ইতিহাস আলোচনা বলতে যা বোঝায়, এটা তেমন কিছু না। তবে ইতিহাসের সাথে বিষয়টা যুক্ত বলে লেখার শিরোনাম দিলাম, ইতিহাসের আড্ডা। আড্ডাতেতো আমরা অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলি, আড্ডায় কথা বলতে সুবিধা, জ্ঞানের পাণ্ডিত্যের দরকার হয় না। শুরুতেই বলি আমি ইতিহাসের ছাত্র না। সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র। তাই সমাজকে জানতে সমাজের নানান বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে ইতিহাস এক-আধটু জানতেই হয়। সেই অল্প দেখা থেকেই এই লেখা।
১৯৪৭ সালের আগে বাংলাদেশ আমরা ভারতবর্ষের মানচিত্রে ‘অবিভক্ত বঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিলাম। তখন আজকের পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ। এই তিনটি পৃথক দেশ মিলে একটি দেশ ছিল, নাম ছিল ভারতবর্ষ। অথবা ভারত উপমহাদেশ। সাতচল্লিশে আমরা ভাগ হয়ে গেলাম। বিশাল ভারত উপমহাদেশ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। একটি ভারত, অপরটি পাকিস্তান। ১৯৭১ এ এসে আমরা আবার বিভক্ত হই, বলতে তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি। তখন থেকে ভারতবর্ষের তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত টিকে আছে। একটি ভারত, অপর দুই রাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
বলতে গেলে প্রায় একই সংস্কৃতি, এবং একি গায়ের বর্ণ প্রায়। এসবে মিল থাকা সত্ত্বেও আমরা বহু-বিভক্ত। অনেক সময় প্রশ্ন আসে মনে, কিসের স্বার্থে আমাদের এই খন্ডিত রূপের এবং এত অমিলের আত্মপ্রকাশ।
প্রশ্নটা অনেক বিশ্লেষণ এবং ইতিহাসের পর্যালোচনা এবং ব্যাখ্যার মধ্যে মধ্যে পড়ে যায়। যেহেতু সেরকম কোন সিরিয়াস আলোচনা করব না, আড্ডা দিতে যখন বসেছি, বিষয়টা ঐতিহাসিক হলেও চেষ্টা করব আড্ডার মতো করে বলতে বা লিখতে।
কী নিয়ে- তাহলে শুরু করি। বিশাল এই বহু জাতি, ধর্ম এবং বিচিত্র সংস্কৃতির উপমহাদেশ ভেঙে গেল তার কারণ তো অনেক রকমই আছে। কারণগুলো কতটা গৌণ বা কতটা গৌণ না। সেটাও ভাবনার চৈতন্য নাড়া দেয় বৈকি। এই আলোচনাতে ভারতের কিছু অতীত শাসকদের মধ্যে কারা ছিলেন, তারা ‘সাম্প্রদায়িক’ ছিলেন কিনা- ওই সময়টায় তা একটু খুঁজে দেখতে হবে। ভারতবর্ষের দুটি প্রধান ধর্ম হিন্দু এবং মুসলমান। এদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধটা ছিল কিনা, তা দেখার চেষ্টা করবো। তার সাথে মিলাতে চেষ্টা করবো আজকের ভারতে এই দুই বৃহৎ সম্প্রদায়ের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কটার বন্ধন অতীতের মতো আছে কিনা, সেটা বোঝার। এই বোঝাটা একেক জনের একেক রকম হতেও পারে। তাতে কোন ক্ষতি নেই। বুঝতে পারাটাই গুরুত্বের।
এর সাথে আরেকটি কথা বলে নেয়া ভালো, আজকের ভারতের ইতিহাসকে জানবার এবং পড়ার অনেক বই আছে। সাম্প্রতিককালে ভারতবর্ষের রাজনীতির উপরে কয়েকটি জনপ্রিয় বইয়ের কথা মনে পড়ছে। একটি লেখা পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর ‘ভারত সন্ধানে’। অন্য বইটি লেখা আরেক পন্ডিত মৌলানা আবুল কালাম আজাদের, ‘ভারত স্বাধীন হল’। সাথে আরেকটি বইয়ের কথা না বললেই নয়, বইটির নাম, "JINNAH INDIA-PARTITION-INDEPENDENCE" লেখক, JASWANT SINGH. (প্রকাশক, OXFORD UNIVERSITY PRESS) যেকোন উৎসাহী পাঠক এই বইগুলি পড়লে ভারতবর্ষের সাম্প্রতিককালের ইতিহাসের বিশেষ করে এর রাজনৈতিক এবং সমাজ ইতিহাসের অনেক কথা জানতে পারি আমরা।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে আমরা কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের ঐক্য কিংবা অনৈক্যের পেছনে সাধারণত দুটি মৌলিক কারণ খুঁজে দেখতে চেষ্টা করি। একটি হল সমাজের উৎপাদন সম্পর্ক এবং অন্যটি সামগ্রিক রাজনীতির অভ্যেস এবং পাঠ।
এই নিয়েও সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভক্তির সূচনা হয় তা বলা যেতেও পারে। বিশাল ভারতবর্ষের বিভক্তির পেছনেও উল্লেখিত কারণগুলো বিদ্যমান ছিল, এখনো আছে। যে কারণে আজ থেকে শতবর্ষ পরে আজকের ভারতবর্ষের কোন রূপান্তর ঘটবে না অথবা ভারতবর্ষের ভেতর থেকে আবারো কোন স্বাধীন ‘জাতি রাষ্ট্রে’ সৃষ্টি হবে না, অরাজকতা বাড়বে না, সাম্প্রদায়িকতা বিকশিত হবে না- এসব বলা কঠিন। অন্তত আজকের ভারত কে দেখলে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
অতীত ভারতবর্ষের শাসকদের কিছু শাসনামলকে লক্ষ্য করলে দেখি ওই সময় ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি যতটানা ছিল সত্যি কথা বলতে গেলে ভারত বর্ষ থেকে ব্রিটিশরা চলে যাবার পর এই দিকটাতেও অধঃপতন হয়েছে বেশি। যাইহোক, এটা আরেক প্রসঙ্গ। পন্ডিত জহরলাল নেহেরু তার উল্লেখিত ভারত সন্ধানের ভূমিকাতে লিখেছিলেন, ‘জন্ম-জন্মান্তর পরস্পরা আমার যেসব সত্তা রূপ পরিগ্রহ করে কিছুকাল পরে মিলিয়ে গেছে, যে আমি নিত্য আসে নিত্য যায়, কেবল রেখে যায় তার স্মৃতি টুকু।’
আজকের আলোচনা সেই স্মৃতির একটি ভগ্নাংশকে নিয়ে। এই স্মৃতির গলি ভ্রমণের সময়কাল-১১৯৩-২০২০
১. ১১৯৩-১২৯০। এই সময় ভারতের শাসক ছিল গৌরী সাম্রাজ্য। এই সম্রাজ্যে ১১৯৩ সালে শাসক ছিলেন, মোহাম্মদ ঘৌরি। উল্লেখযোগ্য হলেন, কুতুবুদ্দিন আইবাক। ইলতুৎমিস, রোকনউদ্দিন, ফিরোজ শাহ। নাসির উদ্দিন মাহমুদ, গিয়াসউদ্দিন বালবিন।
২. ১২৯০-১৩১৬ । ভারত সাম্রাজ্যের তখন শাসক ছিলেন, জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজী, শাহাবুদ্দিন ওমর শাহ। প্রমূখ শাসক কর্তা। এই সময়টাকে খলজি সাম্রাজ্য বলা হয়।
৩. ১৩২০-১৩৯৯। এই সময় ভারত সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন, গিয়াসউদ্দিন তুঘলক, মুহাম্মদ ইবনে তুঘলক, এবং সম্রাট নাসিরুদ্দিন শাহ। এটাকে অনেক ঐতিহাসিকরা তুঘলক সাম্রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
৪. ১৪১৪-১৪৪৫। এই সময়টাকে কেউ কেউ রাজ বংশের উত্থান বলে উল্লেখ করেন। তখন যারা শাসন করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখ্য, সম্রাট খেজুর খান, মুইজউদ্দিন মোবারক শাহ। আল্লাহ আলম শাহ।
৫. ১৪৫১- ১৫১৭। শাসন করেছেন লোধী বংশ। যেমন, বাহালা লোধী, আব্রাহাম লোধী প্রমুখেরা।
৬. ১৫২৬- ১৫৩০। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা বলা যায়। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন, জহির উদ্দিন বাবর এবং হুমায়ুন।
৭. ১৫৩৯- ১৫৫৪। ভারতের শাসক ছিলেন সুরিয়ান সাম্রাজ্য। যেমন, শের শাহ সুরি, ইসলাম শাহ সুরি, মাহমুদ সুরি, এবং মোবারক খান সুরি।
৮. ১৫৫৫- ১৮৩৭। মুঘল সাম্রাজ্য আবার ফিরে আসে ভারতের মসনদে। এই সময়ে হুমায়ূন থেকে শুরু করে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত আকবর শাহ এবং কিং জাফর। শাসন করেছেন।
৯. ১৮৫৮- ১৯৪৭। ভারত বর্ষ শাসিত হয় ব্রিটিশ রাজতন্ত্র দ্বারা। ১৮৫৮ সালে অনেক ঐতিহাসিকদের মতে লর্ড কিং থেকে শুরু করে ১৯৪৭ পর্যন্ত লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষের শাসক ছিলেন।
উল্লেখিত সময়কাল নিয়ে এবং শাসনকর্তা বা শাসকদের নিয়ে ইতিহাসে বিভিন্ন মতভেদ থাকতেও পারে। সন তারিখের মিল-অমিল হয়তো কোথাও অন্যরকম হতেও পারে। আমি সে ব্যাপারে কোনো বিতর্কে যাচ্ছি না। যদি কোন ভুল কিছু লেখা হয় বা সন তারিখ ভুল লেখা হয়, পাঠক ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
দীর্ঘকাল সময় ভারত বর্ষ যাদের দ্বারা শাসিত কিংবা পরিচালিত হতো, তখন কোথাও দেখা যায়নি যে, ভারতবর্ষের হিন্দু শ্রেণি গোষ্ঠীকে বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যারা জন্মগতভাবে ভারতের নাগরিক। তাদের ভারত থেকে উল্লেখিত কোন শাসক বা সম্রাট বিতাড়িত করবার কোনরকম চেষ্টা বা প্রচেষ্টা কেউ করেছেন। অত্যাচার কিংবা শোষণ এক শ্রেণী কর্তৃক আরেক শ্রেণীর উপর হতে পারে। সেটা ধর্মীয় কোন সাম্প্রদায়িক শোষণ কিনা। সেটা নিয়েও আলোচনার অবকাশ আছে। সেই অবকাশকে একেবারে অস্বীকার করা যাবে না।
উল্লেখ্য, যে পন্ডিত জহরলাল নেহেরু তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ভারত সন্ধানে’ আলোচনা প্রসঙ্গে এক যায়গায় লিখেছেন, তিনি একদিন এক জনসভায় গেলেন। সবাই তখন উচ্চস্বরে বলছিল, ‘জয় ভারত’। নেহেরু তখন জনসভার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘জয় ভারত’ কথার অর্থ বলতে তারা কি বোঝাতে চান। উপস্থিত দর্শক শ্রোতা যা বললেন তাতে জহরলাল নেহেরু খুশি হতে পারলেন না। তখন তিনি নিজে বললেন, জয় ভারত কথার অর্থ হচ্ছে, এই ভারতের সব ধর্ম, শ্রেণী, বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের সব নাগরিকের জয়।
এসবের ঊর্ধ্বে সব ভারতীয়দের অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক মুক্তি এবং শোষণ মুক্তির লড়াইকে অব্যাহত রাখা। যদি সেটা আমরা করতে পারি সেটাই জয় ভারত কথার অর্থ।
আজকের ভারত রাষ্ট্র এবং মোদির ভারত লক্ষ্য এবং তার স্বপ্ন অথবা পরিকল্পনা দেখলে প্রতিদিনই যেন মনে হয়, ভারত তার অতীত ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিনা অথবা গেছে কিনা। বিষয়টা নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে কিন্তু।
বাংলাদেশ-ভারতের অন্যতম একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভারতে কোন সাম্প্রদায়িক বিরোধ সৃষ্টি হলে সেটা বাংলাদেশকেও যেমন ভাবাবে তেমনি এই ধরনের কোনো সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশকেও ফেলে দিতে পারে। যেটা উপমহাদেশের রাজনীতি বলি কিংবা অর্থনীতি বলি। কোনটার পক্ষেই শুভ না।
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য বহু যুগ থেকেই আছে। কোন ধরনের সাময়িক উত্তেজনায় আমরা যেন মোহগ্রস্ত হয়ে না যাই, বিভ্রান্ত না হই। এই আলোচনাটা এই ব্যাপারেও পাঠকদের কাছে কিছু কথার বিনিময় বলা যেতে পারে।
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘If you want to go fast, go alone, but if you want to go far, go together’। কিছুদিন আগে ভারতের একজন লেখকের একটা লেখা পড়ছিলাম। লেখক এর নাম, অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়। লেখার শিরোনাম টা ছিল ‘চেপে যাওয়া ইতিহাস’। সেই লেখাতে অনেক কথার সাথে এটাও পড়েছি, ‘হিন্দু- মুসলিমদের তাজা রক্তে এই ভারত মুক্তি পেয়েছে। জেলখাটা এক কোটি মুসলমানের আত্ম বলিদান ও ফাঁসি হওয়া ৫ লাখ মুসলমানের প্রাণের বিনিময়ে আজ ভারত স্বাধীন।’
ভারতের আরেক বিখ্যাত লেখক, খুশবন্ত সিং এক জায়গায় লিখেছেন, ‘Indian freedom is written on Muslim's blood.’ উল্লেখিত লেখার বর্ণনাতে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা হিসাবে অনেক বেশি। ৯৫৩০০ জন স্বাধীনতা যোদ্ধার নাম লেখা আছে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে। তারমধ্যে ৬১ হাজার ৯৪৫ জন মুসলিম বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী। শতকরা হিসাব ৬৫ শতাংশ। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের বলিদান ইচ্ছাকৃতভাবে লুকানো হয়। লেখক আরো বলেন, ‘We brought you few from Indian History for your knowledge ! There are tons like this; Every Indian should know this; and teach our children the truth.’
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক মুসলিম আলেমদের নাম পাওয়া যায়। অনেক ঐতিহাসিকরা বলেন অসংখ্য এরকম নাম আছে। কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করছি। মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা রাশেদ আহমেদ গাঙ্গোহি, মুফতি কেফায়েতুল্লাহ, মাওলানা লুফতুল্লাহ, মৌলভী ওয়াহেদ আহমেদ, মাওলানা ওয়াজির গুলি, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মাওলানা সাজ্জাদ বিহারী, মাওলানা আব্দুল বারী, মাওলানা জাফর আলী খান, মাওলানা হিফজুর রহমানসহ এমন অসংখ্য নাম আছে।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভারত ইতিহাসের এই খণ্ডকে বিতর্কিত কিংবা অস্বীকার যেটাই করতে চেষ্টা করেন না কেন, সেটাতে ভারতকে কখনোই গণতান্ত্রিক বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বলা যাবে কিনা বা যায় কিনা, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেবে।
পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয় যে, ‘Rationalist historiography’ বলে একটা কথা আছে। এর প্রভাবে পুরনো ইতিহাসের অনেক সময় অবলুপ্তি ঘটে আর ইতিহাসের নতুন প্রেক্ষাপট বা রূপের সৃষ্টি হয় অথবা হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে ইতিহাসকে মনে করি, এর শেষ অধ্যায় বলে কিছু নেই। ইতিহাস হচ্ছে মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ধাবমান প্রবাহের অবিরাম গতি।
হ্যাঁ এটা সত্যি যে, ইতিহাস চর্চার ধরনও অনেক সময় বদলে যায়। এটাকে কেউ, ‘Revisionist historiography’ ও বলেন। বাংলায় এটাকে অনেকে ‘শোধন বাদী’ ইতিহাস চর্চা নামে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’, রবীন্দ্রনাথের ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’, পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর লেখা ‘ভারত সন্ধানে’ ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের লেখা ‘ভারত স্বাধীন হল’; এসব ইতিহাসের চর্চা থেকে ভারতবর্ষের অতীত সামাজিক এবং রাজনৈতিক মিলন বন্ধনে সম্প্রদায়িক প্রীতির এবং সহবাসের যে ইতিহাস পড়ি অথবা শুনি। এসব ইতিহাস বিভিন্ন সময় অনেক নুতন ভাষ্যের অবতারণা করলেও উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ব্যাপারে অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রেখেছে এবং তা আগামীতেও রাখতে পারে।
ভারতীয় লেখক যশোবন্ত সিং, তার লেখা ‘JINNAH INDIA-PARTITION-INDEPENDENCE’ বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘The Indian nationalist movements lent a sense of commonality to the separate communities of the subcontinent’। (Page-491)
লেখক যশোবন্ত সিংয়ের বইটি আমাদের সবারই পড়া দরকার ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণ এবং এসবের পেছনে ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যা জানবার প্রয়োজনে। এটাও উল্লেখযোগ্য যে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে বা সংগ্রামে মুসলমান ছাড়াও অনেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের রক্তের ছাপ আছে। এই সবকিছুর অবদানকে আজকের ভারত এককভাবে অস্বীকার করতে পারবে কি?
আজকের ভারতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ভারতের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িকতার মিলন-বন্ধনকে ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও ফেলে দিচ্ছে বলেই মনে হয়। এই আশঙ্কা যেন ভুল হয়।
- সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক