ
ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের
অবৈধ একটি
কারখানা।
২০১৬ সালে
রাজাবাড়ীতে গড়ে
ওঠে ব্যাটারি
রিসাইক্লিংয়ের অবৈধ
কারখানাটি। শুরুতে
এলাকার মানুষ
এর নেতিবাচক
প্রভাব বুঝতে
না পারলেও
কয়েক মাসের
মধ্যেই দেখতে
শুরু করে
যে কারখানার
চারপাশের গাছের
পাতা কালো
হয়ে যাচ্ছে।
কুয়াশার মতো
কালো ধোঁয়া
ছড়িয়ে পড়ছে
চারদিকে। এরপর
সবচেয়ে ভয়াবহ
ব্যাপারটি ঘটে
শিশুদের নিয়ে।
এ গ্রামের
শিশুদের মধ্যে
কেউ কেউ
ক্রমে স্মৃতিশক্তি
হারাতে শুরু
করে। পড়াশোনা
মনে রাখতে
পারে না।
একই প্রশ্নের
উত্তর একেকবার
একেক রকম
দেয়। অনিকের
মতো রাজাবাড়ী
গ্রামের সায়েম
আর সিহাবও
একই পরিণতির
শিকার। বিশেষজ্ঞরা
মনে করেন,
সাধারণত সিসার
বিষক্রিয়া সব
বয়সী শিশুদের
জন্য মারাত্মক
পরিণতি ডেকে
আনতে পারে।
বিশেষ করে
পাঁচ বছরের
কম বয়সী
শিশুদের জন্য
তা আরো
বেশি ক্ষতিকর।
এটি শিশুদের
মস্তিষ্কের অপূরণীয়
ক্ষতি এবং
তাদের পূর্ণ
বিকাশ বাধাগ্রস্ত
করতে পারে।
বছরখানেক পর
পরিবেশ দূষণের
বিষয়টি আমলে
নিয়ে গ্রামবাসী
ও উন্নয়ন
সহযোগীরা মিলে
কারখানাটির কার্যক্রম
বন্ধ করে
দেয়। কিন্তু
মির্জাপুরের মাটি-বাতাস
এখনো সিসামুক্ত
নয়। এখনো
ঝুঁকিতে রাজাবাড়ী
গ্রামের মানুষ,
প্রাণ-প্রকৃতি।
তথ্য বলে,
বিশ্বে প্রতি
তিন শিশুর
মধ্যে একজন
সিসাদূষণের শিকার।
কেন বাড়ছে
দেশে সিসাদূষণ?
এ প্রশ্নের
উত্তর খুঁজে
পাওয়া যায়
ইউনিসেফ ও
শিশুদের মধ্যে
সিসাদূষণ ঠেকাতে
সংস্থাটির সহযোগী
সংগঠন ‘পিওর
আর্থ’-এর
গবেষণা প্রতিবেদন
‘দ্য
টক্সিক ট্রুথ’-এ।
তাদের বৈশ্বিক
প্রতিবেদন অনুসারে,
অনিরাপদ সিসা
অ্যাসিড ব্যাটারি
রিসাইক্লিং কারখানা
ও বর্জ্য
পোড়ানোর যন্ত্র
থেকে নির্গমন
হয় মানুষ
ও পরিবেশের
জন্য ক্ষতিকর
সিসা।
আমাদের দেশে
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার
ব্যবহার বেড়েছে।
ঢাকা ও
ঢাকার পার্শ্ববর্তী
এলাকাসহ দেশের
অধিকাংশ গ্রাম
ও শহরতলিতে
ক্রমে বাড়ছে
এর ব্যবহার।
বাংলাদেশে অটোমোটিভ
(স্বয়ংচালিত) যানবাহন,
সোলার হোম
সিস্টেম ও
বৈদ্যুতিক অটোরিকশার
(স্থানীয়ভাবে ইজিবাইক
নামে পরিচিত)
ব্যবহার বৃদ্ধি
প্রসারিত করেছে
লেড অ্যাসিড
ব্যাটারির বাজার।
শুধু এককভাবে
অটোরিকশার ব্যবহার
বৃদ্ধি বাংলাদেশে
৬৫ থেকে
৭৫ শতাংশ
লেড অ্যাসিড
ব্যাটারির ব্যবহার
বাড়িয়েছে বলে
জানা যায়।
বাংলাদেশে লেড
অ্যাসিড ব্যাটারির
চাহিদা বেড়েছে
গত এক
দশকে ব্যাপকভাবে,
বিশেষ করে
পরিবহন খাতে
(গাড়ি ও
ই-রিকশা),
টেলিযোগাযোগ ও
সৌরবিদ্যুৎ থেকে
শক্তি সংগ্রহ
করে তা
সংরক্ষণ কিংবা
ব্যাকআপ সিস্টেমে
পাওয়ার স্টোরেজের
জন্য, যেখানে
অনিয়মিত বিদ্যুৎ
সরবরাহ বিদ্যমান।
২০১৯ সালের
একটি প্রতিবেদনে
দেখা যায়,
বাংলাদেশের ব্যাটারি
নির্মাতারা আগামী
পাঁচ বছরে
তাদের বার্ষিক
রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে
বৃদ্ধির লক্ষ্য
নিয়ে অগ্রসর
হচ্ছে; যা
লেড অ্যাসিড
ব্যাটারি উৎপাদন
ও ব্যাটারি
রিসাইক্লিং শিল্পের
ক্রমবর্ধমান চাহিদায়
অবদান রাখবে।
অ্যাকুমুলেটর ব্যাটারি
ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশের
(এবিএমইএবি) তথ্য
অনুসারে, নিবন্ধিত
কারখানা ছাড়াও
বাংলাদেশে প্রায়
৫০টি ব্যাটারি
কারখানা রয়েছে,
যার বেশির
ভাগই বিদেশী
মালিকানাধীন। অনিবন্ধিত
কারখানাগুলো (সরকারকে
রাজস্ব থেকে
বঞ্চিত করছে)
থেকে উৎপাদনের
পরিমাণ বছরে
প্রায় পাঁচ
থেকে ছয়
লাখ ইউনিট।
সাধারণত এ-জাতীয়
ব্যাটারির একটি
নির্দিষ্ট মেয়াদ
থাকে। বাংলাদেশে
ব্যবহূত লেড
অ্যাসিড ব্যাটারির
ব্যবহারযোগ্য জীবনকাল
থাকে প্রায়
দুই বছর
পর্যন্ত। তারপর
তা অবশ্যই
রিসাইক্লিং করতে
হয়।
দেশে সিসা
রিসাইক্লিংয়ের আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক
দুটি সেক্টরই
রয়েছে। তবে
দেশের অনেক
জায়গাতেই চলছে
নিয়মের তোয়াক্কা
না করে
ব্যাটারির সিসা
রিসাইক্লিং। বিপত্তিটা
এখানেই। এভাবে
নিয়ম না
মেনে রিসাইক্লিং
করায় ক্রমে
বাড়ছে সিসাদূষণ।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৮
সালের তথ্যানুসারে,
বাংলাদেশে ১
হাজার ১০০টিরও
বেশি অনানুষ্ঠানিক
ও অবৈধ
ইউজড লেড
অ্যাসিড ব্যাটারিজ
(ইউএলএবি) বা
ব্যবহূত লেড
অ্যাসিড ব্যাটারি
কারখানা রয়েছে।
যেখানে নিয়ম
না মেনেই
চলে রিসাইক্লিং।
বিশ্বের ৮০
কোটি শিশু
সিসাদূষণে ভুগছে।
এর মধ্যে
সাড়ে তিন
কোটি বাংলাদেশের।
সিসার কারণে
সব বয়সেরই
মারাত্মক শারীরিক
জটিলতা হতে
পারে। এর
প্রভাবে শিশুদের
পূর্ণ বিকাশ
যেমন বাধাগ্রস্ত
হয়, তেমনি
স্নায়বিক জটিলতা
বাড়ে। শেখার
ক্ষমতা হ্রাস
পায় এবং
আচরণগত নানা
সমস্যা সৃষ্টি
হয়। যেমনটা
হয়েছে অনিক,
সায়েম কিংবা
সিহাবের। বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, সিসাদূষণ
ঠেকাতে না
পারলে আমাদের
কম বা
সীমিত বুদ্ধিসম্পন্ন
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
বোঝা টানতে
হতে পারে।
সাধারণ মানুষ
থেকে শুরু
করে আমাদের
নীতিনির্ধারকরা বায়ুদূষণ,
পানিদূষণ নিয়ে
যতটা সচেতন,
সিসাদূষণ নিয়ে
তাদের সচেতনতা
ততটাই যেন
কম। অথচ
সিসার বিষক্রিয়ার
চিকিৎসা নেই।
এমন অবস্থায়
সিসার পরিবেশবান্ধব
ব্যবহার নিশ্চিত
করা কতটা
জরুরি তা
সহজে অনুমান
করা যায়।
সম্প্রতি ইউনিসেফ
বাংলাদেশ তথ্য
প্রকাশ করেছে,
বাংলাদেশের ৩
কোটি ৫০
লাখ শিশুর
রক্তে বেশ
উচ্চমাত্রায় সিসা
রয়েছে; যা
তাদের স্বাস্থ্য
ও বিকাশের
ক্ষেত্রে অপূরণীয়
ক্ষতি করতে
পারে। ইনস্টিটিউট
অব হেলথ
মেট্রিক্স ইভ্যালুয়েশনের
তথ্য অনুযায়ী,
সিসার বিষক্রিয়ার
কারণে মৃত্যুহারের
দিক থেকে
বিশ্বে বাংলাদেশের
অবস্থান চতুর্থ।
লোকালয়ের কাছাকাছি
ব্যবহূত লেড
অ্যাসিড ব্যাটারির
অবৈধ রিসাইক্লিং
কারখানাগুলো প্রায়ই
সিসার বিষক্রিয়ার
জন্য দায়ী।
এছাড়া মসলায়ও
উচ্চমাত্রায় সিসার
উপস্থিতি পাওয়া
গেছে। উদাহরণস্বরূপ
লেড ক্রোমেটে,
যা হলুদের
রঙ ও
ওজন বাড়াতে
ব্যবহূত হয়।
এছাড়া বিভিন্ন
প্রসাধনী থেকে
শুরু করে
সিসা দিয়ে
তৈরি রঙ,
কিছু ভেষজ
ও আয়ুর্বেদিক
ওষুধ, সিসা
দিয়ে তৈরি
থালাবাসন ও
রান্নার পাত্র,
বিভিন্ন ধাতব
রান্নার পাত্র,
সিসাযুক্ত পেট্রল,
পানির পাইপ,
দূষিত শিল্প
এলাকায় সিসা
পাওয়া যায়।
গবেষকরা বলছেন,
সিসাদূষণের দীর্ঘস্থায়ী
পরিণতি হচ্ছে
মাঝারি থেকে
উচ্চমাত্রার দূষণ,
শিশুদের মাথাব্যথা,
পেটব্যথা, নিস্তেজ
হয়ে পড়া,
স্মৃতিশক্তি হ্রাস,
দুর্বল মনোযোগ,
ক্ষুধা কমে
যাওয়া বা
কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা।
সিসার বিষক্রিয়া
স্নায়বিক প্রক্রিয়া
ও কেন্দ্রীয়
স্নায়ুতন্ত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত
করতে পারে,
ফলে তাদের
মধ্যে দেখা
দিতে পারে
অস্থিরতা বা
আলস্য।
শুধু দূষণজনিত
কারণে ২০১৯
সালে মৃত্যু
হয়েছে ৯০
লাখ মানুষের।
মারাত্মক স্বাস্থ্যগত,
সামাজিক ও
অর্থনৈতিক ঝুঁকি
থাকা সত্ত্বেও
সরকারের পাশাপাশি
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন
সংস্থাগুলোকেও দূষণ
নিরসনে নজরদারি
বাড়াতে দেখা
যায় না।
গবেষণায় সিসাদূষণ
নিয়ে ভয়াবহ
তথ্য উঠে
আসা সত্ত্বেও
তা নিরসনে
উদ্যোগের যথেষ্ট
অভাব দৃশ্যমান।
তবে ২০১৭
সালে সাভারের
কাঠগোড়ায় প্রথমবারের
মতো সিসাদূষণ
মুক্তকরণের কার্যক্রম
শুরু করে
পিওর আর্থ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে
২০২০ সাল
থেকে সংস্থাটি
কার্যক্রম শুরু
করে টাঙ্গাইলের
মির্জাপুরে। পাশাপাশি
আইসিডিডিআর,বির
সহযোগিতায় দেশের
সাভার ও
মির্জাপুরে শিশুদের
রক্তে সিসার
মাত্রা পরীক্ষার
কাজটিও তারা
চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের মনে
রাখতে হবে
জলবায়ু পরিবর্তন
ও জীববৈচিত্র্যের
ক্ষতির সঙ্গে
সিসাদূষণ সম্পর্কিত।
এ দূষণ
ক্রমে সবচেয়ে
বড় হুমকি
হয়ে উঠেছে
মানুষ ও
জীবজগতের স্বাস্থ্যের
জন্য; যা
টেকসই সামাজিক
অগ্রগতিকে বিপন্নতার
দিকে ঠেলে
দিচ্ছে। গত
২০ বছরে
বিভিন্ন শিল্পদূষণ
যেমন বায়ুদূষণ,
সিসাদূষণ ও
অন্যান্য রাসায়নিক
দূষণের কারণে
মৃত্যুর সংখ্যা
বৃদ্ধি পেয়েছে
ব্যাপক হারে,
যা ম্লান
করে দিয়েছে
প্রথাগত দূষণে
মৃত্যুর হার
হ্রাসের অর্জনকে।
দূষণের কারণে
অস্বাভাবিক মাত্রার
মৃত্যু আমাদের
ঠেলে দিচ্ছে
আর্থিক ক্ষতির
দিকেও। ২০১৯
সালে এ
ক্ষতির পরিমাণ
ছিল ৪
দশমিক ৬
ট্রিলিয়ন মার্কিন
ডলার। ল্যানসেটের
এক গবেষণায়
দেখা গেছে,
দূষণের কারণে
আর্থিক ক্ষতির
বোঝা সবচেয়ে
বেশি টানতে
হচ্ছে নিম্ন
ও মধ্যম
আয়ের দেশগুলোকে;
যা প্রচণ্ড
অসমতারও সৃষ্টি
করছে।
উদীয়মান এসব
হুমকি মোকাবেলার
জন্য বৈশ্বিক
সমর্থন যেমন
প্রয়োজন, তেমনি
জাতীয় পর্যায়
থেকেও উদ্যোগ
নিতে হবে।
বায়ুদূষণে ঢাকা
যেখানে বিশ্বের
শীর্ষ শহরগুলোর
মধ্যে প্রথম
সারির, সেখানে
সিসাদূষণে বাংলাদেশ
চতুর্থ। তাই
গুরুত্ব দিতে
হবে অবৈধ
রিসাইক্লিং কারখানাগুলো
থেকে সিসার
ছড়িয়ে পড়া
রোধকে। কারণ
এটা পরিষ্কার
সিসাদূষণ আমাদের
জন্য নতুন
হুমকি হয়ে
উঠেছে এবং
এটি যেভাবে
ছড়িয়ে পড়ছে
ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
তৈরি করছে
তা নিয়ে
নীতিনির্ধারকদের নড়েচড়ে
বসা জরুরি।
সিসাদূষণ বর্তমানে
তাই ব্যাপক
প্রতিক্রিয়ার দাবিদার।
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক