(গতকালের
পর)
কেন অর্থ
পাচার করা
হয়?
অর্থ
পাচারের পেছনে
নানা কারণ
থাকতে পারে।
এ বিষয়ে
গবেষক ও
বিশ্লেষকদের আলোচনা
থেকে যা
পাওয়া যায়,
সংক্ষেপে তাহলো—
ক) যারা
অর্থ পাচার
করছেন, তারা
দেশে বিনিয়োগের
পরিবেশ পাচ্ছেন
না। খ)
ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতা
সক্ষমতায় টিকে
থাকতে পারছেন
না। গ)
বাংলাদেশের ভবিষ্যতের
প্রতি তাদের
আস্থা নেই।
ঘ) অন্যায়ভাবে
বা দুর্নীতির
মাধ্যমে উপার্জিত
অর্থ ব্যবহারের
সুযোগ তৈরির
জন্য অর্থ
পাচার করা।
ঙ) রাজনৈতিক
অনিশ্চয়তা ও
নিরাপত্তাহীনতাও একটি
কারণ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন,
বাংলাদেশ থেকে
পাঁচ কারণে
টাকা পাচার
হচ্ছে। দেশে
বিনিয়োগের পরিবেশের
অভাব, রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতার শঙ্কা,
রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর
দুর্বল নজরদারি,
আইনের শাসনের
ঘাটতি এবং
বেপরোয়া দুর্নীতি।
বাজেটে দেখা
যাচ্ছে অর্থ
পাচারের পেছনে
যৌক্তিক ও
অযৌক্তিক বা
ন্যায়/অন্যায়
উভয় ধরনের
কারণ থাকতে
পারে।
অর্থ পাচার
মানেই কি
অপরাধ?
এখানে
একটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো
অর্থ পাচার
করা মানেই
অন্যায় বা
অপরাধ নয়।
দেখতে হবে,
কী উপায়ে,
কী পন্থায়
ক্রয়ক্ষমতা বা
অর্থ পাচার
হচ্ছে। আরো
দেখতে হবে
পাচারকৃত অর্থের
উৎস কি?
কখনো এমন
হয়, বিদেশে
যাওয়ার সময়
কিছু বিদেশী
মুদ্রা সঙ্গে
নিয়ে যাওয়া
হয়। এটি
পরিমাণে কম
হলে তেমন
সমস্যাজনক নয়।
কিন্তু হুন্ডির
মাধ্যমে অর্থ
নিয়ে আসা
বা পাঠানো
দেশীয় আইনে
অবৈধ। কারণ
এতে দেশ
বা কেন্দ্রীয়
ব্যাংক বৈদেশিক
মুদ্রা বা
দেশে বৈদেশিক
মুদ্রায় ক্রয়ক্ষমতা
হারায়। তদ্রুপ
আন্ডার ইনভয়েসিং
বা ওভার
ইনভয়েসিং একটি
স্রেফ মিথ্যা।
সুতরাং এটিও
বৈধ পন্থা
নয়।
সারকথা, অর্থ
পাচার একটি
বিস্তৃত বিষয়।
এর অধীনে
বৈধ, অবৈধ
নানা প্রয়োগ
আছে। এটি
বিবেচনা করতে
হবে তিনটি
মানদণ্ডের মাধ্যমে।
যথা— ক)
উদ্দেশ্য। কী
উদ্দেশ্যে অর্থ
পাচার করা
হচ্ছে। খ)
পন্থা ।
কোন মাধ্যমে
অর্থ পাচার
করা হচ্ছে।
গ) সম্পদের
উৎস। পাচারকৃত
সম্পদের উৎস
কি। দেশীয়
আইনের আলোকে
এ তিনটি
মানদণ্ডের ভিত্তিতে
অর্থ পাচারের
অপরাধ নির্ণিত
হবে।
বাংলাদেশ থেকে
অর্থ পাচারের চিত্র
টাকা
পাচার নিয়ে
আন্তর্জাতিক চারটি
সংস্থার রিপোর্টেই
বাংলাদেশ থেকে
ভয়াবহ মাত্রায়
টাকা পাচারের
তথ্য উঠে
এসেছে। এ
সংস্থাগুলোর মধ্যে
আছে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল
ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই),
সুইস ব্যাংক,
ইউএনডিপি এবং
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী
সাংবাদিকদের সংগঠন
আইসিআইজের পানামা
ও প্যারাডাইস
পেপার। জিএফআইয়ের
রিপোর্ট অনুসারে
গত বছর
দেশ থেকে
প্রায় ৫
লাখ কোটি
টাকা পাচার
হয়েছে। সুইস
ব্যাংকের সর্বশেষ
রিপোর্টে বলা
হয়েছে, দেশটিতে
বাংলাদেশীদের আমানত
সাড়ে ৫
হাজার কোটি
টাকা। পানামা
ও প্যারাডাইস
পেপার্সে ৮৪
জন বাংলাদেশীর
টাকা পাচারের
তথ্য উঠে
এসেছে। (দৈনিক
যুগান্তর, ১০
জুন, ২০২১)।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন
নিয়ে নানা
বিতর্ক রয়েছে।
তবে বিভিন্ন
সময়ে পত্রপত্রিকায়
প্রকাশিত নানা
কেস স্টাডি
থেকে এ
ধরনের পর্যবেক্ষণের
কিছুটা মিল
পাওয়া যায়।
এ নিয়ে
যে অভিযোগ
উত্থাপিত হয়েছে
তাকে সম্পূর্ণ
উড়িয়ে দেয়া
কঠিন। মাননীয়
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ
কে আব্দুল
মোমেন গত
নভেম্বরে (২০২০)
এক অনুষ্ঠানে
বলেছিলেন, বাংলাদেশ
থেকে কানাডায়
টাকা পাচারের
যে গুঞ্জন
আছে, তার
কিছুটা সত্যতা
তিনি পেয়েছেন।
আর প্রাথমিক
তথ্যানুযায়ী টাকা
পাচারের ক্ষেত্রে
সরকারি কর্মচারীদের
সংখ্যাই বেশি।
টাকা পাচারের
তথ্য পাওয়া
২৮টি ঘটনার
মধ্যে সরকারি
কর্মচারীই বেশি
(প্রথম আলো,
৭ জুন,
২১)।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক
সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল অব
বাংলাদেশের নির্বাহী
পরিচালক ড.
ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
দেশ থেকে
প্রতি বছর
যে টাকা
পাচার হয়,
এটি তার
আংশিক চিত্র।
পুরো চিত্র
আরো ভয়াবহ।
কারণ মোট
বাণিজ্যের ৩৬
শতাংশই বিদেশে
পাচার হয়।
তার মতে,
অর্থ পাচারের
অনেক কারণ
রয়েছে। এগুলো
বন্ধে সরকারের
সদিচ্ছা নেই
(দৈনিক যুগান্তর,
১০ জুন,
২০২১)।
মোটকথা, এসব
বক্তব্য থেকে
বাংলাদেশ থেকে
অর্থ পাচারের
বিষয়টি উড়িয়ে
দেয়া যায়
না। কিন্তু
সরকার এ
ব্যাপারে কঠোর
নয় বলে
অনেকেই মনে
করেন। অর্থ
পাচার বন্ধ
করা, পাচার
করা অর্থ
ফিরিয়ে আনা—এ
দুয়ের ব্যাপারে
সরকার তেমন
উদ্যোগী নয়।
যেমনটি ড.
ইফতেখার বললেন।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
থেকে বোঝা
যায় অর্থ
পাচার বিষয়ে
বাংলাদেশ সরকার
বর্তমানে তিন
ধরনের আচরণ
করছে। যথা- To
justify অর্থাৎ যারা
অর্থ পাচার
করে তারা
আমাদের কেউ
নয়। To avoid
অর্থাৎ বিষয়টি
জেনেবুঝে এড়িয়ে
যাওয়া। একজনকে
বললে অন্যজনের
ওপর চাপিয়ে
দেয়া। To deny অর্থাৎ
অস্বীকার করা।
কারা তা
করছে তাদেরকে
জানি না
বলে চালিয়ে
দেয়া। বলার
অপেক্ষা রাখে
না, এমন
আচরণ কাম্য
নয়। বর্তমান
অর্থনীতিতে ডলার
রিজার্ভ হ্রাসের
পেছনে এই
অর্থ পাচার
একটি বড়
ভূমিকা রাখছে।
সুতরাং এ
ব্যাপারে আমাদের
দৃঢ় পদক্ষেপ
গ্রহণ করতে
হবে।
দেশ থেকে
অর্থ পাচারের নেপথ্য কারণ
কি?
এ
নিয়ে দৃশ্যমান
কোনো গবেষণা
বা তথ্য
নেই। সরকারের
কাছে হয়তো
আছে, তবে
তা প্রকাশ
করা হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা
অফিসের সাবেক
মুখ্য অর্থনীতিবিদ
ড. জাহিদ
হোসেন বলেন,
দুই কারণে
অর্থ পাচার
করা হয়।
এর মধ্যে
প্রধান এবং
প্রথম কারণ
দুর্নীতি (দৈনিক
যুগান্তর, ১০
জুন, ২০২১)।
অর্থ পাচার
রোধে বাংলাদেশের
ভূমিকা দুর্বল
হওয়ার কারণগুলো—
১) সরকারের
সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা:
গণমাধ্যম সূত্রে
জানা যায়,
গত বছর
দুদক ৪৩
জনের নামসহ
একটি কমপ্লায়েন্স
রিপোর্ট আদালতে
জমা দিয়েছে।
এতে তাদের
নিজস্ব কোনো
অনুসন্ধান ছিল
না। এখন
প্রশ্ন হলো:
তারা কেন
এটা করল
না? দুদকের
আইনজীবীর ভাষ্য,
অর্থ পাচারকারীদের
ব্যাপারে তারা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ও বাংলাদেশ
ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স
ইউনিটের (বিএফআইইউ)
কাছে চেয়েও
কোনো তথ্য
পায়নি। প্রশ্ন
আসে: কেন
এমন হলো?
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
অনুযায়ী, অর্থ
পাচারকারীদের অনুসন্ধান
তার মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্ব নয়।
২) আন্তর্জাতিক
সমন্বয় ঘাটতি:
বাংলাদেশ থেকে
পাচারকৃত অর্থের
বৃহৎ গন্তব্য
সুইজারল্যান্ডের সুইস
ব্যাংক। কিন্তু
এ ব্যাংক
থেকে বাংলাদেশ
নিয়মিত বিস্তারিত
তথ্য পাওয়ার
জন্য এখন
পর্যন্ত সুদৃঢ়
কোনো সমঝোতা
চুক্তি নেই।
৩) আন্তর্জাতিক
সমস্যা: অর্থ
পাচার রোধ
করতে আন্তর্জাতিক
একটি সমস্যা
আছে। অর্থ
পাচারের দুটি
দেশ থাকে।
একটি উৎস
দেশ। আরেকটি
গন্তব্য দেশ।
এটি ভালোভাবে
রোধ করতে
হলে শুধু
উৎস দেশ
এককভাবে সক্রিয়
হলে শতভাগ
কার্যকর হয়
না। গন্তব্য
দেশও একে
প্রশ্রয় না
দেয়ার ব্যাপারে
কঠোর হতে
হবে। বাস্তবতা
হলো উন্নত
দেশগুলো যেগুলো
অর্থ পাচারের
গন্তব্য দেশ-তারা
এ ব্যাপারে
সহনীয়। বিশ্বের
বেশির ভাগ
দেশই তাদের
দেশে প্রত্যক্ষ
অথবা পরোক্ষভাবে
পাচারকৃত অর্থকে
স্বাগত জানায়।
এটিই সত্য।
[শেষ]
ড. এম কবির
হাসান:
অধ্যাপক, নিউ
অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়,
যুক্তরাষ্ট্র
মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম: সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন