আজ জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা স্বল্প উৎপাদন

দেশে স্বল্প উৎপাদনের খাতগুলোয় এমন নজির কম নয়। ফলে এটি একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

যেকোনো দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার অন্যতম চালিকাশক্তি উৎপাদন সক্ষমতা। যদি দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত উৎপাদন করা যায় তাহলে তা দেশ ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদন রফতানি আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন অপ্রতুল উৎপাদন হয় তখন পণ্য আমদানির দিকে ঝুঁকতে হয়।

যেহেতু সব দেশে সব ধরনের পণ্য উৎপাদনের ভৌগোলিক বা অন্যান্য সুবিধা সমানভাবে নেই বা একেবারেই নেই, তাই সময়ের পরিক্রমায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। ফলে পণ্য আমদানি করা মোটেও নেতিবাচক কিছু নয়। কিন্তু যখন উৎপাদনের সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকার পরও ক্রমেই কোনো পণ্যের জোগানের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর কাঠামো নেয়া হয় তাতে কিছু অর্থনৈতিক ঝুঁকি থাকে। এর বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশের জ্বালানি পণ্যের পরিস্থিতি। দেশে নানা সময়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে, যার অন্যতম কারণ স্থানীয় উৎপাদন কম। বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা। সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে দেশের জ্বালানির বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যা এখনো চলমান। এছাড়া এ সংকটের মুখে সার আমদানিও ব্যাহত হচ্ছে। দেশে সারের বিতরণ ঘিরেও যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে সেটিও স্থানীয়ভাবে অপ্রতুল উৎপাদনের আরেকটি নজির। যখন নির্দিষ্ট মৌসুমে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয় তখন কম উৎপাদন, আমদানি ব্যাহত হওয়াকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অনেকেই একটা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চায়। কৃত্রিম মজুদ সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

দেশে স্বল্প উৎপাদনের খাতগুলোয় এমন নজির কম নয়। ফলে এটি একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আজ দেশে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উদযাপন হচ্ছে তখন স্বল্প উৎপাদনের ফলে উদ্ভূত সমস্যা ও তা থেকে সমাধানের উপায় নিয়ে জোর আলোচনা হওয়া চাই। তাহলে অনুধাবন হতে পারে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

উৎপাদন বাড়াতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে শুরুতেই নজর দিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে। অর্থাৎ একই পরিমাণ জমি, শ্রম, পুঁজি ও কাঁচামাল ব্যবহার করে কীভাবে বেশি ও উন্নতমানের পণ্য উৎপাদন করা যায় সেটিকে নীতিনির্ধারণের অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোয় ভূমিকা রাখতে পারে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয়, যা এবারের জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসের প্রতিপাদ্যও বটে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি ও দক্ষতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি দেশের কৃষি উৎপাদনের চিত্র থেকে বোঝা সহজ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে একদিকে ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি হচ্ছে ভূমির অবক্ষয়। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি বছর গড়ে ২৭ হাজার হেক্টর ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদনও কমছে। উপরন্তু প্রতি বছর দেশে বন্যায় ফসলহানি হয়, সেচ সংকটে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ফসল উৎপাদন হয় না। অথচ বর্তমানে কৃষিজমিতে কীটনাশক ছিটানো থেকে শুরু করে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কিংবা দুর্যোগের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—এসব কাজে ড্রোনের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার নেই বলা যায়। অথচ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অনেকটাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কৃষি, শিল্প ও সেবা—সব খাতেই আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময় সাশ্রয় এবং পণ্যের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের শিল্প খাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কম মজুরির শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয়তা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য প্রযুক্তি গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রযুক্তি এলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে—এমন ধারণারও অবকাশ নেই। প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। নতুন প্রযুক্তি পরিচালনা, উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার জন্য কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকতে হবে। ফলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা না গেলে বিপুল শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন কঠিন হবে।

সেবা খাতেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে সময় ও ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এসব সমস্যায় তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুফল সীমিত থাকবে।

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে উদ্ভাবনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শুধু বিদেশী প্রযুক্তি আমদানি করলেই হবে না; দেশের শিল্প ও কৃষির নিজস্ব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়ভাবে উপযোগী প্রযুক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতি উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবনী উদ্যোগকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উৎপাদনশীলতার সঠিক পরিমাপ। কোন খাতে উৎপাদনশীলতা কতটা কম, কোথায় কী ধরনের বাধা রয়েছে এবং কোন উদ্যোগে কতটা উন্নতি হচ্ছে—এসবের নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয়। তাই খাতভিত্তিক উৎপাদনশীলতার তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে শুধু কোনো নির্দিষ্ট দিবসের আলোচনার বিষয় না রেখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার।

আরও